Published : 21 Jul 2026, 01:03 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে ‘ট্রলিং’ বা অন্যকে নিয়ে উপহাস করা যেন, নিয়মিত সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
গঠনমূলক সমালোচনা বা যৌক্তিক মতামতের তোয়াক্কা না করে যেকোনো বিষয়ে শুধু ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করা বা কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা অনেকেরই রেওয়াজে দাঁড়িয়ে গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ ইন্টারনেট রসিকতা মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে মনস্তাত্ত্বিক ও চারিত্রিক সংকট।
তবে প্রশ্ন হল, কারা এই ট্রল করে এবং সঠিক সমালোচনা না করে শুধুই উপহাস করার পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণ কী?
মনস্তত্ত্ব এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যারা ইন্টারনেটে সারাক্ষণ অন্যকে ছোট করায় ব্যস্ত থাকেন, তারা সবাই যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অশিক্ষিত কিংবা মানসিক রোগী, বিষয়টি তেমন নয়। এর পেছনে মানুষের নিজস্ব হীনমন্যতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং এক ধরনের বিকৃত মানসিক আনন্দ কাজ করে।
‘ডার্ক টেট্রাড’ মানসিক বৈশিষ্ট্য ও পৈশাচিক আনন্দ
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ডা. এভিতা মার্চ ও তার দল, ট্রলকারীদের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেন।
‘পার্সোনালিটি অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল ডিফারেন্সেস’-এ প্রকাশিত হওয়া গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র ট্রলকারীদের মধ্যে এক ধরণের বিষাক্ত মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য থাকে, যাকে বলা হয় ‘ডার্ক টেট্রাড’।
এর মধ্যে রয়েছে: পরশ্রীকাতরতা, স্যাডিজম বা অন্যের কষ্টে আনন্দ পাওয়া, সাইকোপ্যাথি বা সহানুভূতির অভাব এবং মেকি অহংকার।
ডা. এভিতা মার্চ জানান, এরা অন্যকে উপহাস করে যে মানসিক তৃপ্তি পান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্যাডিস্টিক প্লেজার’ বা পৈশাচিক আনন্দ। অন্যের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়ে এরা নিজেরা আনন্দ পান।
‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট’ বা পর্দার আড়ালের বিকৃতি
বাস্তব জীবনে একজন মানুষ যে কথাটি সরাসরি মুখে বলার সাহস পান না, ইন্টারনেটে ছদ্মনাম ব্যবহার করে পর্দার আড়ালে থেকে সেই কুৎসিত কথাটিই তারা অনায়াসে লিখে ফেলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাইবার-সাইকোলজিস্ট’ এবং নিউ জার্সির রাইডার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. জন সুলের’য়ের গবেষণাপত্র ‘দ্য অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট’-এ এই মানসিকতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তার মতে, ইন্টারনেট মানুষকে এক ধরনের ‘অদৃশ্যতা’ ও ‘পরিচয়হীনতা’ প্রদান করে। এই সুযোগে মানুষ যেকোনো ধরনের সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত বোধ করে, যা তাদের ভেতরের লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতাকে বাইরে এনে দেয়।
নিজস্ব যোগ্যতা ও ইচ্ছার অভাব থেকে ‘হীনমন্যতা’
ট্রলকারীদের আচরণ নিয়ে, ‘কম্পিউটার্স ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত কানাডার ব্র্যান্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. এরিন বাক্লস ও তার গবেষক দলের করা গবেষণার তথ্য অনুযায়ী- অনেক সময় দেখা যায়, যারা জীবনে নিজে কোনো কিছু অর্জন করতে পারেননি এবং কঠোর পরিশ্রম করে যোগ্যতা তৈরি করার ইচ্ছাও যাদের নেই, তারাই মূলত সফল বা আলোচিত মানুষদের বেশি ট্রল করেন।
অন্যের যোগ্যতা বা অর্জনকে মেনে নিতে না পারার হীনমন্যতা থেকে তাদের মনে তীব্র হিংসার জন্ম নেয়।
সফল কোনো মানুষকে ট্রল করে সাময়িকভাবে নিচে নামাতে পারলে তারা নিজেদের মনে এক ধরনের কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্ব বা সমতা অনুভব করেন, যাকে মনস্তত্ত্বে ‘কমপেনসেশন’ বা ক্ষতিপূরণ চেষ্টা বলা হয়।
মনোযোগ আকর্ষণ ও ‘নেতিবাচক শক্তিবৃদ্ধি’
যুক্তরাজ্যের এজ হিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ডা. লিন্ডা কাই, ইন্টারনেট ট্রলিং এবং সামাজিক আচরণের ওপর দীর্ঘ গবেষণা করেছেন।
‘পাবলিক লাইব্রেরি অব সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়া গবেষণায় তিনি ব্যাখ্যা করেন, কিছু মানুষের মধ্যে চরম একাকিত্ব বা মনোযোগ পাওয়ার তীব্র ক্ষুধা বা ‘অ্যাটেনশন সিকিং’ বিষয় থাকে।
ইতিবাচক কোনো উপায়ে সমাজে পরিচিতি পাওয়ার যোগ্যতা বা ধৈর্য না থাকায় তারা এই নেতিবাচক পথ বেছে নেন।
কাউকে নিয়ে একটি নোংরা ট্রল বা ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করলে যখন হাজার হাজার মানুষ লাইক দেয় বা রিঅ্যাক্ট করে, তখন মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তাদের ‘নেতিবাচক শক্তিবৃদ্ধি’ ঘটে। অর্থাৎ, তারা মনে করে এই নোংরা পথেই তারা সমাজে পরিচিতি পাচ্ছে বা ‘লাইমলাইটে’ আসতে পারছে।
গঠনমূলক যুক্তির অভাব ও ‘ডিজিটাল মূর্খতা’
সঠিক ও সুস্থ সমালোচনা করার জন্য পড়াশোনা, মেধা এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয়। তবে কারও যদি কোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান বা বোঝার ক্ষমতা না থাকে, অথচ তাকে সেই বিষয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে হয়, তখন সে তর্কের খাতিরে কথা না বলে, শুধুই উপহাস বা ব্যাঙ্গ করা শুরু করে।
আমেরিকার ব্রিগহাম ইয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. স্কট চার্চ, সামাজিক মাধ্যমের আচরণ নিয়ে তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, নিজের মেধা ও তথ্যের ঘাটতি ঢাকার জন্য অন্যকে গালি দেওয়া বা ‘মিম’ বানানোই তখন এই ধরনের মানুষের একমাত্র হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
একেই আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা ‘ডিজিটাল ও আচরণগত মূর্খতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত পরামর্শ
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ট্রলকারীদের সামলানোর সেরা বৈজ্ঞানিক উপায় হল, তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেওয়া বা পাত্তা না দেওয়া।
ইন্টারনেটের ভাষায় একটি প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে, ‘ডোন্ট ফিড দ্য ট্রল’। ট্রলকারীরা মূলত অন্যের রাগ বা কষ্ট দেখেই তাদের ‘স্যাডিস্টিক’ আনন্দ পান। তাই তাদের মন্তব্যে কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি ব্লক বা ইগনোর করলে তারা এক সময় নিজে থেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।
আরও পড়ুন
৩০ দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার না করলে মস্তিষ্কে যা ঘটে
যে কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের তৈরি নিয়ম মানা উচিত