Published : 19 Sep 2026, 02:21 PM
“জিন্নাহ না হলে পাকিস্তান হতো না, আর পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও হতো না”—মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে এই বয়ানটিই বোধহয় সবচেয়ে চমকপ্রদ।
কারা এই বয়ান সামনে আনছেন এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য আমাদের অজানা নয়।
প্রথমবার শুনলে মনে হবে কথায় বেশ যুক্তি আছে তো! যেহেতু জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, পাকিস্তান থেকেই একদিন বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে; অতএব বাংলাদেশও বুঝি পাকিস্তানেরই কোনো না কোনো ‘বাই-প্রোডাক্ট’! যুক্তিবিদ্যার সেই সহজ সমীকরণের মত: গরু ঘাস খায়, মানুষ যেহেতু গরু খায়, তাহলে মানুষও ঘাস খায়।
কিন্তু ইতিহাস যে এতটা সরল নয়! একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার আগে ঘটেছে—এটুকু দিয়ে কখনোই প্রমাণ হয় না যে প্রথম ঘটনাটিই দ্বিতীয়টির কারণ। কালানুক্রম আর কারণ-পরম্পরা এক জিনিস নয়।
পাকিস্তানের জন্ম ১৯৪৭ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ১৯৭১ সালে—এই দুই ঘটনার মাঝখানে ছিল চব্বিশ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাসে ছিল ভাষার প্রশ্ন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বিরোধ, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। সেই দেশ কি করে পাকিস্তানের বাই-প্রোডাক্ট হয়? চারটি প্রধান বিষয়ের আলোকে আমরা তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।
১৯৪০ থেকে ১৯৪৬: লাহোর প্রস্তাবের বহুবচন ‘States’ (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ) শব্দটিকে দিল্লিতে একবচন ‘State’ (একক রাষ্ট্র)-এ রূপান্তরের মাধ্যমে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বদলে দেন ভবিষ্যৎ ভূখণ্ডের পথরেখা।
প্রথমত, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে বহুরাষ্ট্রের ধারণা থেকে ১৯৪৬ সালে কীভাবে মুসলিম লীগ একটি একক পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ধারণার দিকে এগিয়ে গেল।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের ‘বাই-প্রোডাক্ট’ হয়, তাহলে পাকিস্তান সৃষ্টির পর একই ভূখণ্ডের অন্য বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলো কেন একইভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলো না।
তৃতীয়ত, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে কী ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্য তৈরি হয়েছিল; এবং
চতুর্থত, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কীভাবে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিল।
লাহোর প্রস্তাবের বহুরাষ্ট্রের ধারণা থেকে এক পাকিস্তান
শুরু করা যাক ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব দিয়ে। ২৩ মার্চ ১৯৪০-এ অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যে ’লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপন করেন, সেখানে উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ’Independent States’ বা স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে বলা হয়েছিল, দেশগুলোর চরিত্র হবে ’autonomous and sovereign.
কিন্তু এর পরের সাত বছরে পাশা উল্টে যায়। ১৯৪৬ সালের ৭ – ৯ এপ্রিল দিল্লিতে মুসলিম লীগ আইনপ্রণেতাদের কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় ’states’-এর পরিবর্তে ’state’ ব্যবহৃত হয়। বঙ্গ-আসামসহ পূর্বাঞ্চল এবং পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধ ও বেলুচিস্তানকে নিয়ে একটি ’sovereign independent state’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
এটি নিছক একটি অক্ষরের পরিবর্তন ছিল না। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল বিপুল। ১৯৪০-এর প্রস্তাবে যে বহুসার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, মুসলিম লীগ সেই দরজা বন্ধ করে দিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমসহ বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ধর্মভিত্তিক বঙ্গভঙ্গের পরিবর্তে স্বাধীন ও অবিভক্ত বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে সমান প্রতিনিধিত্ব এবং একটি পৃথক সাংবিধানিক কাঠামোর রূপরেখা ছিল। কিন্তু মে মাসের ৪ তারিখে জিন্নাহ তার সরকারি বিবৃতিতে বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভাজনের বিরোধিতা করেন। ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভসে এর দলিল দস্তাবেজ সংরক্ষিত আছে।
ব্যাপারটা এমন নয় যে, জিন্নাহ একা বসে ’States’ থেকে ‘S’ কেটে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় জিন্নাহ ছিলেন দেশভাগের মুসলমান অংশের প্রধান মুখ, মুসলিম লীগের প্রধান। ফলে পাকিস্তান কী ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে—এই প্রশ্নে জিন্নার কথাই ছিল শেষ কথা এবং সেটিই হয়েছে।
এখানেই ওপরে উত্থাপিত প্রশ্নের আংশিক উত্তর মেলে। যে ব্যক্তির রাজনৈতিক নেতৃত্বে বহুরাষ্ট্রের ধারণা বিলুপ্ত হয়ে একক পাকিস্তানি রাষ্ট্রের দিকে এগোল, সেই ব্যক্তিকে ২৪ বছর পর এসে স্বাধীনতা অর্জন করা বাংলাদেশের রূপকার কোন ভিত্তিতে বলা যায়? বরং উল্টো এই প্রশ্ন করা যায় যে, জিন্নাহ কি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলেন, নাকি পাকিস্তান সৃষ্টি করার জন্য বাংলায় বহু রাস্ট্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছেন?
