Published : 22 Jul 2026, 01:50 AM
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন এবার দলীয় প্রতীকে না হলেও রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তুতি শুরু করেছে।
প্রার্থী নির্ধারণ, মাঠ যাচাইসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা।
সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বছর না পেরোতেই আসন্ন স্থানীয় সরকারের ভোটে জনপ্রিয়তার পরীক্ষা দিতে হবে ক্ষমতাসীন বিএনপিকে, যারা প্রায় দুই দশক পর আবার সরকার গঠন করেছে।

ফলে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নকেন্দ্রিক বিভাজন, দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব দৃশ্যমান হওয়ার আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করে ফেলা যায় কিনা, সে আলোচনা সরকারি দল বিএনপির মধ্যে আছে।
প্রশাসনকে কতটা নিরপেক্ষ রাখা যাবে—এমন আলোচনার পাশাপাশি সংঘাতহীন সুষ্ঠু নির্বাচন ও সবার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা চলছে।
ক্ষমতাসীনদের মধ্যে একাধিক প্রার্থী হওয়া নিয়ে আলোচনা থাকলেও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি তাদের প্রার্থী নির্ধারণের কাজ গুছিয়ে আনার কাজ করছে।
সংস্দ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগ। কিন্তু নির্দলীয় স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টি এখনো নির্বাচন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি, যদিও তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ওয়ার্ড ও সীমানা বিন্যাসের কাজে রয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আগামী অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে ধাপে ধাপে নির্বাচন শুরু করতে চায় সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
আইন সংশোধনের ফলে এবার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে। গেল বছরের অগাস্টে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের জন্য ত্রয়োদশ সংসদে বিল পাস করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ-ইউপিতে দলীয় প্রতীকে ভোটের বিধান রেখে আইন সংশোধন করে।
সেই আইন সংশোধন করে এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জুবাইদা নাসরীন মনে করেন, দলীয় প্রতীক না থাকলেও দলকেন্দ্রিক প্রভাব সব সময় ছিল। সেই প্রভাব এবার থাকবে না, সরকারি দলের আধিপত্য থাকবে না, এটি কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, “এখনো সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনাও আসেনি। কোনো পরিকল্পনা-কৌশলও জানতে পারিনি।”
বিএনপির পরীক্ষা?
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন বিএনপি সরকারের প্রথম ‘পরীক্ষা’।
দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় দলের তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে প্রার্থী হওয়ার প্রবণতা দেখা দেবে। যে কারণে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে।
তারা বলছেন, ইতোমধ্যে দলে বলয় সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আছেন দলের সংসদ সদস্য ও তার অনুসারীরা; অন্যদিকে বিগত নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া নেতা ও তাদের অনুসারীরা।
এতে করে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলেও নেতাদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।
হবিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকার বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ওইসব এলাকায় বিএনপির এমপিরা ইতোমধ্যে ‘বলয়’ সৃষ্টি করেছেন।
তারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়ন দেওয়ার সময় বিএনপির হাইকমান্ড থেকে বলা হয়েছিল, যারা মনোনয়ন পাচ্ছেন না তারা যেন পৌরসভা, উপজেলা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেন। কিন্তু আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন এমপিরাই তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নিয়ে এখনো দলের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা নাই। তাই নিজেও খুব একটা কাজ করছি না। কিন্তু একটা সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। দল তখন দলের প্রার্থী হওয়ার মানদণ্ড ঠিক করে দেবে।”

