Published : 06 Jul 2026, 03:12 PM
‘নো আর্জেন্টিনা নো ব্রাজিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’—একরকম স্লোগান দেওয়া একটি মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যারা এই মিছিলে অংশ নিয়েছেন, তাদের হাতে ইসলাম ধর্মের কালেমা লেখা সাদা-কালো পতাকা। শুধু তাই নয়, ঢাকার উপকণ্ঠের নারায়ণগঞ্জ থেকে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা পর্যন্ত রাস্তার ধারে দেখা যাচ্ছে কালেমা লেখা পতাকা। ছোট ছোট সভা-সমাবেশের ছবিও দেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখে পড়ছে।
খেলার সঙ্গে ধর্ম বা ইসলামকে গুলিয়ে ফেলার এই ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি কোনো রাজনীতি আছে কি না বা বাংলাদেশ কোনো একটি বড় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জালে আটকে গেল কি না; যারা বুঝে কিংবা না বুঝে এইসব মিছিল করছেন বা দেশের বিভিন্ন স্থানে কালেমা লেখা পতাকা টাঙাচ্ছেন—তারা নিতান্তই ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এসব করছেন নাকি কোনো বিদেশি শক্তির স্বার্থে কাজ করছেন, সেটি গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
কেননা এইসব মিছিলের স্লোগানই শুধু নয়, বরং মিছিলের আগে-পরে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তাতেও এটা স্পষ্ট যে, এইসব মিছিল ও সমাবেশের আয়োজক সাধারণ জনতা নয়। আয়োজকরা প্রশিক্ষিত এবং কোনো না কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া দেশে হঠাৎ করে কালেমা লেখা সাদা-কালো পতাকা ওড়ানো এবং তা নিয়ে শোডাউনের হিড়িক পড়ল কেন, সেই প্রশ্নটিও জনমনে তৈরি হয়েছে। বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় ভিনদেশি পতাকা ওড়ানোর প্রতিবাদে কালেমার পতাকা ওড়ানো হচ্ছে। আসলে কি তা-ই, নাকি এর পেছনে কোনো উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ এবং বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র প্রমাণের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে?
ভারতে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার যেদিন অভিযোগ করলেন যে, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের তৎপরতা রয়েছে’—ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশে এই ধরনের তৎপরতা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়।
বাস্তবতা হলো, যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় বাংলাদেশের সর্বত্র আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা ওড়ানো হয়েছে। একসময় দেখা যেত, প্রায় প্রতিটা বাড়ির ছাদেই ছোট-বড় নানা রঙের পতাকা। সর্বত্র একটা উৎসবের আমেজ বিরাজ করত। মানুষ এটিকে নিতান্ত বিনোদন হিসেবে দেখত। কিন্তু এবার হঠাৎ করে কী এমন হলো যে, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা ওড়ানোর প্রতিবাদে কালেমার পতাকা ওড়াতে হবে; এই পতাকা নিয়ে মোটর শোভাযাত্রা বা মিছিল করতে হবে; রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কের পাশে কালেমার পতাকা টাঙিয়ে সেই ছবি ফেইসবুকে ভাইরাল করতে হবে? এটা কি শুধুই খেলার বিরোধিতা নাকি বাংলাদেশকে উগ্র মৌলবাদী দেশ হিসেবে প্রমাণের যে রাজনীতি চলছে বছরের পর বছর ধরে—তারই অংশ?
বাংলাদেশকে উগ্র ও মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা নতুন নয়। এক বা একাধিক গোষ্ঠী বছরের পর বছর ইসলামাইজেশনের নামে এই দেশের চিরায়ত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় সহনশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। নারীর অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে চেয়েছে। বিভিন্ন বক্তা এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় অনেক আলোচকও নারীবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার।
এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি পর্যন্ত অন্তত এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে এই পতাকা উড়তে দেখা গেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেছেন, এই পতাকা টাঙানোর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ১৭ জুন গভীর রাতে রাজধানীর শনিরআখড়ায় একদল তরুণ যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভারের লোহার রেলিংয়ে সাদা-কালো পতাকা সারিবদ্ধভাবে টাঙিয়ে দেয়। এদিন এনামুল হাসান নামে একজন যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে ফেইসবুক লাইভে এসে ঘোষণা দেন: “এসব পতাকা কেউ খুললে ‘কঠিন পদক্ষেপ’ নিতে আমরা বাধ্য হব।” প্রশ্ন হলো, এখানে ‘আমরা’ বলতে তিনি কাদেরকে বুঝিয়েছেন? এই ‘আমরা’ কারা? তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং তারা কাদের হয়ে কাজ করছেন—সেটি জানা প্রয়োজন।
গত ২২ জুন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ’ নামে একটি ফেইসবুক পেজে প্রকাশ করা একটি ছবিতে দেখা যায়, ১০ জন তরুণ কালেমা লেখা একটি সাদা-কালো পতাকা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে: “ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের শহীদ মিনার ও স্টেশনে কলেজের মানবিক বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কালেমার পতাকা উত্থাপন।”
