Published : 21 Jul 2026, 04:43 PM
ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সম্মানের পাশাপাশি, সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্পষ্ট যোগাযোগ।
তবে নিজের প্রয়োজন, কষ্ট বা প্রত্যাশার কথা সরাসরি বলতে পারেন না কেউ কেউ। তার বদলে ইঙ্গিত দেন, আক্ষেপ করেন বা এমনভাবে কথা বলেন যাতে অন্য ব্যক্তি নিজে থেকেই বিষয়টি বুঝে নেয়।
মনোবিজ্ঞানে এই আচরণকে ‘ড্রাই বেগিং’ বলা হয়। এটি এমন এক যোগাযোগের ধরন, যেখানে নিজের প্রয়োজন সরাসরি প্রকাশ না করে ঘুরিয়ে–পেঁচিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়।
এতে সাময়িকভাবে অস্বস্তি এড়ানো গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, ক্ষোভ এবং মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।
যে কারণে সরাসরি বলতে ভয় পায়
সম্পর্ক-বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী সাব্রিনা রোমানোফ রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “সরাসরি কিছু চাইলে অন্যরা অতিরিক্ত দাবি করা মানুষ হিসেবে দেখবে, এমন চিন্তা থেকে বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থেকে কেউ কেউ নিজের প্রয়োজন ঘুরিয়ে প্রকাশ করেন।”
এতে মনে হয় ঝুঁকি কম নেওয়া হচ্ছে। তবে এর ফলে প্রয়োজন পূরণ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিবাহ ও পরিবার-বিষয়ক থেরাপিস্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক শেরিল গ্রসকফ–এর মতে, “এই আচরণের শিকড় অনেক সময় শৈশবে তৈরি হয়। যেসব পরিবেশে শিশুদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, উপহাস করা হয়েছে বা না বলেই সব বুঝে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছে, সেখানে বড় হওয়ার পর অনেকেই মনে করেন নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করাই বিপজ্জনক।”
“ফলে তাদের মনে একটি বিশ্বাস গড়ে ওঠে- যদি অন্যরা সত্যিই ভালোবাসে, তবে না বললেও সে বুঝে নেবে”, বলেন তিনি।
ইঙ্গিতে কথা বলার নেতিবাচক প্রভাব
প্রথমে এই অভ্যাসকে স্বাভাবিক মনে হলেও সময়ের সঙ্গে এটি সম্পর্কে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কারণ যিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তিনি ভাবেন তার কষ্ট কেউ বুঝছে না। অন্যদিকে যিনি শুনছেন, তিনি বুঝতেই পারেন না, আসলে তার কাছে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ফলে একজন নিজেকে অবহেলিত মনে করেন, আর অন্যজন অকারণে দোষারোপের শিকার হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কে মানুষ একে অপরের মনের কথা অনুমান করবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং সমস্যার সমাধানে দুজনেরই অংশীদার হওয়া প্রয়োজন।
স্পষ্ট ভাষায় প্রয়োজন জানালে, ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
যেভাবে এই অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসা যায়
পরামর্শক শেরিল গ্রসকফের পরামর্শ হল, “নিজের অনুভূতি প্রকাশের আগে নিজেকেই একটি প্রশ্ন করা দরকার, ‘যদি বিষয়টি সরাসরি বলি, তাহলে সবচেয়ে খারাপ কী ঘটতে পারে?’ আর নিজের প্রয়োজন জানানো কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি আত্মসম্মান ও মানসিক স্বস্তির জায়গা।”
এক্ষেত্রে একটি কার্যকর পদ্ধতি হল, অভিযোগের পরিবর্তে অনুরোধ করা।
তাই কেউ আমাকে সময় দেয় না বলার বদলে বলা যেতে পারে, ‘এই সপ্তাহটা খুব কঠিন গেছে, তোমার সঙ্গে একটু বেশি কথা বলতে পারলে ভালো লাগবে’।
প্রিয়জন ইঙ্গিতে কথা বললে যা করা উচিত
অনেক সময় পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা জীবনসঙ্গী সরাসরি কিছু না বলে, আক্ষেপের ভাষায় কথা বলেন। এমন পরিস্থিতিতে রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান না; বরং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থেকেই এমন আচরণ করেন।
শেরিল গ্রসকফ–এর পরামর্শ অনুযায়ী, “আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার কাছে কিছু বলতে চাইছ। আমি অনুমান করতে চাই না, তুমি যদি সরাসরি বলো তাহলে আমি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব’, এভাবে বলা যেতে পারে।”
এই ভাষা অন্যকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেয় এবং খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন স্পষ্ট ভাষা
সম্পর্কে ভালোবাসা শুধু অনুভব করলেই হয় না, সেটি ভাষার মাধ্যমেও প্রকাশ করতে হয়।
ইঙ্গিত, আক্ষেপ বা নীরব প্রত্যাশার বদলে নিজের প্রয়োজন স্পষ্টভাবে জানানো এবং অন্যের প্রয়োজন মন দিয়ে শোনার মধ্যেই সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়।
ভুল বোঝাবুঝি, অপ্রয়োজনীয় ক্ষোভ এবং মানসিক দূরত্ব কমাতে খোলামেলা ও সম্মানজনক যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন
পরিচিত হোন ‘পটকা মাছ’ চরিত্রের মানুষের সঙ্গে
ভাসমান বন্ধু: সবার পরিচিত, তবে কারও কাছের নন
বউ থাকলে এক, দূরে থাকলে আরেক: স্বামীদের এই আচরণের আসল রহস্য কী?