তিনি বলেন, “আমরা তো দলীয় শৃঙ্খলার অধীন, তখন মানদণ্ড মেনেই আমরা প্রার্থি দেব। এটা নির্দলীয় বলা হলেও দলীয় নির্বাচনই, আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু করছি না, কোনো প্রতিবন্ধকতা বা ব্যক্তিগতভাবে কোনো কিছুই করছি না...অনেকে প্রার্থী হবে বলে প্রচার করছে।
“আমরা মনে করি, জিতে আসার মতো প্রার্থী হতে হবে; বিএনপিও এমন প্রার্থী দেবে। এই বার্তাটা আমি দিতে চাই, তারা যেন মানুষের কাছে যায়।”
সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির আশঙ্কার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্বিমত প্রকাশ করেছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। তবে সংঘাত, সংঘর্ষ হবে—এটা আগেই কেন ধরে নেব?”
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর ভাষ্য, “গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেভাবে বর্তমান কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু হয়েছে, তেমনি সুষ্ঠু হবে। এবার নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ আছে এবং দলীয়ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে না, সে কারণে সংঘাত, সংঘর্ষের আশঙ্কা কম থাকবে।”
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেছেন, ক্ষমতায় এসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলসমর্থিত প্রার্থীরাই এগিয়ে থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং সারাদেশে ইতোমধ্যে যে ভাবমূর্তি বিএনপির নেতাকর্মীরা অর্জন করেছেন, তা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তারা বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজনে স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য একমত।
গেল ১১ জুলাই স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপি নেতারা দলের চেয়ারম্যানকে পরামর্শ দেন যে, যত দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে যাবে সরকার, তত রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন তারা।
বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণার বিষয়টি ওঠেছে। নির্বাচন দিতে দেরি হলে এর রেশ সরকারের বিরুদ্ধে যাবে, বৈঠকে এমন শঙ্কার কথাও এসেছে।
বৈঠকের আলোচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপি নয়, বরং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কথাও ওঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান শনিবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোনো কিছুই বিএনপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয় না। শেখ হাসিনা বলেছেন আসবেন, তিনি আসুক। এটা তো আইনি ব্যাপার, চ্যালেঞ্জের কিছু নাই।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি প্রায় ১৫ বছর পর ক্ষমতায় এসে দুই বছরের মাথায় স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রায় হেরে গেছে। এই বিষয়টি আমাদেরকেও খেয়াল রাখতে হবে। রাজনৈতিকভাবে সরকারকে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে হলে স্থানীয় সরকারেও দলসমর্থিতদের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।”
দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কার্যক্রমে যুক্ত থাকা একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দলীয় সংসদ সদস্যরা এখনই নিজেদের বলয়ের লোকদের প্রার্থী করে জিতিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম খোঁজ নিয়ে কোনো কোনো এলাকায় এ ধরনের তৎপরতা শুরু হওয়ার খবর পেয়েছে।
হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার একটি ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা বলেছেন, ইতোমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্যের বলয়ের লোকেরা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং বিজয়ী হওয়ার ছক কষছেন।
স্থানীয় উপজেলার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেন, “মাধবপুরের ইউনিয়নগুলোয় অবস্থা অনেকটা যে—সরকার তো দলে, এখন নির্বাচনটা হয়ে গেলেই সিটে বসে পড়বে। কেবল আনুষ্ঠানিকতার বাকি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হামিদুর রহমান হামদু বলেন, “অহনও নির্বাচন আইছে না, তবে একেক ইউনিয়নে সাতজন, আটজন করে ঘোষণা করতেছে।
“কোনো বলয় বা গ্রুপিং বলব না, তবে এমপি সাব যদি উদ্যোগ নেন, তাহলে পরে একজন প্রার্থিতা করা সম্ভব। আগে ইউনিয়ন হবে, এরপর পৌর, উপজেলা হতে পারে।”
দলের তৃণমূলে কোন্দল-বিরোধের বিষয়ে আগে-ভাগেই সতর্ক করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গেল ১৩ জুলাই বরিশালে দলের সাংগঠনিক সভায় তিনি বলেন, “বিগত নির্বাচনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দলকে জিতিয়ে নিয়ে এসেছেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঠিক সেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে জিতিয়ে নিয়ে আসতে হবে।”
শনিবার সন্ধ্যায়ও গুলশানে দলের বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বৈঠকে করেছেন তারেক রহমান। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সামনে রেখে ও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রংপুর বিভাগের জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।
এ বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদও অংশ নেন।

রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, “বৈঠকে দলের সাংগঠনিক ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেছেন দলের শীর্ষনেতারা।”
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন কেন্দ্রীয় নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌর ও উপজেলা নির্বাচনে দলের সকল পর্যায়ের কমিটির মধ্যে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রার্থী ঠিক করার জন্য বলা হয়েছে।
সম্ভব হলে একক প্রার্থী নির্ধারণ করতেও নেতাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বলেন তিনি।
বিএনপির পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনে তাদের সঙ্গে ছিল, এমন দলগুলো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে যাচ্ছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন এদের মধ্যে অন্যতম।
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সারাদেশে সমর্থিত প্রার্থী দেব। একটি প্রতিনিধি সভা করব। আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত আছে।”
তবে মাহমুদুর রহমানের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে বলেন, “অনেক প্রার্থী এখনই মনে করছে না যথাযথভাবে নির্বাচন হবে, সব জায়গায় প্রার্থীরা দাঁড়াতে পারবে।”
জামায়াতে ইসলামী কী করছে?
সংসদে নানা বিষয়ে সরকারের সমালোচনা ও বিরোধিতার পাশাপাশি মাঠের আন্দোলনেও রয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তার জোট।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় কার্যকর করতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য বিক্ষোভ সমাবেশ করছে। অর্থাৎ তারা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা বলেছেন, ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকারের প্রস্তুতি নিতে সকল কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, জামায়াতের স্থানীয় নেতারাও নির্বাচনি কার্যক্রম শুরু করেছেন। ভোটার তালিকা যাচাই, নতুন-পুরনো ভোটার টানা, নারী ও তরুণ ভোটারদের নিশানা করে দলের নেতারা কাজ করছেন।
বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোটারদের মন কাড়তে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্নভাবে গণসংযোগ করছেন। তাদের নেতাকর্মীরাও প্রার্থীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হলেও পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়েও প্রার্থী ঠিক করে রাখছে জামায়াতে ইসলামী।
তবে দলটি জোটবদ্ধ নির্বাচন করছে না। জামায়াত বলছে, স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায়েই সারাদেশে দলসমর্থিত এককপ্রার্থী নির্ধারণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “১১ দলীয় ঐক্যের কোনো বিষয় নেই। নিজেরা আলাপ করে স্ব-স্ব দলীয় প্রার্থীই নির্ধারিত হচ্ছে।”
জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এই নেতা বলেন, “ইতিহাস তো আমাদের কাছে সুখকর না। দলীয় সরকারের অধীনে যদি নির্লজ্জভাবে নির্বাচন হয়; নির্বাচনের সময় যদি সরকার নিজেদের লোককেই বিজয়ী করার প্রয়াস চালায়, তাহলে তো নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।”
নির্বাচন প্রভাবিত হলে কী করবে জামায়াতে ইসলামী? জবাবে এহসানুল মাহবুব বলেন, “এখনই আমরা এটা বলবো না। আমরা মনে করি অতীতের পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তারা (সরকার) উপহার দেবে।”
“কোনো অবস্থাতেই যেন বৈষম্য, দলীয়করণ না হয়। সবাই যেন সমান সুযোগ পান, এটাই প্রত্যাশা জামায়াতে ইসলামীর,’’ বলেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
এনসিপিও ভোট করবে ‘একা’
জুলাই অভ্যুত্থানে বর্ষপূতি ঘিরে এনসিপির ছত্রিশ দিনের কর্মসূচি চলছে। এই কর্মসূচি শেষ হলে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন নেতারা।
ইতোমধ্যে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণে এনসিপির স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি কাজ করছে।
এনসিপির একাধিক নেতা বলেন, ইতোমধ্যে একশটি পৌরসভা ও উপজেলায় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। আরো একশ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে এনসিপি।
উপজেলা ও পৌরসভার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রার্থীদের নাম কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হবে না, বলেন তারা।
উপজেলা ও পৌরসভা মিলিয়ে অন্তত চারশ জায়গায় প্রার্থী দেওয়ার কথা বলছে এনসিপি।

এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্তর ‘রাজনৈতিক পর্ষদ’ এর সদস্য আকরাম হোসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমরাও একাই নির্বাচন করবো।’
তিনি বলেন, “সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেবেন এনসিপি সমর্থিত প্রার্থীরা। আমাদের এখন প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। সারাদেশে চলমান পদযাত্রার মাধ্যমেও প্রার্থীদের পরিচিত করাচ্ছি।’
এনসিপি এরইমধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জুলাইয়ের কর্মসূচি শেষে বাকিদের নামও পর্যায়ক্রমে সামনে আনবে তারা।
দলের কেন্দ্রীয় একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, এনসিপি কয়েক ধরনের প্রার্থীর খোঁজে রয়েছে।
“মধ্যবয়সি বা তার চেয়ে কিছু বেশি বয়সি আর সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা মজবুত, তা বিবেচনা করা হচ্ছে,” বলছিলেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা।
তিনি বলেন, “বিভিন্ন দলে পদবঞ্চিত, নির্বাচন করার মতো সক্ষমতা আছে, তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।”

কী করবে বামপন্থি দলগুলো?
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদসহ বামপন্থি দলগুলোও তাদের তৃণমূল নেতৃত্বকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছে।
সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলছেন, “স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হোক, আমরা অবশ্যই অংশ নেব।”
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ কীভাবে হবে সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “সংবিধানে স্থানীয় সরকারের কথা আছে। কিন্তু স্থানীয় এমপি বা ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা যেভাবে মাতবরি করে, তাতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হয় না।”
সিপিবির এই নেতার পরামর্শ, নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা করতে পারে।
পাশাপাশি নির্বাচনে টাকার লড়াই, পেশিশক্তির ব্যবহারসহ নির্বাচনবিরোধী কার্যক্রম বন্ধে যা যা দরকার, তার ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনকে করতে হবে, বলেন তিনি।
ইউনিয়ন পর্যায়ে এককভাবে ভোট করার কথা বললেও সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঐক্যবদ্ধভাবে করার পক্ষে তারা।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরো সময় প্রয়োজন বলে মনে করেন সিপিবি ও বাসদসহ ছয় দলের বামজোটের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।