তাহলে ৭৯ বছরে আর কোনো রাষ্ট্র হলো না কেন?
বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের ‘বাই-প্রোডাক্ট’ হয়, যদি পাকিস্তান সৃষ্টি করলেই তার ভেতর থেকে বাংলাদেশের মতো নতুন রাষ্ট্রের জন্মের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে থাকে, তাহলে কাশ্মীর, বেলুচিস্তান ও পাকিস্তানের অন্যান্য বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলো একইভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলো না কেন?
শুধু বাংলা নয়, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের প্রাক্কালে বেলুচিস্তান ও কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলাদা রাজনৈতিক প্রশ্ন ছিল। বাংলার মত বেলুচিস্তান ও কাশ্মীরও কখনোই পাকিস্তানের অংশ ছিল না। জম্মু ও কাশ্মীর এমনকি ব্রিটিশ শাসনের অধীনেও ছিল না; সেখানে মহারাজার রাজত্ব ছিল, তবে ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব মানতে হত। ফলে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব শেষ হলে কাশ্মীরের স্বাধীন দেশ হওয়ার সুযোগ ছিল।
বেলুচিস্তানের বিষয়টি আরও জটিল। এখনকার পুরো বেলুচিস্তান এককভাবে ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল না। ব্রিটিশ বেলুচিস্তান ছিল সরাসরি ব্রিটিশ ভারতের অধীনে, এবং কালাত ছিল ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তিতে থাকা একটি স্বতন্ত্র দেশ। ১৯৪৭ সালেই কালাত স্বাধীনতার দাবি তোলে; কিন্তু জিন্নাহর পরিকল্পনামাফিক ১৯৪৮ সালে তাদেরকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়।
সেই দাবি আজও স্তিমিত হয়নি। গত কয়েক দশকে সেখানে স্বাধীনতার দাবিতে তৎকালীন বাংলাদেশের মতই স্বাধীনতাকামী সংগঠন গড়ে ওঠেছে। পার্থক্য হলো, বাংলাদেশ সেই আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতায় রূপান্তর করতে পেরেছে, কাশ্মীর, বেলুচিস্তান বা কালাত পারেনি।
১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নিচ্ছেন সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মওলানা ভাসানী ও তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।
এর বড় কারণ নেতৃত্ব। বাংলাদেশ এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী এবং এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতা পেয়েছে, যারা ভাষার অধিকার থেকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবিকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেছেন। বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেছিলেন শোষকের বিরুদ্ধে বজ্র কণ্ঠস্বর।
তাই বাংলাদেশ পাকিস্তানের ‘বাই-প্রোডাক্ট’—এই দাবি তো খাটেই না; বরং বাংলাদেশের জন্মকে বুঝতে হলে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সে সময় কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি বোঝা জরুরি।
সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও বৈষম্যের শিকার
এটি ঠিক যে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পূর্ব বাংলার বিপুলসংখ্যক মানুষ পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর খুব দ্রুত এই মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে যে, এই রাষ্ট্র কি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রাপ্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার দেবে? মূলত এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছে।
জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রক্ষমতার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্যের এক বহুমাত্রিক কাঠামো। কিছু বৈষম্যের নুমনা দেখা যাক।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ১৯৪৮–৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় ৩ শতাংশ কম ছিল। কিন্তু ১৯৬৯–৭০ নাগাদ পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি হয়ে যায়।
উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ছিল বিশাল ফারাক। ১৯৫০-এর দশকের প্রথম ভাগে পূর্ব পাকিস্তান মোট উন্নয়ন ব্যয়ের ২০ শতাংশ পেয়েছিল, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগ ছিল ৮০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ কিছুটা বাড়ে—১৯৬৫–৭০ সময়ে তা ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয় বটে, কিন্তু তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিবেচনায় এই বৈষম্য অনেক।
জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রক্ষমতার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্যের এক বহুমাত্রিক কাঠামো।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ডাটা বলছে, ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের বৃহৎ শিল্পের ৭০ শতাংশেরও বেশি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে; অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান ছিল পাটসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় উৎস। ফলে বাঙালির অসন্তোষ কেবল ‘আমাদের টাকা নিয়ে যাচ্ছে’—এই সরল অভিযোগে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রশ্নটি ছিল আরও গভীর। যে অঞ্চলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাস করে এবং যে অঞ্চল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখে, সেই অঞ্চল কেন রাষ্ট্রের শিল্প, প্রশাসন, সামরিক শক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে না?
