Published : 09 Jul 2026, 06:16 PM
একেক সময় একেক বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি, নানান সামাজিক পরিসরে যাতায়াত- বাইরে থেকে দেখলে মনেই হতে পারে তাদের সামাজিক জীবন বেশ সমৃদ্ধ।
তবে এদের মধ্যেই কেউ কেউ গভীর একাকিত্বে ভোগেন। কারণ এদের অনেক পরিচিত থাকলেও, এমন একজন মানুষও থাকেন না, যিনি খোঁজ নেবেন, মন খারাপ বুঝবেন বা কোনো কারণ ছাড়াই যোগাযোগ করবেন।
মনোবিজ্ঞান এই ধরনের মানুষকে বলা হয়ে “ফ্লোটার ফ্রেন্ডস’ বা ভাসমান বন্ধু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো মানসিক সমস্যা বা ব্যক্তিত্বের ত্রুটি নয়। বরং জীবনের নানান পরিবর্তন, সামাজিক বাস্তবতা এবং সম্পর্ক গড়ে তোলার ধরন একজনকে ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।
তাই জানতে হবে এই ধরনের বন্ধুত্ব কেন তৈরি হয় এবং এর থেকে বের হয়ে কীভাবে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব?
ভাসমান বন্ধু বলতে যা বোঝায়
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী লরেন মাহোনি রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “ভাসমান বন্ধু, সহজেই বিভিন্ন বন্ধুমহলের সঙ্গে মিশতে পারেন। একাধিক সামাজিক পরিসরে সম্পর্ক ধরে রাখেন। তবে কোনো একটি বন্ধুমহলের কাছের অংশ হয়ে উঠতে পারেন না।”
অর্থাৎ তিনি অনেক জায়গায় পরিচিত, তবে কোথাও যেন পুরোপুরি নিজের মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। বাইরে থেকে তার সামাজিক জীবন ব্যস্ত মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে অনুভব হয় কোথাও তার স্থায়ী জায়গা নেই।
পরিচিত মানুষ বেশি থাকলেই গভীর বন্ধুত্ব হয় না
যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত সমাজকর্মী মেগান গোল্ডবার্গ একই প্রতিবেদনে বলেন, “ফ্লোটার বা ভাসমান বন্ধুর ক্ষেত্রে সম্পর্কের বিস্তৃতি থাকলেও গভীরতা কম থাকে। কোনো আড্ডায় গিয়ে অনেক সময় অনুভব হয়, অন্য সবাই পুরানো স্মৃতি, ব্যক্তিগত রসিকতা কিংবা একসঙ্গে কাটানো অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন, কিন্তু তিনি যেন সেই বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।”
যেভাবে একজন ভাসমান বন্ধু হয়ে ওঠেন
শুধু ব্যক্তিত্বের কারণেই এমন হয় না, জীবনের নানান পরিবর্তনও গভীর সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
মেগান গোল্ডবার্গের মতে, “নতুন শহরে চলে যাওয়া, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ, পরিবারকে বেশি সময় দেওয়া বা জীবনের কঠিন সময় অনেক মানুষকে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তখন বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও, গভীর সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।”
অনেকেই আবার না জেনেই এমন আচরণ করেন, যাতে অন্যরা মনে করেন তিনি কেবল সাধারণ পরিচয়েই থাকতে চান।
সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তনও বড় কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী ও বন্ধুত্ববিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টি ফেরারি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগের ধরনও এই প্রবণতা বাড়িয়েছে।
আগে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে মুখোমুখি দেখা করা ও একসঙ্গে সময় কাটানো জরুরি ছিল। এখন অন্যের ছবি, ভ্রমণ, জন্মদিন বা সাফল্যের খবর দেখে মনে করা হয় সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
তবে কারও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি, সংগ্রাম কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানার জন্য বাস্তবে একসঙ্গে সময় কাটানোর বিকল্প নেই।
এই কারণে অনেক সম্পর্কেই পরিচয় থাকে, তবে আন্তরিকতা তৈরি হয় না।
ভাসমান বন্ধু হওয়ার ইতিবাচক দিক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা সব সময় নেতিবাচক নয়।
লরেন মাহোনি বলেন, “এই ধরনের মানুষ সাধারণত সামাজিকভাবে দক্ষ, নতুন পরিবেশে সহজে মানিয়ে নিতে পারেন। ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় মানুষের সঙ্গে সহজেই সম্পর্ক তৈরি করতে জানেন। অনেক সময় বন্ধুমহলের মধ্যে সংযোগ তৈরির কাজও করেন।”
এছাড়া নতুন কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়তে, এই দক্ষতা বিশেষভাবে কাজে আসে।
তবুও একাকিত্বের বেড়াজাল
নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ আসে, তবুও মনে প্রশ্ন আসে— আমি অসুস্থ হলে কে খবর নেবে? আমার সাফল্যে কে নিজের থেকে আনন্দিত হবে? আমি মন খারাপ করলে কে বুঝতে পারবে?
লরেন মাহোনি বলেন, “মানুষের শুধু মানুষের সঙ্গে দেখা করাই যথেষ্ট নয়। প্রত্যেকেরই প্রয়োজন এমন কিছু সম্পর্ক, যেখানে তিনি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপদ, মূল্যবান বলে অনুভব করবেন।”
গভীর বন্ধুত্ব যেভাবে গড়ে তোলা যায়
একসঙ্গে অনেক মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করার পরিবর্তে একজন বা দুজন মানুষের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানোর চেষ্টা করা বেশি কার্যকর।
মেগান গোল্ডবার্গ পরামর্শ দেন, “নিয়মিত যোগাযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে খোঁজ নেওয়া, আগের কোনো কথোপকথনের বিষয় মনে রেখে আবার জানতে চাওয়া বা দেখা করার পরিকল্পনায় ধীরে ধীরে বিশ্বাস তৈরি করে।”
আরও পড়ুন