Published : 30 Jun 2026, 04:04 PM
শৈশব কিংবা কৈশোরের বন্ধুত্ব সহজ। প্রতিদিন দেখা হওয়া, গল্প, একসঙ্গে পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা ঘুরে বেড়ানো সবকিছুই থাকে স্বাভাবিক। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সহজ সম্পর্কগুলোই ধীরে ধীরে বদলে যায়।
এক্ষেত্রে কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়া, নতুন পরিবার আসা, আবার অন্য শহর বা দেশে চলে যাওয়ার মতো নানান কারণ থাকতে পারে।
তাই একসময় যে বন্ধুকে ছাড়া দিন কল্পনা করা যেত না, তার সঙ্গে হয়ত বছরে একবারও কথা হয় না।
এই পরিবর্তন অনেকের কাছেই কষ্টের। তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়সের সঙ্গে বন্ধুত্বের পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক একটি মানবিক অভিজ্ঞতা।
ঝগড়া বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে সব দূরত্ব তৈরি হয় না। জীবনের নতুন বাস্তবতা, দায়িত্ব এবং অগ্রাধিকারও বন্ধুত্বের ধরন বদলে দেয়।
কেন বয়সের সঙ্গে বন্ধুত্ব বদলে যায়?
মার্কিন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লরেন গ্রাওয়ার্ট রিয়েলসিম্পল ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “বয়স যখন ২০ তখন, বেশিরভাগ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে একই জায়গায় থাকা, একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা কিংবা কর্মজীবনের শুরুতে একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে। কাছাকাছি থাকার কারণে নিয়মিত যোগাযোগও সহজ হয়।”
তবে তিরিশের পর জীবন অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে। কর্মক্ষেত্রের চাপ বাড়ে, সংসার শুরু হয়, সন্তান লালন-পালন কিংবা পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্বে, বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত দেখা করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
মানুষ বদলায়, বদলে যায় সম্পর্কও
যুক্তরাষ্ট্রের থেরাপিস্ট মাতকো মোসুনিয়াক একই প্রতিবেদনে বলেন, “বিশ থেকে তিরিশের মধ্যবর্তী সময় মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ এবং জীবনের লক্ষ্য সবচেয়ে বেশি পরিবর্তিত হয়।”
কেউ নিজের কর্মজীবনকে গুরুত্ব দেন, কেউ পরিবারকে, কেউ আবার নতুন কোনো আগ্রহ বা জীবনধারা বেছে নেন। ফলে যাদের সঙ্গে একসময় মিল ছিল, সময়ের সঙ্গে তাদের চিন্তা ও জীবনযাত্রায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
এই পরিবর্তনের ফলে অনেক বন্ধুত্ব স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে যায়, যদিও এর পেছনে কোনো বড় ধরনের দ্বন্দ্ব থাকে না।
সব দূরত্বের পেছনে ঝগড়া থাকে না
অনেকেই মনে করেন, বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা তিক্ত ঘটনা ঘটেছে। তবে জীবনের নতুন দায়িত্ব, কর্মব্যস্ততা, ভিন্ন শহরে বসবাস, পরিবারের প্রয়োজন কিংবা স্বাস্থ্যগত সমস্যা- এসব কারণেও ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে পারেন।
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের এই পরিবর্তনকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এটি জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ।
বন্ধুত্ব হারানোর কষ্ট কেন এত গভীর?
অনেকেই অবাক হন, একট বন্ধুত্ব হারিয়ে কেন এত কষ্ট লাগে।
লরেন গ্রাওয়ার্ট বলেন, “মস্তিষ্ক সামাজিক সম্পর্ক হারানোর অনুভূতিকেও অন্য ধরনের শোকের মতোই গ্রহণ করে। তাই কোনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেললেও গভীর শূন্যতা, একাকিত্ব কিংবা বিষণ্নতা অনুভব করা স্বাভাবিক।”
বন্ধুত্ব শুধু একজনকে হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবনের একটি সময়, অসংখ্য স্মৃতি এবং একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের কল্পনাও হারিয়ে যায়।
শোককে স্বীকার করাও জরুরি
অনেক মানুষ নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, যেহেতু কোনো ঝগড়া হয়নি, তাই কষ্ট পাওয়ারও কিছু নেই।
লরেন গ্রাওয়ার্ট মনে করেন, এই ধারণা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, “একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুত্বের সমাপ্তি মেনে নেওয়া এবং নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করা মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি।”
কষ্টকে অস্বীকার না করে গ্রহণ করতে পারলেই, ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়।
সম্পর্কের শেষ মানেই দোষারোপ নয়
বন্ধুত্ব শেষ হওয়ার পর, অনেকেই বারবার ভাবতে থাকেন কার ভুল ছিল? কী করলে সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখা যেত?
মাতকো মোসুনিয়াক বলেন, “এই ধরনের নেতিবাচক ব্যাখ্যা অনেক সময় মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।”
তার মতে, “সম্পর্ক শেষ হওয়ার বিষয়টাকে, কিছুটা বড় চিন্তার জায়গা থেকে দেখা উচিত। জীবনের প্রতিটি সম্পর্কই চিরস্থায়ী হবে না। কিছু সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তারপর সেটা স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়।”
সুন্দর স্মৃতিগুলোকে গুরুত্ব
বন্ধুত্ব শেষ হয়ে গেলেই, তার সব স্মৃতি মুছে ফেলতে হবে এমন নয়।
এই বিশেষজ্ঞদের পরাশর্শ হল- বরং সম্পর্কটি থেকে কী শেখা গেল, কত সুন্দর মুহূর্ত মিলল, সেগুলো মনে রাখা মানসিকভাবে অনেক বেশি ইতিবাচক।
অতীতকে অতিরিক্ত রোমান্টিক না করেও, ভালো স্মৃতিগুলোকে মূল্য দেওয়া সম্ভব। এতে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার মানসিক শক্তিও তৈরি হয়।
নতুন বন্ধুত্ব গড়তে সাহস দরকার
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে নতুন বন্ধু তৈরি করা সহজ নয়। ব্যস্ততা, দায়িত্ব এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থাকেই।
মাতকো মোসুনিয়াক পরামর্শ দেন, “হঠাৎ খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরির চেষ্টা না করে, এমন পরিবেশে নিয়মিত যাওয়া উচিত, যেখানে একই মানুষদের সঙ্গে বারবার দেখা হয়।”
পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ
অনেক সময় নতুন বন্ধুত্ব খোঁজার চেয়ে পুরানো সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করাই সহজ হতে পারে। বহুদিন কথা হয়নি, এমন কোনো বন্ধুকে একটি সাধারণ বার্তা পাঠিয়েও যোগাযোগ শুরু করা যায়।
তবে প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত। আগে যেমন ছিল, সম্পর্ক হয়ত আর ঠিক তেমন হবে না। তবে নতুন বাস্তবতায়, সেই বন্ধুত্ব নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।
বর্তমান সম্পর্কগুলো হোক আরও শক্তিশালী
নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বর্তমান বন্ধুদের প্রতিও সময় দেওয়া জরুরি। একসঙ্গে চা পান, নিয়মিত খোঁজ নেওয়া কিংবা ছোট কোনো আড্ডার আয়োজন এসব উদ্যোগই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে কার্যকর হতে পারে।
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, “বন্ধুত্ব টিকে থাকে নিয়মিত যোগাযোগ, আন্তরিকতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর।”
আরও পড়ুন