Published : 27 Jul 2026, 08:20 PM
আজ অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে লিখতে বসেছি এই আবেদনপত্র। জানি না, শিক্ষক হিসেবে আমার এই ক্ষুদ্র আবেদন প্রতিদিনের হাজারো কাজের মাঝে সরকারপ্রধান বা সরকারের উচ্চমহলের আদৌ দৃষ্টিগোচর হবে কি না। তবে অতি সাধারণ একজন শিক্ষক হিসেবে, বানের পানিতে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতো বাংলাদেশ সরকারের আশু পদক্ষেপ প্রার্থনা করছি। ক্ষুদ্র শিক্ষক হিসেবে আমি তো নিবেদন করতেই পারি, তাই এই লেখা।
অদ্ভুত এক সময়ের পরিক্রমা পার করছি আমরা। চারদিকে 'মত প্রকাশের স্বাধীনতা'র নামে ব্যক্তিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ যেন আমাদের করে তুলেছে উদ্ধত আর সীমা অতিক্রমকারী। গঠনমূলক আলোচনার চাইতে ব্যক্তিগত আক্রোশ আর বিকারগ্রস্ত মানসিকতা যেন ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে; আর তাই কোনো সাধারণ বিষয়কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছি আমরা।
কথা বলছি বর্তমান সময়ে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পালের শাড়ি পরে একটি গানের সঙ্গে হেঁটে চলার ভিডিও প্রসঙ্গে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, তিনি ১৯৮৭ সালে ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের প্রকাশিত, আশরাফ বাবু রচিত ও সুরকৃত বহুল পরিচিত 'শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে' গানটির সঙ্গে হেঁটে বেড়াচ্ছেন স্কুল প্রাঙ্গণে। এক সময়ের বহুল জনপ্রিয় এ গানটির সঙ্গে আপনিও নিশ্চয়ই পরিচিত। কিন্তু বিকৃত রুচিবোধের একটি গোষ্ঠির প্রোপাগান্ডার ঝড়ে সেই হেঁটে বেড়ানোর মতো স্বাভাবিক ঘটনাটি নাচে রূপান্তরিত হতে বেশি সময় লাগল না! এতেই শুরু হলো প্রশ্ন ও সমালোচনা; আর পাশাপাশি তৈরি হতে লাগল সামাজিক কটাক্ষ ও চাপ।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধরনের সামাজিক কটাক্ষের মাঝেও সংহতি এবং প্রতিবাদ জানিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রাথমিক শিক্ষকগণ (লিঙ্গবৈষম্য করছি না বলে 'শিক্ষক' লিখছি) একই ধরনের ভিডিও তাদের ব্যক্তিগত ফেইসবুক প্রোফাইল থেকে আপলোড করেছেন। একজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া গোষ্ঠিবদ্ধ প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকগণ সংহতি ও প্রতিবাদের যে পথ বেছে নিয়েছেন, তা সত্যিই অভিনব, নান্দনিক এবং প্রশংসনীয়। তাদের এই প্রতিবাদের প্রতি একজন শিক্ষক হিসেবে সংহতি জানাতে পারা গর্বের। এই গৌরবে শামিল হতে যে শিক্ষক চাইবেন না, তার শিক্ষকতা নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি এই সংহতিমূলক গৌরবের অংশ হতে চাই; শিক্ষকতার চেতনা আমাকে এ শিক্ষাটিই দিয়েছে।
বাংলাদেশে দিন দিন নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার সীমা সংকুচিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে একটি গোষ্ঠি। বিউটি পালও সেই এজেন্ডারই শিকার হয়েছেন স্বভাবতই। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—একজন ব্যক্তি, নারী হন বা পুরুষ, আর তিনি সরকারি বা বেসরকারি যে পর্যায়েই কর্মরত থাকুন না কেন, তার ব্যক্তিগত জীবন থাকতে পারবে না? তার ব্যক্তিগত জীবন কি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মজীবন থেকে স্বতন্ত্র নয়? বিউটি পালের ভিডিওটি কি সরকারি চাকরিজীবীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের যে নীতিমালা, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক? যদি তা না হয়, তাহলে একজন শিক্ষকের মর্যাদাহানির জন্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? ভুল শব্দ প্রয়োগ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি সাধারণ বিষয়কে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপতৎপরতা কি সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়?
বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে তলিয়ে দেখার প্রয়োজন অনুভব করছি। পাশাপাশি, ক্লাসরুমে শিশুদের ছন্দে ছন্দে পাঠদানের যে ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যায়, সেগুলো কি নিছকই নৃত্যভঙ্গিমার প্রকাশ? নাকি সেগুলোকে শিক্ষার্থীদের মাঝে পড়াশোনার ভীতি কাটিয়ে শিক্ষাকে আরও গ্রহণযোগ্য করার প্রচেষ্টা হিসেবে পাঠ করার সুযোগ নেই?
যেখানে সরকার গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে এসে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার উপর জোরারোপ করেছে, সেখানে এই ধরনের শিশুবান্ধব শিক্ষণ পদ্ধতি, যা শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়ক, তা কীভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার অবকাশ রাখে? আর যদি তা হয়েই থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে শিক্ষকের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটুকু? নাকি একজন নারী হিসেবে জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়াই বিউটি পালের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল?
প্রশ্নগুলো সরকারের প্রতি তোলা রইল। প্রশ্ন রইল সকলের প্রতি—যারা নিজেদের সুশীল সমাজের মানুষ হিসেবে দাবি করেন, কিন্তু শিক্ষকের অমর্যাদায় থাকেন নিশ্চুপ। যেখানে এমন একজন শিক্ষকের পাশে বিনাবাক্যব্যয়ে দাঁড়ানোর প্রয়োজন, সেখানে তার এই ভিডিওটিতে আচরণবিধি লঙ্ঘনের আলামত আছে কি না, সেটার তদন্ত করতে চাওয়া সরকারের দূরদর্শিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কে বা কারা একজন গুণী শিক্ষকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালাল, তাদের শাস্তির আওতায় না এনে, উল্টো ওই ঘটনার তদন্ত করতে চাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত নিন্দনীয়। শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার দায় সমগ্র জাতির মূল্যবোধ তৈরির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন অবশ্যম্ভাবী।
যে জাতি তার শিক্ষকের মর্যাদা বিধান করতে পারে না, সে জাতির ভবিষ্যৎ শুধু সংকটাপন্নই নয়, বরং অন্ধকারাচ্ছন্ন। আর তাই প্রতিক্রিয়াশীলদের সস্তা বয়ানের ভিত্তিতে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত আর মর্যাদাহানির যে নজির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে সরকারকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। কারণ বেলাশেষে আমরা তো রাষ্ট্রের প্রতিই আনুগত্যশীল। সরকারই যদি প্রতিবিধান না করে, তবে আর কার কাছে আর্জি প্রকাশ করা যায়?
ছোটবেলায় পড়া কবি কাজী কাদের নেওয়াজের বিখ্যাত 'শিক্ষাগুরুর মর্যাদা' কবিতাটির কথা মনে পড়ে যায়। শিক্ষক সমাজের প্রতি বাদশাহ আলমগীরের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের যে কাব্যিক দৃষ্টান্ত আমাদের মননে বপন করেছিলেন একজন কবি, সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হোক দেশ, কাল, পাত্র, বর্ণ, সরকার নির্বিশেষে সকল সময়ের জন্য। আমরা যেন সমস্বরে বলতে পারি, 'আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির/ সত্যি তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।'
রুদমিলা মাহবুব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের সিনিয়র লেকচারার। ই-মেইল: [email protected]
শিক্ষক বিউটি রাণীর পাশে সহকর্মীরা, 'শ্রাবণের মেঘগুলো' গানে সয়লাব