২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সৌরবিদ্যুৎ কি সত্যিই শতভাগ পরিবেশবান্ধব, নাকি দূষণের রূপান্তর?

‘সবুজ জ্বালানি’ বিচার করার সময় শুধু প্যানেলের ওপর সূর্যের আলো পড়া থেকে বিদ্যুৎ বের হওয়া পর্যন্ত হিসাব করলে চলবে না। এটাও হিসাব করতে হবে, ওই বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য পৃথিবীকে কী মূল্য দিতে হচ্ছে।

সৌরবিদ্যুৎ কি সত্যিই শতভাগ পরিবেশবান্ধব, নাকি দূষণের রূপান্তর?

বিনামূল্যের রোদে দূষণহীন বিদ্যুৎ মিললেও, সৌর প্যানেল তৈরি ও তার খনিজ সম্পদের জোগান কতটা পরিবেশবান্ধব—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংশয়।

শুভংকর বিশ্বাস শুভংকর বিশ্বাস

Published : 19 Sep 2026, 04:40 PM

Updated : 19 Sep 2026, 04:40 PM

অস্ট্রেলিয়ার প্রখর রোদে কিংবা বাংলাদেশের কোনো ভবনের ছাদে বসানো সৌর প্যানেলের দিকে তাকালে বিষয়টি প্রায় নিখুঁত এক জ্বালানি সমাধান বলেই মনে হয়। সূর্যের আলো অফুরন্ত, চিরসবুজ এবং তা আসে বিনামূল্যে। কয়লা বা তেল পোড়াতে হয় না, গ্যাসের প্রয়োজন নেই, চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বের হয় না। একবার স্থাপন করা হলে একটি সৌর প্যানেল বহু বছর ধরে কোনো দহন ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তাই বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছে সৌরবিদ্যুৎ।

বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি এই নবায়নযোগ্য সৌরশক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে এসেছে। নেট জিরো অর্জনে সৌরশক্তির ভূমিকা প্রশ্নবোধক হলেও, চরম বিদ্যুৎ ঘাটতির দেশে যে কোনোভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রণোদনাকে তাই আমি ইতিবাচকভাবেই স্বাগত জানাই।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে, সূর্যের আলো ক্লিন এবং গ্রিন হলেও ওই আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করার পুরো ব্যবস্থাটি কি সত্যিই ‘সবুজ’?

একটি সৌর প্যানেল প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক আগেই তার পরিবেশগত যাত্রা শুরু হয়ে যায়। কোয়ার্টজ খনন করে সিলিকন তৈরি করতে হয়। ওই সিলিকনকে অত্যন্ত উচ্চ বিশুদ্ধতায় পরিশোধনে বিপুল শক্তির প্রয়োজন হয়। প্যানেলের ফ্রেমে লাগে অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও কেবলে লাগে কপার, অনেক সৌর কোষে ব্যবহৃত হয় সিলভার, দুষ্প্রাপ্য গ্যালিয়াম, সেলেনিয়াম, ইন্ডিয়াম এবং টেলুরিয়াম। এর সঙ্গে রয়েছে ইস্পাত, কাচ, টিন, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক উপাদান, ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার এবং পুরো বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ, সৌরবিদ্যুতের গল্প সূর্যের আলো দিয়ে শুরু হয় না। এর শুরু হয় খনি খনন, ক্রাশার, স্ক্রিনিং, ম্যাটেরিয়াল ট্রান্সফার, প্রসেসিং প্ল্যান্ট, স্মেল্টার, রিফাইনারি এবং প্যানেল তৈরির কারখানা দিয়ে।

এই পুরো ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয় ডিজেল, বিদ্যুৎ, পানি ও রাসায়নিক পদার্থ। শিলা উত্তোলন করতে হয়, আকরিক ক্রাশ ও গ্রাইন্ড করতে হয়, ধাতু আলাদা ও পরিশোধন করতে হয়, তারপর তৈরি হয় সৌর প্যানেল ও তার সহায়ক সরঞ্জাম। ফলে সৌরবিদ্যুতের পরিবেশগত প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তৈরি হয়ে যায় প্যানেলটি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার আগেই।

এ কথা অবশ্যই স্পষ্ট থাকা দরকার যে সৌরবিদ্যুতের জীবনচক্রভিত্তিক কার্বন নিঃসরণ সাধারণত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় কম। কাজেই সৌরবিদ্যুৎকে কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের সমান বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না।

কিন্তু একই সঙ্গে ‘নেট জিরো’ বা ‘ক্লিন বা গ্রিন এনার্জি’ কথাগুলোও অসম্পূর্ণ, যদি আমরা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মুহূর্তটি দেখি। প্যানেলটির সামনে ধোঁয়া নেই বটে, কিন্তু তার কাঁচামালের জন্য হয়তো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে একটি খনি চলছে, একটি প্রসেসিং প্ল্যান্ট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, একটি স্মেল্টার উচ্চ তাপমাত্রায় ধাতু উৎপাদন করছে। সৌরবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি তাই এতে ব্যবহৃত খনিজসম্পদ।

এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ কপার। সৌরবিদ্যুৎ শুধু প্যানেলের জন্যই কপার ব্যবহার করে না; ক্যাবল, ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্কেও বিপুল কপার লাগে। একই সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ডাটা সেন্টার, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন শিল্পে কপারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে পরিকল্পিত খনি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলেও ২০৩৫ সালের দিকে প্রয়োজনের তুলনায় প্রাথমিক তামার সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ কম হতে পারে।

এর মানে এই নয় যে পৃথিবীর কপার তখনই শেষ হয়ে যাবে। আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। চাহিদার গতির সঙ্গে নতুন খনি ও প্রসেসিং সক্ষমতা হয়তো বাড়ানো যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আকরিকের গ্রেড। উচ্চমানের আকরিক কমে এলে একই পরিমাণ কপার উৎপাদনের জন্য আরও বেশি শিলা উত্তোলন, ক্রাশ ও প্রসেসিং করতে হয়। অর্থাৎ একদিকে আমরা কম-কার্বন প্রযুক্তি তৈরি করছি, অন্যদিকে ওই প্রযুক্তির কাঁচামালের জন্য বেশি খনন, বেশি শক্তি, বেশি পানি ও বেশি টেইলিংস তৈরি হতে পারে।

সিলভারের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। একটি সৌর কোষে সিলভারের পরিমাণ খুব বেশি নয়, কিন্তু কোটি কোটি প্যানেল তৈরি হলে সামান্য পরিমাণও বিশাল বৈশ্বিক চাহিদায় পরিণত হয়। এ কারণেই গবেষকরা এখন সিলভারের ব্যবহার কমানো এবং কপার বা অন্য ধাতু দিয়ে তার বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছেন।

ইন্ডিয়াম ও টিনের ক্ষেত্রেও সরবরাহগত চাপ তৈরি হতে পারে। সব ধরনের সৌর প্রযুক্তিতে ইন্ডিয়াম প্রয়োজন হয় না, কিন্তু কিছু উচ্চ-দক্ষতার প্রযুক্তি যদি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে এর সরবরাহ একটি সীমাবদ্ধতা হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে টিন বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সোল্ডারিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সৌরশক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এর চাহিদাও বাড়াবে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘খনিজ শেষ হয়ে যাবে’—এই সরল ধারণা নয়; বরং প্রয়োজনীয় সময়ে, প্রয়োজনীয় মূল্যে এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণে ওইসব খনিজ পদার্থগুলো পাওয়া যাবে কি না। (তবে ফুটনোটে রাখা যেতে পারে, ‘খনিজ সম্পদ আলাদিনের চেরাগ নয়, অনেক ক্রিটিক্যাল মেটালের অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনের প্রাচুর্যতা ২০৬০ সালের মধ্যে ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে, কিংবা নিঃশেষ হয়ে যাবে’)

তবে সৌরশক্তি কিন্তু একা এসব ধাতুর জন্য প্রতিযোগিতা করছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্রতিরক্ষা, টেলিযোগাযোগ, ইলেকট্রনিক্স এবং সাধারণ শিল্পায়ন—সবাই একই কপার, অ্যালুমিনিয়াম, টিন এবং অন্যান্য উপাদান কিনতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

ফলে আগামী দিনের প্রশ্ন শুধু ‘পৃথিবীতে কত খনিজ আছে’ তা নয়। প্রশ্ন হবে, কে সেগুলো উত্তোলন করবে, কে পরিশোধন করবে, কার হাতে প্রসেসিং সক্ষমতা থাকবে এবং কে ওই উপকরণ কিনতে পারবে।

এখান থেকেই ভূরাজনীতির প্রশ্নও চলে আসে। সৌর প্যানেল বসানোর পর কোনো দেশ হয়তো আমদানি করা কয়লা বা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। কিন্তু একই সময়ে সৌর কোষ, ইনভার্টার, সেমিকন্ডাক্টর, পরিশোধিত ধাতু এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য অন্য কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ এক ধরনের জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে আমরা হয়তো আরেক ধরনের উপাদান ও প্রযুক্তি নির্ভরতা তৈরি করছি।

অনেকে বলবেন, এর সমাধান রিসাইক্লিং। নিশ্চয়ই পুনর্ব্যবহার ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। কিন্তু একটা প্যানেল থেকে শতভাগ ধাতু পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়, কিছু সিস্টেম লস থাকবেই। তাছাড়া এখানে সময়েরও একটি সমস্যা আছে। আজ যে প্যানেল বসানো হচ্ছে, তা হয়তো ২৫ থেকে ৩০ বছর ব্যবহৃত হবে। ওই প্যানেলের ভেতরে থাকা সিলিকন, সিলভার বা অ্যালুমিনিয়াম আগামীকালই নতুন প্যানেলে ব্যবহার করা যাবে না। অথচ আগামী এক বা দুই দশকের মধ্যেই বিশ্ব বিপুল নতুন সৌর অবকাঠামো নির্মাণ করতে চায়। ফলে নতুন খনিজ উত্তোলনের প্রয়োজন আপাতত থেকেই যাচ্ছে।

তাই সৌরবিদ্যুৎ ক্লিন এনার্জি তৈরি করতে পারলেও, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনচক্র ক্লিন বা গ্রিন নয়। তবে এটি সৌরবিদ্যুতের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি নয়, বরং সৌরবিদ্যুৎকে বাস্তবভাবে মূল্যায়নের যুক্তি। আমাদের ‘সবুজ’ শব্দটির অর্থ আরও বিস্তৃত করতে হবে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে কি না তা দিয়ে কোনো প্রযুক্তির টেকসইতা বিচার করা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে কত শিলা উত্তোলন করা হয়েছে, কত পানি ও শক্তি ব্যবহার হয়েছে, কী পরিমাণ কার্বন উৎপাদনের আগেই নিঃসৃত হয়েছে, সরবরাহ শৃঙ্খল কতটা নিরাপদ এবং শেষ পর্যন্ত কতটা উপাদান পুনর্ব্যবহার করা যাবে।

এখানেই জ্বালানি পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন ও দহন কমানোর জন্য আমরা এমন একটি নতুন জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করছি, যার জন্য আবার বিপুল পরিমাণ নতুন খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন হবে।

সুতরাং সৌরশক্তি আমাদের সম্পদের সমস্যা দূর করে না, এটি সম্পদের সমস্যার ধরন বদলে দেয়। সূর্য আমাদের কোনো জ্বালানির বিল পাঠাবে না। কিন্তু ওই সূর্যের আলোকে শিল্পপর্যায়ে ব্যবহার করতে খনি, প্রসেসিং প্ল্যান্ট, স্মেল্টার, কারখানা, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যতে বিশাল পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তাই ‘সবুজ জ্বালানি’ বিচার করার সময় শুধু প্যানেলের ওপর সূর্যের আলো পড়া থেকে বিদ্যুৎ বের হওয়া পর্যন্ত হিসাব করলে চলবে না। হিসাব করতে হবে ওই বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য পৃথিবীকে কী মূল্য দিতে হচ্ছে।

পরিষ্কার জ্বালানির বিনিময়ে যদি আমাদের আরও বেশি খনন, আরও বেশি নিম্নগ্রেড আকরিক প্রক্রিয়াকরণ, আরও কেন্দ্রীভূত বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন এবং গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর জন্য আরও তীব্র প্রতিযোগিতার দিকে যেতে হয়, তাহলে পরিবেশগত দূষণঝুঁকি পুরোপুরি চলে যায়নি, তা শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে।

সূর্যের আলো বিনামূল্যে পাওয়া যায়, সৌরবিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিনামূল্যে নয়, পরিবেশগতভাবেও নয়।

জ্বালানি পরিবর্তনের প্রকৃত পরীক্ষা তাই শুধু আমরা কত ‘সবুজ বিদ্যুৎ’ উৎপাদন করতে পারছি, তা নয়। সব খরচ, সব খনিজ, সব কার্বন নিঃসরণ এবং সব পরিবেশগত প্রভাব যোগ করার পর পুরো ব্যবস্থাটি সত্যিই কতটা সবুজ, সেটিই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন।

শুভংকর বিশ্বাস অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রকৌশলী, গবেষক ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট। ই-মেইল: rtrshuvo@gmail.com