জিন্নাহপ্রীতি-১: ইনকিলাব মঞ্চ কেন জন্মদিন পালন করে, ডাকসু কেন ছবি ঝুলায়?
নামাজ-রোজা না জানা, হুইস্কি ও কিউবান সিগারে অভ্যস্ত জিন্নাহ কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের একদল ধর্মবাদীর কাছে প্রতীক হয়ে উঠলেন?
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামাজ পড়তেন না, রোজা রাখতেন না এবং অত্যন্ত বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও কখনো হজ করতে যাননি। ঈদের নামাজ ছাড়া তাকে কখনো মসজিদে দেখা যেত না। এমনকি শুক্রবারেও না।
দ্বিখণ্ডিত ভারতের মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের কায়েদে আজম (জাতির পিতা) একসময় নামাজ কীভাবে পড়তে হয় তা-ও জানতেন না! জিন্নাহর নামাজ পড়তে না জানার ঘটনাটি খালেদ লতিফ গৌবার জনপ্রিয় আত্মজীবনী ‘ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফোজ: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ বইয়ে সবিস্তারে উল্লেখ আছে—যা উর্দুতে ‘আপনে অউর পরায়ে’ নামে অনূদিত এবং বহুল পঠিত হয়েছে।
জিন্নাহর জীবনাচার সম্পর্কে আরও বিশদে কিছু কথা বলবার আগে বলে রাখতে চাই, কারোর ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মবিশ্বাস, চর্চা কিংবা খাদ্যাভ্যাস—কোনোটি নিয়েই ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো সমস্যা নেই। কে কীভাবে বাঁচবেন, তা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও জীবনদর্শনের বিষয়। জিন্নাহর তথাকথিত 'অনৈসলামিক' অভ্যাসের খতিয়ান তোলার উদ্দেশ্যও তাকে আক্রমণ করা নয়। তবে বিস্ময় জাগে তখন, যখন হঠাৎ করেই দেখছি বাংলাদেশের একদল মানুষের ভেতরে জিন্নাহপ্রীতি উথলে উঠছে, যে জিন্নাহর জীবনচর্চার সঙ্গে নব্য জিন্নাহপ্রেমীদের মূল্যবোধের দূরতম সম্পর্কও ছিল না।
‘ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফোজ: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ জিন্নাহকে জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য একটি বই। বইটির লেখক খালেদ লতিফ গৌবার আসল নাম কানহাইয়া লাল গৌবা। লাহোরের অত্যন্ত ধনী ও অভিজাত হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া খালেদের পিতা লালা হরকিশেন লাল ছিলেন পাঞ্জাবের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, ব্যাংকার ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। ১৯২৩ সালে এক মুসলিম নারীকে বিয়ে করার পর গৌবার জীবন নাটকীয় মোড় নেয়; ১৯৩৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি।
মুসলমান হওয়ার পর তিনি মুসলিম-অধ্যুষিত নির্বাচনি এলাকা থেকে পাঞ্জাব আইনসভার সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন এবং পরে কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়েই মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতা, পরবর্তীকালে পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং তিনি জিন্নাহকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
১৯৩৬ সালে লাহোরের বিখ্যাত 'শহীদগঞ্জ মসজিদ' নিয়ে মুসলিম ও শিখদের মধ্যে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও দাঙ্গা বাধলে পাঞ্জাবের মুসলিম নেতারা জিন্নাহকে মধ্যস্থতা করার জন্য লাহোরে আমন্ত্রণ জানান। সেই সময় জিন্নাহর সঙ্গে ছিলেন গৌবা।
একপর্যায়ে পাঞ্জাবের সাধারণ মুসলমানদের সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার জন্য আহ্বান জানানো হলে জিন্নাহ বিপাকে পড়েন। গৌবাকে একান্তে ডেকে বলেন যে তিনি নামাজ পড়ার সঠিক নিয়মকানুন জানেন না। তখন গৌবা তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “মসজিদে অন্যরা যা করবে, আপনিও শুধু তাদের দেখাদেখি সেটাই অনুকরণ করবেন।” পরবর্তীতে জিন্নাহ ঠিক তা-ই করেছিলেন এবং এই ঘটনা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সহায়তা করেছিল।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন ব্রিটিশ-অধ্যুষিত ভারতের একজন নামকরা উকিল। তুখোড় স্মার্ট, চিরকাল ক্লিন-শেভড—এই ব্যক্তির জীবনযাপন ছিল পুরোপুরি ইউরোপীয় ঘরানার, কারণ বিত্তবান পিতার এই সুদর্শন পুত্রটি বড় হয়েছেন ব্রিটিশ পরিসরে। ছিলেন চেইন স্মোকার। সারাক্ষণ চুরুট ঝুলে থাকত তার ঠোঁটে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করাচিতে জিন্নাহর দিনটা শুরু হতো সকাল সাড়ে আটটার দিকে। একটা বড় টেবিলে তার জন্য ফাইলবন্দি কাগজপত্রের একটা স্তূপ রাখা থাকত। পাশেই থাকত ‘ক্রেভিন-এ’ নামের সিগারেটের বাক্স ও সুগন্ধি কিউবান সিগার। সেই সিগারের গন্ধে সারা ঘর ম ম করত।