এই শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন যে, তারা কি সত্যিই ইসলামের বাণী প্রচার বা নিতান্তই ধর্মীয় অনুভূতি থেকে কাজটি করেছে নাকি তারা কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। কারণ বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন এরকম ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে যে কোনো রাজনীতি আছে, সেটি ধারণা করাই যায়।
নানা ঘটনায় আলোচিত এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়া মুফতি হারুন ইজহারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে—যেখানে তিনি বলছেন, “আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায়ে দেবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে, তাহলে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল–এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, কালেমার পতাকাও থাকবে আমাদের।”
কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, যেসব পতাকা টাঙানো হচ্ছে সেগুলোর সঙ্গে আল কায়েদা, আইএসআইএস, তালেবান, হিজবুত তাহরীরের মতো সংগঠনের পতাকার নকশার মিল রয়েছে। ফলে নিতান্তই ধর্মীয় অনুভূতি থেকে বা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকার বিরুদ্ধে গিয়ে এই পতাকা টাঙানো হচ্ছে—এমন সরল উপসংহারে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়ও সারা দেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল-জার্মানি এমনকি আফ্রিকার কোনো কোনো দেশের পতাকা টাঙানো হয়েছে। দীর্ঘ পতাকা নিয়ে মানুষের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছে—যা ছিল নিতান্তই বিনোদনের বিষয়। কিন্তু হঠাৎ এ বছরের বিশ্বকাপে কী এমন ঘটনা ঘটল যে, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকার পাল্টা হিসেবে কালেমার পতাকা টাঙাতে হবে?
ফুটবল বিশ্বকাপের মতো একটি অরাজনৈতিক এবং সর্বজনীন বিষয়ের সঙ্গে ধর্মকে গুলিয়ে ফেলা বা খেলা ও ধর্মকে মুখোমুখি করার এই প্রবণতার পেছনে যে রাজনীতি আছে; বাংলাদেশে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে বলে প্রমাণ করার দেশি-বিদেশি চক্রান্ত আছে—সেটি না বোঝার কোনো কারণ নেই। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশে উগ্র ধর্মীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর যে উত্থান হয়েছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে সারা দেশে এই গোষ্ঠীর যে তাণ্ডব ছিল, তারা কি এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে বিব্রত করা বা তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে অন্য কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে?
প্রশ্ন হলো, ফুটবলের মতো একটি নিরেট অরাজনৈতিক, নির্দলীয়, আনন্দের উপলক্ষকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানোর পেছনে কারা আছে, সরকার কি তা জানে বা খোঁজ নিয়েছে?
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি গোষ্ঠী ঘোষণা দিল যে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা চলতে দেওয়া হবে না; সেটিই সফল হলো। উপরন্তু জেলা প্রশাসন ও পুলিশও সিনেমা বন্ধের হুমকিদাতাদেরই সহযোগিতা করল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সেন্সর পাওয়া একটি চলচ্চিত্র—যেটি রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়েছে; যে সিনেমার বিরুদ্ধে কোনো ধর্মীয় উসকানি বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ নেই—সেটিও চলতে দেওয়া হলো না এবং সরকারও তাদের প্রতিহত করল না অথবা করতে পারল না। সম্ভবত সেই আপসকামিতা অথবা সেই দুর্বলতার কারণেই এখন বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো একটি আন্তর্জাতিক আয়োজন—যেটি দলমত ও বয়স নির্বিশেষে সকল মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসে; মানুষকে কিছুদিন আনন্দ, হাসি-আড্ডায় মাতিয়ে রাখে; হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস খোঁজে; সেরকম একটি আয়োজনের বিরুদ্ধেও যারা ধর্ম তথা ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করায়—তারা যে ইসলাম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা দিচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গভীর অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, এই গোষ্ঠীর পেছনে ইসলামবিরোধী কোনো শক্তির অর্থায়ন রয়েছে।
বাংলাদেশে উগ্র ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে—এমন বয়ান প্রতিষ্ঠা করা গেলে যেসব দেশ ও গোষ্ঠীর সুবিধা—তাদের হাতে কোনো অস্ত্র তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। যদি এই বয়ান প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না, বিশ্বের কোনো দেশ বাংলাদেশের মানুষকে ভিসা দেবেনা। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে এই দুটি ইস্যুতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে সংকটে পড়ে গেছে। সুতরাং একটি উদার, মধ্যপন্থী, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সহনশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি ছিল, সেই পরিচয়ের বিপরীতে বাংলাদেশ যদি কট্টরপন্থী বা উগ্র ধর্মীয় দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়—সেটি দেশের জন্য অনেক বড় বিপদ ডেকে আনবে। যে বিপদের কথা হয়তো এখন অনেকের চিন্তার মধ্যেও নেই।
আমীন আল রশীদ সাংবাদিক ও লেখক। aminalrasheed@gmail.com