১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধাপরাধের জোরালো ভিত্তি’ পেয়েছে জাতিসংঘ

গত ফেব্রুয়ারিতে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামের্দের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ওই হামলা চালানো হয়।

ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধাপরাধের জোরালো ভিত্তি’ পেয়েছে জাতিসংঘ

হামলায় বিধ্বস্ত মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: রয়টার্স

Shahria Bappy Shahria Bappy

Published : 18 Sep 2026, 11:32 AM

Updated : 18 Sep 2026, 11:32 AM

ইরানে পৃথক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৭৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধাপরাধ’ করেছে বলে ‘বিশ্বাস করার মত যৌক্তিক ভিত্তি’ খুঁজে পেয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।

বিবিসি জানিয়েছে, জাতিসংঘের ‘ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন অন ইরান’-এর নতুন এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামের্দের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। দুই জায়গায় বহু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য লামের্দের হামলায় মার্কিন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছে। আর মিনাবের ঘটনা নিয়ে তদন্ত করার কথা জানিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন এই প্রতিবেদনের তথ্যকে ‘নির্ভরযোগ্য’ বলে মনে করে না।

ওই প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এও বলেছেন, গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ দমনে ইরানের কর্তৃপক্ষও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ করেছে।

দেশের ৩১টি প্রদেশেই নিরাপত্তা বাহিনীর হামলা ও হত্যাকাণ্ড ‘নজিরবিহীন ও ভয়াবহ’ মাত্রায় পৌঁছেছিল বলে তাদের ভাষ্য।

বিবিসি লিখেছে, প্রতিবেদনটির বিষয়ে ইরান এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তারা অতীতেও পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।

বৃহস্পতিবার অনুসন্ধানী মিশন এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলে, “ইরানের বেসামরিক নাগরিকরা একদিকে নিজ সরকারের সংঘটিত চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে চলা সংঘাতের মাঝে আটকা পড়েছেন।”

জাতিসংঘের তিন সদস্যের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল ইরানে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো ওই দুই হামলার ঘটনা তদন্ত করে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে, সেদিনই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের ‘শাজারাহ তাইয়েবাহ’ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তাতে অন্তত ১৫৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু।

কমিশন বলছে, বিদ্যালয়টি ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এর একটি দপ্তরের পাশে হলেও ভবনটি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তা স্পষ্ট বোঝা যেত এবং সামরিক কাজে তা ব্যবহারের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞদের দাবি, মার্কিন বাহিনীর নিজস্ব প্রাথমিক তদন্তে তাদের দায় পাওয়ার খবর এবং একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কারণে নিশ্চিত হওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে যে হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রই চালিয়েছে।

তারা আরও বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়টিই ছিল হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু; আইআরজিসি ঘাঁটিতে হামলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা লক্ষ্যভ্রষ্ট হামলা এটি ছিল না। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা নিশ্চিত করেছেন যে বিদ্যালয়টিতে পরপর দুবার আঘাত হানা হয়েছিল।

মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনও তাদের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, তবে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী কখনও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় না।

মিনাবের হামলার দিনই লামের্দ শহরের একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্স ও আবাসিক এলাকায় ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ দিয়ে হামলা চালানো হয়, যার ভেতরে থাকা টাংস্টেন ছররা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সেখানে অন্তত ২১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে সাতটি শিশু ছিল।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পোর্টস কমপ্লেক্সটিও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যেত এবং এটি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মার্কিন বাহিনীর কাছে পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র থাকা এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা এই হামলার পেছনেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী লামের্দে কোনো হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করে ব্যবহৃত অস্ত্রটি পিআরএসএম ছিল কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।

Image

লামের্দে শহরের ক্রিড়া কমপ্লেক্সের হামলায় আহত অনিতা ঘাসেমি। ছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘের দলটি বলছে, ওই দুই হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলা গণবিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ করেছে বলেও প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উঁচু স্থান থেকে অ্যাসাল্ট রাইফেল এবং শটগান দিয়ে সরাসরি গুলি চালিয়ে নজিরবিহীনভাবে বিক্ষোভ দমন করেছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। এতে বহু মানুষ চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

আহতদের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করতে হাসপাতালে হামলা চালানো হয় এবং গ্রেপ্তার হাজারও মানুষকে নির্যাতন, নির্জন কারাবাস ও আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করার প্রমাণ মিলেছে। পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত বিচারে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ইরান সরকার নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার (যার বেশিরভাগই নিরাপত্তা কর্মী ও পথচারী বলে দাবি তেহরানের) বললেও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে মনে করছে জাতিসংঘ।

মানবাধিকার সংস্থা ‘এইচআরএএনএ’র হিসাব অনুযায়ী সংঘাত ও দমনপীড়নে ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের প্রায় সবাই বিক্ষোভকারী।

তবে ইরান সরকার এই অস্থিরতার দায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে হতাহতের ঘটনাগুলোকে ‘দাঙ্গাবাজদের কাজ’ বলে দাবি করেছে।