স্যুট ছাড়া তাকে কোনোদিন দেখা যায়নি। বিভিন্ন সূত্র বলছে, তার সংগ্রহে ছিল ২০০টির বেশি স্যুট। একই সিল্কের টাই তিনি কখনো দুবার পরেননি। ব্যাকব্রাশ চুলে তার আভিজাত্য ঠিকরে বেরোত।
জীবনের শেষ পর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু তখনো ফর্মাল পোশাক ছাড়া অন্য কিছু পরতে অস্বীকার করেছেন। বলতেন, “আমি পায়জামা পরে ভ্রমণ করব না।” এমন এক টুপি তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন, যেটি ‘জিন্নাহ টুপি’ নামে পরিচিত ছিল। ওটা যতটা না ধর্মের টুপি ছিল, তারও বেশি ছিল স্যুটের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্যাশনের অংশ, যেমন ছিল মুজিব কোট, পাঞ্জাবির সঙ্গে মানানসই।
জিন্নাহর মৃত্যু নিয়ে আরও দুটো লাইন যোগ করা দরকার। জিন্নাহর শরীরে বাসা বেঁধেছিল এক জটিল রোগ। তার চিকিৎসক ডা. জল রতনজি প্যাটেল এক্স-রে প্লেটে চোখ রেখেই দেখতে পেয়েছিলেন তার ফুসফুসে ছোপ ছোপ দাগ। কিন্তু সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন সেটি।
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহকে কোয়েটা থেকে ভাইকিং বিমানে চাপিয়ে করাচি নিয়ে আসা হয়। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ওজন তখন মাত্র ৪০ কিলোগ্রাম। যে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে গভর্নর হাউসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, মাঝপথে সেটার পেট্রল শেষ হয়ে যায়।
ভাবা যায়, পাকিস্তানের জন্মদাতা, প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ওরকম শারীরিক অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের তেল শেষ হয়ে গেল মাঝপথে! সামরিক সচিব অনেক চেষ্টা করে ঘণ্টাখানেক পরে একটা অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। অ্যাম্বুলেন্সেই জিন্নাহর পালস কমে আসছিল। সে রাতেই তিনি মারা যান। নিজের জন্ম দেওয়া দেশে, অবহেলায়।
বিয়ে করেছিলেন মুম্বাইয়ের পার্সি এক ধনী পরিবারের মেয়েকে, তার স্ত্রীর নাম রতনবাই পেতিত। এটি তার দ্বিতীয় বিয়ে। সেই বিয়ে গোটা দেশের অভিজাত পল্লীতে হইচই ফেলে দিয়েছিল। ১৯২৯ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ছিলেন। মনে করা হয়, রতনের মধ্যে—নাম পরিবর্তন করে যিনি পরে মরিয়ম জিন্নাহ হয়েছিলেন—জিন্নাহ সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলেন।
তাদের একমাত্র কন্যাসন্তান দিনা ওয়াদিয়া। তার বাবার তৈরি করা দেশ পাকিস্তানে না গিয়ে ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর পেছনে কাজ করেছে ব্যক্তিগত পছন্দ, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং বাবার সঙ্গে হওয়া দূরত্ব। দিনা মুম্বাইয়ের এক ধনী পার্সি ব্যবসায়ী নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। জিন্নাহ এই বিয়েতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং মুসলিম পাত্র বেছে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন মেয়েকে। কিন্তু দিনা নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে নেভিলকে বিয়ে করায় বাবার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। মুম্বাই ছাড়াও ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায় বসবাস করেছেন তিনি। দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন, ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
বিখ্যাত জীবনীকার স্ট্যানলি ওলপার্ট লিখেছেন, জিন্নাহর পছন্দের পানীয় ছিল হুইস্কি। এমন সব পশ্চিমা খাবার তার তালিকায় ছিল (যেমন শূকরের মাংস), যেগুলো মুসলমানদের জন্য হারাম।
জন্ম নিয়েছিলেন শিয়া পরিবারে, সুন্নিরা যাদেরকে মুসলমানই মনে করেন না। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন হিন্দু লোহানা বংশোদ্ভূত। যদিও জিন্নাহ নিজেকে কোনো মাজহাবে না রেখে ‘সাধারণ মুসলমান’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। নানা নথিতে দেখা যায়, জাত-পাত, গোত্র-মাজহাবে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না।
জিন্নাহ পড়েছেন আইন। পেশায় ঢোকার আগে ইংল্যান্ডের এক নাট্যদলে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু বাবার কড়া চিঠি পেয়ে আর এগোননি। না হলে ওখানেও যে তিনি ভালো করতেন এ নিয়ে সন্দেহ নেই। জিন্নাহ নাটক নিয়ে ইংল্যান্ডে থিতু হয়ে গেলে পরবর্তীকালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হতো কিনা—সেটি নিয়ে আলোচনা করাই যায়।
দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রূপকার জিন্নাহর সঙ্গে ধর্মের ন্যূনতম সংযোগ না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বানাতে গিয়ে ভারতবর্ষে রক্তের গঙ্গা বয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো গবেষকের মতে, সেসময় অন্তত ২০ লাখ মানুষ একে অপরকে হত্যা করেছে। দেড় কোটি মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
এর পেছনে জিন্নাহর ঠিক কোন মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে? এটি বুঝতে মওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ বইটির দিকে তাকানো যেতে পারে। স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের এই সাবেক সভাপতি। আজকের ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা আজাদের মস্তিষ্কপ্রসূত। ফলে ভারতের শিক্ষা দিবসও এই ‘মুসলমান’ নেতার জন্মদিনে উদযাপন করা হয়।
মওলানা আজাদ লিখেছেন, এর পেছনে কাজ করেছে জিন্নাহর অহং। এই অহং কোনো ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে আসেনি, বরং এটি ছিল তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাশা, ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং কংগ্রেস নেতাদের কিছু কৌশলগত ভুলের সম্মিলিত ফল।
উদাহরণ দিতে গিয়ে আজাদ তার বইয়ে একটি ঐতিহাসিক মোড়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যা জিন্নাহকে চূড়ান্তভাবে জেদি করে তুলেছিল। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একসঙ্গে লড়ার পর, কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তখন মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভায় দুটি আসন চেয়েছিল। কিন্তু জওহরলাল নেহরু শর্ত দেন যে মুসলিম লীগের সদস্যদের লীগে ইস্তফা দিয়ে কংগ্রেসে যোগ দিতে হবে।
আজাদ এই ঘটনাকে কংগ্রেসের একটি ‘মস্ত বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি লিখেছেন, এই ঘটনার পর জিন্নাহ চূড়ান্তভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে কংগ্রেস ক্ষমতার ভাগ দিতে চায় না এবং মুসলমানদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এর পরেই জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবিকে তার রাজনীতির মূল অস্ত্র বানিয়ে ফেলেন।
১৯৪০ সালের ২২ মার্চ লাহোরের মিন্টো পার্কে লাহোর প্রস্তাবের বৈঠকে জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্ব উপস্থাপন করতে গিয়ে যে দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটিও মওলানা আজাদের বক্তব্যকেই প্রতিফলিত করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা এই তত্ত্বে তিনি বলেছিলেন, “হিন্দু ও মুসলিমদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনদর্শন সম্পূর্ণ আলাদা, একটি বৃহৎ রাষ্ট্রে মুসলিমরা স্থায়ীভাবে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের আধিপত্য ও বৈষম্যের শিকার হবে।” ফলে ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে তুলে রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতিসত্তার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন জিন্নাহ।
তবে ধর্মের নামে উগ্রতা এবং এরপর ঘটে যাওয়া ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ধর্মযুদ্ধ চাননি বলেই জিন্নাহ পরবর্তীকালে দাবি করেছেন।
১৯৪৭ সালের ১১ অগাস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদে দেওয়া তার ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে একটু বলা যাক—“রাষ্ট্রের চোখে সবাই সমান। আপনারা স্বাধীন, আপনাদের যার যার মন্দিরে, মসজিদে বা অন্য কোনো উপাসনালয়ে যাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে কোনো ধর্মের আলাদা রাজনৈতিক অগ্রাধিকার থাকবে না।” কিন্তু ততদিনে যে অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে!
ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এলাহী বখশকে নাকি বলেছিলেন, “দেখো ডাক্তার, আমি জীবনে দুটি ভুল করেছি তা-ও পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে। প্রথম ভুল করেছি লাহোর প্রস্তাবকে বিকৃত করে, যা দেশের একজন নেতা হিসেবে আমার পক্ষে আদৌ উচিত হয়নি। আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব মানবে না। তারা নিশ্চয়ই স্বাধীন হয়ে যাবে। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, ওদের ওপর বিমাতাসুলভ আচরণ। পাকিস্তান প্রকৃতপক্ষে ওদের ত্যাগের জন্যই এসেছে, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা ওদের প্রতি অবিচার করছে।…আমার দ্বিতীয় ভুল, আমি ঢাকায় গিয়ে করেছি। গভর্নর জেনারেল হিসেবে ভাষা সমস্যা নিয়ে কথা বলা আমার উচিত হয়নি।”
চিকিৎসকের সঙ্গে জিন্নাহর কথোপকথনের উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে, মোহাম্মদ মোদাব্বেরের ‘ইতিহাস কথা কয়’ নামে একটি বই থেকে, যা ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়েছে। আলোচনার এই দিকটি আমি দ্বিতীয় পর্বের জন্য তুলে রাখছি।
কিন্তু এই পর্ব শেষ করার আগে প্রশ্ন রাখতে চাই, পশ্চিমা ধাঁচে জীবনযাপন করা, ধূমপায়ী, আধুনিক, ধর্মের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক না থাকা মানুষটাকে কেন বাংলাদেশের তথাকথিত ধর্মবাদী কিছু মানুষ এবং তাদের বানানো মঞ্চ (যেমন ইনকিলাব মঞ্চ) একেবারে ধর্মজ্ঞান করে? কেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক তাদের গ্যালারিতে ধর্মপ্রাণ টিপিক্যাল বাঙালি মুসলমান মুজিবকে মুছে ফেলে জিন্নাহর তিনখানা ছবি প্রতিস্থাপন করে? এদের সবাইকে কেন স্বাধীন বাংলাদেশে বসে আড়ম্বরে এখনো জিন্নাহর জন্মদিন উদযাপন করতে হয়? সেসব উদযাপন অনুষ্ঠান থেকে আবার দেশবিরোধিতার বার্তা কেন ছড়িয়ে পড়ে?
ব্যাপারটা কি ধর্মপ্রীতি? তা তো হওয়ার কথা নয়। ধর্মচর্চা আর জিন্নাহ একে অপরের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে। তাহলে কি পাকিস্তানপ্রীতি? ধর্মের ভিত্তিতে বানানো দেশ ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা? কিন্তু জন্মের আট বছরের মাথায় যে দেশ সেনাশাসনের হাতে পড়ে গেল, এরপর আজ পর্যন্ত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোনো সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারল না, দেশ হিসেবে যেটি বিভিন্ন সময়ে ‘অলমোস্ট ব্যর্থ’ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হয়, জিন্নাহর স্বপ্ন সেক্যুলার দেশ থেকে যে দেশ ব্লাসফেমি আইনে চলে, তার প্রতি এত প্রেমের উৎস কোথায়?
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পরিচালিত প্রকল্পে ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। ই-মেইল: raju_norul@yahoo.com
