Published : 22 Jul 2026, 04:29 PM
অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা বা সোফায় অলস সময় কাটানোর পর পিঠ বা কোমরে ব্যথা হওয়া এক সাধারণ সমস্যা।
সাধারণত পিঠে চোট পেলে বা ব্যথা হলে চিকিৎসকেরা রোগীকে পুরোপুরি বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।
তাদের পিঠ বা কোমরের ব্যথা শুয়ে-বসে থাকলে কিংবা বিশ্রাম নিলে আরও বেড়ে যায়, অথচ একটু হাঁটাচলা বা শারীরিক পরিশ্রম করলেই তা দ্রুত কমে আসে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্রাম নিলে যদি ব্যথা বাড়ে এবং নড়াচড়া করলে আরাম মেলে, তবে বুঝতে হবে এই ব্যথার ধরন সাধারণ চোট নয়; বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রদাহজনিত এক জটিল শারীরিক সমস্যা।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন অর্থোপেডিক সেন্টার’-এর স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সালভাদর পর্তুগাল এবং ওহাইওর ‘ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটি কলেজ অব মেডিসিনের নিউরোসার্জারি’ বিভাগের প্রধান ডা. জোসেফ চেং সেলফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, এই ব্যথার পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
বিশ্রামে ব্যথা বাড়ার প্রধান কারণ
অ্যাক্সিয়াল স্পন্ডিলোআর্থ্রাইটিস: এটি এক ধরনের ‘অটোইমিউন’ রোগ, যা মেরুদণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে।
ডা. জোসেফ চেং জানান, এই রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত মেরুদণ্ডের হাড় ও জয়েন্ট বা জোড়গুলোকে আক্রমণ করে, ফলে কশেরুকার মধ্যবর্তী কার্টিলেজ বা নরম হাড় ক্ষয় হতে শুরু করে।
যে কারণে মেরুদণ্ডে তীব্র শক্ত ভাব বা ‘স্টিফনেস’ তৈরি হয়, যা দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকলে বা ঘুমালে মারাত্মক আকার ধারণ করে। তবে হাঁটাচলা করলে পেশিগুলো হাড়ের জোড়ের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যথা কমে আসে।
সোরিয়াটিক স্পন্ডিলোপ্যাথি: চর্মরোগ সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের ‘সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস’ দেখা দেয়, যার মধ্যে ২০ শতাংশ রোগী মেরুদণ্ডের ব্যথায় ভোগেন। এই ব্যথার ধরনও বিশ্রামে বৃদ্ধি পায়।
এন্টারোপ্যাথিক আর্থ্রাইটিস: পেটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যেমন- ‘ক্রোনস ডিজিজ’ বা ‘আলসারেটিভ কোলাইটিসে’ আক্রান্ত প্রতি পাঁচজন রোগীর মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত হন, যা মেরুদণ্ডে প্রদাহ ও পিঠের ব্যথা বাড়িয়ে দেয়।
যে কারণে নড়াচড়া বা ব্যায়াম এই ধরনের ব্যথায়
আমেরিকান স্পন্ডিলোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশনের গবেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী পিঠের ব্যথার জন্য শারীরিক সক্রিয়তা বা হালকা ব্যায়াম হল, ভালো প্রতিষেধক। এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণগুলো হল:
‘কোর মাসল’ বা পেশির শক্তি বৃদ্ধি: পেট ও পিঠের চারপাশের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করলে তা মেরুদণ্ডের ওপর অতিরিক্ত ওজনের চাপ অনেক কমিয়ে দেয়, যা হাড়ের ক্ষয় রোধ করে।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিীট অফ সেন্ট মার্ড অ্যান্ড সেন্ট জন প্লাইমাউথ’-এর গবেষকদের করা সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত ‘কোর’ বা দেহের মধ্যবর্তী অঞ্চল শক্তিশালী করার ব্যায়ামে পিঠের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা প্রায় ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি: মাঝারি ধরনের অ্যারোবিক ব্যায়াম, যেমন— হাঁটা বা সাইকেল চালানো মেরুদণ্ডের চারপাশে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়। এটি ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু দ্রুত মেরামত করতে এবং হাড়ের জোড়ের শক্তভাব দূর করতে সাহায্য করে।
এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণ: ব্যায়ামের ফলে শরীর থেকে ‘এন্ডোরফিনস’ নামক এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে এবং মানুষের নড়াচড়ার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
ডা. সালভাদর পর্তুগাল বলেন, “পিঠের ব্যথার কারণ ও তীব্রতা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তাই ব্যথার আসল উৎস না জেনে নিজে নিজে অতিরিক্ত কসরত বা ভুল ব্যায়াম করা উচিত নয়, এতে হাড়ের ক্ষতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই একজন ‘ফিজিওথেরাপিস্ট’ বা মেরুদণ্ড বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে নির্দিষ্ট ব্যায়াম করা উপকারী হতে পারে।
আরও পড়ুন
প্রতিদিনের যে ভুলে বাড়ছে পায়ে ব্যথা