ধর্মভিত্তিক দলগুলো কী ভাবছে?
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তুলনামূলক ভালো ফল পাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর চেয়ে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন এই দলটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে বেশি প্রার্থী দেয়।
বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত তিনজন চেয়ারম্যান রয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ূম বলেন, “আমাদের নতুন নির্বাহী কমিটি হয়েছে। সারাদেশে সংগঠন পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আমরা এই সংগঠন পুনর্গঠনের মধ্যেই ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রার্থীও খুঁজব। আশা করি, অধিকাংশ ইউনিয়নে প্রার্থী দিতে পারব।”
ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের প্রায় ১২০০ কমিটি থাকার কথা বলেছেন দলের একজন নেতা।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, তাদের দল ময়মনসিংহ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দলসমর্থিত প্রার্থী খোঁজার কাজ করছে।

আলোচনায় আওয়ামী লীগ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতারা অংশ নিতে পারবেন কিনা, এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এ প্রশ্নে গেল ৯ জুন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন যেহেতু নির্দলীয় প্রতীকে হয়, নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করলে আওয়ামী লীগসহ যে কোনো দলের যে কেউ তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, এখানে কোনো বাধা তিনি দেখছেন না।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ গত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির নেতাকর্মীরা অংশ নিতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল উপদেষ্টার সামনে।
জবাবে তিনি বলেন, “কোনো রকম কোনো সমস্যা নেই। মানে একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগের...কারণ এটা নির্দলীয়, এখানে কেউই দলের কথা বলবেন না।
“একজন নির্দলীয় ব্যক্তি আসলেন কিন্তু তিনি তার ক্যাম্পেইনে আওয়ামী লীগ বা তাদের যা যা বলার সেগুলো বললেন–সেটা প্রবলেম হবে। এর বাইরে নির্দলীয় ব্যক্তি, তার যে ক্রাইটেরিয়া আছে নির্বাচনটা করার জন্য, সেটা যদি তিনি ফুলফিল করতে পারেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। নিশ্চয় পারেন।”
যদি নির্বাচনে আসা কারো আওয়ামী লীগের পদ-পদবি থাকে, তাহলে কী হবে?
এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, “আওয়ামী লীগের পোস্ট পজিশন... আসলে যেটা হয় আরকি, সংগঠনের কর্মসূচি যেহেতু নিষিদ্ধ আছে, এই পোস্ট পজিশন তিনি তো আসলে ব্যবহার করছেন না, তিনি করতে পারেন না।
“ব্যক্তি হিসেবে যে কেউ যদি ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করতে পারেন, তিনি যদি মনে করেন নির্বাচন করবেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই এই ব্যাপারে।”
তবে সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করতে জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে প্রস্তাব দেওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমে এসেছে।
কার্যাক্রম নিষিদ্ধ কেনো রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতা বা সক্রিয় কর্মীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতে যুক্ত করার কথা বলেছে তারা।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।
গেল ৯ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দলের নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুর আহমেদ বকুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি বলেন, “সারাদেশে আমাদের দলসমর্থিত প্রার্থীরা কাজ করছেন। আমরা এখনো সংখ্যা ঠিক করতে পারিনি। আমাদের একটি দল গঠন করা হয়েছে, তারা প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ করবে।”

সিদ্ধান্ত নেয়নি জাতীয় পার্টি
জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এখনো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি।
দলের চেয়ারম্যান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর আমাদের আস্থা নেই।”
জিএম কাদের বলছেন, তারা দলের ফোরামে আলাপ-আলোচনা করে সংবাদমাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “কেমন নির্বাচন হবে, এটা এখনো বুঝতে পারছি না। আমরা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।”
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রচারে বাধা পাওয়ার অভিযোগ তোলা জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গেল ৯ জুন বরিশালে দলের বিভাগীয় কমিটির মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন।
তিনি বলেছেন, “সরকার যদি প্রথম বছরেই অনিয়মের নির্বাচন করে, তাহলে এই সরকার মুখ থুবড়ে পড়বে। পাঁচ বছর দেশ চালাতে পারবে না।
“সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অসহায়ত্ব দেখেছি। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, সরকার না চাইলে নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ ভোট করতে পারবে না।”
এমনটা যদি হয় তাহলে সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করবে কিনা সেটি আলোচনা করতে হবে, বলেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব।
পুরোনো খবর:
স্থানীয় সরকার নির্বাচন অক্টোবরে করার পরিকল্পনা ধরে ইসির প্রস্তুতি
স্থানীয় নির্বাচন: হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ ৩১ অগাস্ট
আওয়ামী লীগ নেতারা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন? বাধা দেখছেন
আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে 'অযোগ্য' ঘোষণার প্রস্ত
উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে এনসিপির ১০০ প্রার্থী ঘোষণা
পাঁচ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা এনসিপির, আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণে