Published : 23 Apr 2026, 04:36 PM
এখন স্মার্টফোন মানেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তাই দিনের বড় একটি সময় ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম-সহ নানান প্ল্যাটফর্মে কাটানো হয় এবং অনেক সময় তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি।
ঘুম বা কাজের মধ্যেও ফোন স্ক্রল করতে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। ফলে অনেকেই এখন ভাবেন, কিছুদিনের জন্য বিরতি নিয়ে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব কিনা।
আর বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, সামাজিক মাধ্যম থেকে মাত্র ৩০ দিনের বিরতিও মস্তিষ্ক ও আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।
সামাজিক মাধ্যম মস্তিষ্কে যেভাবে প্রভাব ফেলে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ডিটক্স ক্যালিফোর্নিয়া’র মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. মাইকেল এস. ভালদেজ রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে মানুষ বারবার সেখানে ফিরে আসে। এটি মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে, যেখানে ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক গুরুত্ব রাখে।”
মার্কিন মনোচিকিৎসক অ্যামি মরিন বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে কখনও হয়ত প্রতিক্রিয়া আসে, কখনও আসে না- এই অনিশ্চয়তাই মানুষকে বারবার ফিরে আসতে বাধ্য করে। আর ধীরে ধীরে এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ওপরে মস্তিষ্ক অভ্যস্ত হয়ে যায়।”
“ডোপামিন মনোযোগ, উদ্দীপনা ও আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। নতুন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলে, মস্তিষ্ক সেটিকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরে রাখে এবং আবার সেই অভিজ্ঞতা পাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে” ব্যাখ্যা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টিগ্রেইটিভ সাইকোলজিক্যাল সার্ভিসেস’য়ের মনোচিকিৎসক ড্যানিয়েল বি. ওয়াল্ড।
৩০ দিনের বিরতিতে মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন আসে
এই বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ৩০ দিনের বিরতিতে, নিজের অনুভূতি বোঝার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সময় দেয়। এই সময়ের মধ্যে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নতুন ছন্দে অভ্যস্ত হতে শুরু করে।
এছাড়া সময়টি মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থাকে পুনরায় সামঞ্জস্য করতেও সাহায্য করে। ফলে ধীরে ধীরে কম উত্তেজনাপূর্ণ কাজ থেকেও আনন্দ পাওয়া শুরু হয়।
মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়ে
দ্রুত পরিবর্তিত কনটেন্টের কারণে মনোযোগ ভেঙে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো একটি কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে থাকলে এই সমস্যা ধীরে ধীরে কমে। আবার ঘন ঘন নোটিফিকেইশন এবং দ্রুত তথ্য গ্রহণের অভ্যাস মস্তিষ্ককে ছোট ছোট মনোযোগের অংশে অভ্যস্ত করে তোলে।
বিরতির ফলে এই অভ্যাস পরিবর্তিত হয় এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে।
ঘুমের উন্নতি হয়
রাতে ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার ঘুমের গুণগত মান নষ্ট করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন ৩০ দিনের বিরতির মধ্যে প্রথম সপ্তাহেই ঘুমের উন্নতি নজরে পড়বে।
রাতের স্ক্রলিং কমে গেলে ঘুম গভীর ও একই সঙ্গে স্বস্তিদায়কও হয়। ফলে শরীর ও মস্তিষ্ক দুটোই বিশ্রাম পায়।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমে
সামাজিক মাধ্যমের একটি বড় প্রভাব হল- তুলনা করার প্রবণতা। অন্যদের জীবন দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে হতাশা বা উদ্বেগে ভুগতে হয়।
ডা. ড্যানিয়েল বি. ওয়াল্ডের মতে, “সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলে সারাদিন শুধু নিজের সমস্যাই নয়, অন্যদের আনন্দ, দুঃখ বা রাগের প্রতিক্রিয়াও বহন করতে হয়। এটি মানসিক চাপ বাড়ায়।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে থাকলে এই অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমে যায়। এতে মানসিক স্বচ্ছতা বাড়ে এবং নিজের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগও আরও দৃঢ় হয়।
বাস্তব জীবনের প্রতি মনোযোগ বাড়ে
সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে থাকলে বাস্তব জীবনের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া যায়। পরিবার, বন্ধু এবং আশপাশের পরিবেশের সঙ্গেও সংযোগ অনেকটা বাড়ে। ফলে যে কোনও কাজে নিজেকে আরও স্থির ও উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
এতে সম্পর্কগুলোও আরও গভীর হয়।
সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখা যায়
অনেকেই বুঝতেই পারেন না তারা কত সময় সামাজিক মাধ্যমে ব্যয় করছেন। বিরতির পর প্রথম যে বিষয়টি খেয়াল হয়, তা হল- হাতে অনেক বেশি সময় রয়েছে। এই সময়কে তখন বিশ্রাম, পরিবার বা ব্যক্তিগত কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। ফলে জীবনেও একটি ভারসাম্য তৈরি হয়।
পুরানো অভ্যাসে ফিরে যাওয়া কমে
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন থেকে চার সপ্তাহ পর অনেকেরই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের তাগিদ কমে যায়। মস্তিষ্ক নতুন অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
তবে সতকর্তার বিষয় হল, ৩০ দিনের পর আবার পুরানো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই এই সময়ের মধ্যে নতুন অভ্যাস তৈরি করা জরুরি।
যেমন- নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ফোন ব্যবহার না করা বা অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা।
আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচকতা বাড়ে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে থাকলে অন্যদের সঙ্গে তুলনা কমে যায়। ফলে নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হয়। এতে নিজেকে কম সমালোচনা করা হয় এবং জীবনের প্রতি আরও ইতিবাচক মনোভাব আসে।
এছাড়া অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক চাপ ও খারাপ মেজাজের সম্পর্ক রয়েছে, যা বিরতির মাধ্যমে কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন