Published : 22 Jul 2026, 06:52 PM
প্রেম বা ভালোবাসার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বয়স কেবলই একটি সংখ্যা’— এই প্রবাদ প্রচলিত হলেও, সমাজে অসম বয়সের সম্পর্ক সবসময়ই বেশ কৌতুহল ও আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশেষ করে বেশি বয়সি পুরুষের সঙ্গে কম বয়সি নারীর সম্পর্ক বা এর উল্টোটা অর্থাৎ বেশি বয়সি নারীর প্রতি কম বয়সি পুরুষের আকর্ষণ নেটদুনিয়া থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনে নিয়মিত চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই আকর্ষণের পেছনের মনস্তত্ত্ব কী? এটি কি কোনো মানসিক ব্যাধি?
স্নায়ুবিজ্ঞানী ও সম্পর্ক গবেষকদের মতে, অসম বয়সের ভালোবাসার সম্পর্ক কোনো মানসিক রোগ বা ব্যাধি নয়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘এইজ-গ্যাপ রিলেশনশিপ’ বলা হয়।
তবে এই ধরনের আকর্ষণ হঠাৎ করে তৈরি হয় না; এর পেছনে পুরুষ ও নারী দুজনেরই গভীর কিছু মানসিক ও বিবর্তনীয় কারণ কাজ করে।
বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্ব এবং নিরাপত্তার খোঁজ
অসম বয়সের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশি বয়সি পুরুষ ও কম বয়সি নারীর জোড় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক এবং বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী ডা. ডেভিড বাস তার গবেষণাপত্র ‘ইভোলিউশনারি সাইকোলজি’-তে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তার মতে, এটি মানুষের হাজার বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ।
পুরুষেরা প্রাকৃতিকভাবেই এমন সঙ্গী খোঁজেন যার প্রজনন ক্ষমতা ভালো, যা তরুণ বয়সের একটি বড় লক্ষণ। অন্যদিকে নারীরা এমন সঙ্গী খোঁজেন, যিনি তার এবং সন্তানের নিরাপত্তা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে সক্ষম।
বেশি বয়সি পুরুষেরা ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠিত এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ায়, কম বয়সি নারীরা তাদের প্রতি প্রাকৃতিকভাবেই বেশি আকৃষ্ট হন।
মানসিক পরিপক্কতা ও ‘ড্যাডি ইস্যুজ’ এর আসল সত্য
সমাজে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা আছে যে, কম বয়সি নারীরা কেবল ‘ড্যাডি ইস্যুজ’ (শৈশবে বাবার স্নেহের অভাব) এর কারণে বেশি বয়সি পুরুষকে ভালোবাসেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডা. সারাহ স্ট্যানটন এবং তার দল চিকিৎসা-বিষয়ক সাময়িকী ‘পার্সোনাল রিলেশনশিপস’-তে এই বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করেন, “ড্যাডি ইস্যুজের ধারণাটি মূলত একটি সামাজিক ‘মিথ’।”
এই মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কম বয়সি নারীরা অনেক সময় সমবয়সী ছেলেদের মাঝে চপলতা বা সিদ্ধান্তহীনতা দেখেন। এর বিপরীতে বেশি বয়সি পুরুষদের হরমোনজনিত ও মানসিক পরিপক্কতা, নারীদের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশি মানসিক শান্তি ও নির্ভরতা দেয়।
সঙ্গী থাকার পরও কম বয়সিদের প্রতি আকর্ষণ ও মধ্যবয়সের সংকট
অনেক সময় দেখা যায়, নিজের ঘরে সমবয়সি বা প্রায় সমবয়সি জীবনসঙ্গী থাকার পরও মানুষ বাইরের কোনো কম বয়সি তরুণ বা তরুণীর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ান।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘কিনসি ইনস্টিটিউট’ এবং অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ উন্মোচিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ হল ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ বা মধ্যবয়সের মানসিক সংকট।
বয়স ৪০ বা ৫০-এর কোঠায় পৌঁছালে মানুষ নিজের হারিয়ে যাওয়া যৌবন ও সতেজতা ফিরে পাওয়ার জন্য এক ধরনের অবচেতন তাড়না অনুভব করে।
কোনো কম বয়সি সঙ্গীর সান্নিধ্য তাদের মনে এই কাল্পনিক ধারণা দেয় যে, তারা এখনও তরুণ ও আকর্ষণীয় আছেন।
এছাড়া দীর্ঘদিনের চেনা দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি ও রোমাঞ্চের অভাব দূর করতেও মানুষ অনেক সময় এই ভুল পথ বেছে নেয়।
বেশি বয়সি নারী ও কম বয়সি পুরুষ: স্বাধীন চেতনার আকর্ষণ
আধুনিক যুগে এর বিপরীত চিত্রটিও খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। যেখানে কম বয়সি তরুণেরা, তাদের চেয়ে বয়সে বড় নারীদের প্রেমে পড়ছেন।
যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড হ্যারাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. অ্যালিসন ডিরি, অসম বয়সের সম্পর্কের সামাজিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন।
‘জার্নাল অফ ফ্যামিলি ইস্যুজ’ সামায়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ডা. অ্যালিসন ডিরি বলেন, বয়সে বড় নারীরা সাধারণত আর্থিকভাবে স্বাধীন এবং নিজেদের জীবন নিয়ে স্পষ্ট চিন্তাভাবনা রাখেন। তাদের এই আত্মবিশ্বাস এবং স্বাবলম্বী রূপ কম বয়সি তরুণদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এছাড়া বয়সে বড় নারীরা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সম্পর্কে অহেতুক জটিলতা বা ‘ইমোশোনাল ড্রামা’ তৈরি করেন না, যা পুরুষদের মানসিক স্বস্তি দেয়।”
সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ
অনেকে মনে করেন অসম বয়সের সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না।
তবে অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সমাজ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. গ্যালাগার এবং তার দল দীর্ঘ মেয়াদী সম্পর্কের ওপর একটি বড় সমীক্ষা চালান।
‘ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিভিউ’তে প্রকাশিত গবেষণায়, তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, সমবয়সি দম্পতিদের তুলনায় ৫ থেকে ১০ বছরের ব্যবধান থাকা অসম বয়সের দম্পতিদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বস্ততা এবং বৈবাহিক সন্তুষ্টির হার অনেক ক্ষেত্রে বেশি থাকে।
এর কারণ হল, বয়সের ব্যবধানের কারণে তারা একে অপরের মতপার্থক্যকে বেশি নমনীয়তার সঙ্গে মেনে নিতে পারেন।
মনে রাখতে হবে
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগবিদ্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য-বিষয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপক ডা. কেইশা স্যান্ডার্স-ওয়াল্ড্রন সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “বন্ধুত্ব বা ভালোবাসার মূল ভিত্তি হল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং সমতা। সঙ্গীদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান যতই হোক না কেন, যদি তারা একে অপরের মানসিক চাহিদাকে সম্মান করতে পারেন এবং জীবনযাত্রার লক্ষ্যের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে পারেন, তবে সেই সম্পর্ক যেকোনো সমবয়সি সম্পর্কের চেয়েও বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং সফল হতে পারে।”
আরও পড়ুন