প্রশাসনের দিকে তাকানো যাক। ১৯৫৬ সালের কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯ জন সচিবের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের একজনও ছিলেন না; ৪১ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে ছিলেন মাত্র ৩ জন; ১৩৩ জন ডেপুটি সচিবের মধ্যে ১০ জন এবং ৫৪৮ জন আন্ডার সেক্রেটারির মধ্যে ৩৮ জন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের।
১৯৬৮–৬৯ সালে প্রতিরক্ষা বিভাগে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ ছিল মাত্র ১০ শতাংশ, পশ্চিম পাকিস্তানের ৯০ শতাংশ; ক্যাবিনেট বিভাগে এই অনুপাত ছিল ১৩ ও ৮৭। সামরিক ক্ষেত্রের বৈষম্য ছিল আরও প্রকট। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল ২ শতাংশ।
অর্থাৎ সমস্যা কেবল অর্থের ছিল না। রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোথায় গড়ে উঠবে, প্রশাসনে কারা সিদ্ধান্ত নেবে, সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গেও পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনার অনুভূতি জড়িয়ে পড়েছিল।
ভাষা থেকে স্বায়ত্তশাসন
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। অথচ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। এই ভাষাগত বিরোধই পরে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি তৈরি করে।
তবে দৃশ্যটা একবার ভাবুন। যে জিন্নাহ এর আগে কোনোদিন বাংলাদেশে আসেননি, এমনকি ৪৭ এর হিন্দু-মুসলমানের নির্মম দাঙ্গার পরেও নয়, সেই জিন্নাহ প্রথমবারের মত ঢাকায় এসে মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক ২১ দফার বার্তা নিয়ে জনমানুষের দ্বারে দ্বারে—১৯৫৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
এরপরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটেছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ধাপেই বাঙালির দাবি জোরালো রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।
খেয়াল করুন, বাঙালির দাবি শুরু থেকেই স্বাধীনতা ছিল না। প্রথমে ছিল ভাষার অধিকার, এরপর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি। অর্থাৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে থেকেই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দীর্ঘদিন চলেছে। স্বাধীনতার দাবি সামনে এসেছে সেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিণত পর্যায়ে।
১৯৭০: শেষ গণতান্ত্রিক সুযোগ
এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি লাভ করে এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অর্থাৎ বাঙালিরা তখন পাকিস্তান ভেঙে ফেলার কোনো নির্বাচনীভাবে বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী ছিল না; তারা পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার অর্জন করেছিল।
কিন্তু সেই গণরায় বাস্তবায়িত হলো না। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হলো, রাজনৈতিক সংকট তীব্র হলো এবং মার্চ ১৯৭১-এ নিজ দেশের জনগণের ওপর সামরিক গণহত্যা শুরু করল।
এখানেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পথ চূড়ান্তভাবে আলাদা হয়ে যায়। দেখা যায়, ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ পরিহাসটি। যে জনগোষ্ঠী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়ে নির্বিচারে প্রাণ দিল, সেই একই জনগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
তারপর এলো একাত্তর
এরপর তো একাত্তর এল। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর নয় মাসের যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত এবং ২ লাখের বেশি নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। পৃথিবীর তাবৎ দলিলই বলে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল ১৯৪৭-এর পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমাগত অবনতি হওয়া সম্পর্কের ধারাবাহিক পরিণতি; রাষ্ট্রভাষা, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং প্রতিরক্ষার প্রশ্নগুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই অংশের সম্পর্ককে সংকটে ফেলেছিল।
তাই নি:সন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশ কারো বাই-প্রোডাক্ট নয়। বরং বাংলাদেশ হলো পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে জমে ওঠা বৈষম্য, বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক সংঘাত, রাজনৈতিক অধিকারহীনতা এবং গণরায় অস্বীকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিরোধের পরিণতি। বরং “পাকিস্তান হয়েছিল বলেই বাংলাদেশ হয়েছে”—এই লাইনের অর্থ হলো, ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে অদৃশ্য করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে কারা ও কেনো হঠাৎ করে জিন্নাহকে তাদের প্রয়োজন হচ্ছে, চতুর্থপর্বে সেটি খোঁজার চেষ্টা করবো।
ফলে ইতিহাসের প্রশ্নটি—“পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো কি না” নয়; বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—কেন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত নিজেদের দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে নামতে বাধ্য হলো? সেই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের জন্মের প্রকৃত ইতিহাস।
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পরিচালিত প্রকল্পে ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। ই-মেইল: raju_norul@yahoo.com
জিন্নাহপ্রীতি-১: ইনকিলাব মঞ্চ কেন জন্মদিন পালন করে, ডাকসু কেন ছবি ঝুলায়?