Published : 16 Jul 2026, 04:30 PM
বন্ধুদের আড্ডায় জোড় সংখ্যার চেয়ে বিজোড় সংখ্যা, বিশেষ করে ‘তিন বন্ধু’র দল সবসময়ই জটিল। মনস্তত্ত্বে তিনজনের বন্ধুত্বকে বলা হয় ‘ফ্রেন্ডশিপ ট্রায়াঙ্গেল’।
এই ত্রিকোণ সম্পর্কের চেনা অন্ধকার দিকটি হল, দলের দুজন যখন একটু বেশি কাছাকাছি চলে আসে, তখন তৃতীয় বন্ধুটি তীব্র একাকিত্ব, ঈর্ষা এবং ক্ষোভে ভুগতে শুরু করেন।
পরিস্থিতি আরও বিষাক্ত হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ওই দুই বন্ধুর একজন হয়তো সামনাসামনি অন্যজনকে পাত্তাই দেয় না, অথচ আড়ালে তাদের মধ্যে গভীর খাতির ও ভিডিও কলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হয়।
আর এই পুরো নাটকের মাঝে তৃতীয় বন্ধুটি, যিনি বিপদে-আপদে বেশি সাহায্য করেন, তিনি নিজেকে কেবলই একটি ‘ব্যবহার্য বস্তু’ বা ‘থার্ড হুইল’ মনে করতে শুরু করেন।
মনোবিজ্ঞানে একে ‘সোশ্যাল এক্সক্লুশন’ বা ‘থার্ড-হুইল সিন্ড্রোম’ বলা হয়।
সাইকোলজি টুডে ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়ে, নিউইয়র্কের মনোবিদ ডা. সাব্রিনা রোমানফ এবং ডা. আইরিন এস লেভিন মত দেন যে, এই বিষাক্ত চক্র থেকে বাঁচতে সরাসরি কথা বলা এবং নিজের সামাজিক বৃত্ত বড় করা প্রয়োজন।
পাত্তা না দিয়েও আড়ালে খাতির: এর পেছনের মনস্তত্ত্ব কী?
সামনে অবহেলা আর আড়ালে গভীর যোগাযোগের এই অদ্ভুত আচরণকে মনস্তত্ত্বে বলা হয় ‘কমপার্টমেন্টালাইজেশন’ বা ‘সোশ্যাল মাস্কিং’।
এর পেছনে প্রধানত ২টি কারণ থাকে।
নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা: অনেক সময় এক বন্ধু, অন্য বন্ধুর সামনে নিজের অস্তিত্ব বড় করে দেখাতে চায়। সে হয়তো দলের সবার সামনে নিজেকে একটু ‘সুপিরিয়র’ বা বড় দেখাতে অন্যজনকে পাত্তা দেয় না, তবে আড়ালে তার একাকিত্ব কাটাতে বা নিজের স্বার্থে সেই বন্ধুর সঙ্গেই ভিডিও কলে মেতে ওঠে।
স্বার্থপরতা ও নিরাপত্তাহীনতা: কিছু মানুষের স্বভাব থাকে আলাদা আলাদা মানুষের কাছ থেকে আলাদা সুবিধা নেওয়া। সে হয়তো আপনার কাছ থেকে সাহায্য নিচ্ছে, আবার অন্য বন্ধুর কাছ থেকে বিনোদন বা গসিপ নিচ্ছে।
তবে যে বন্ধুটি বেশি সাহায্য করেও অবহেলার শিকার হচ্ছেন, তার মনে ক্ষোভ জমাই স্বাভাবিক। এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এই মনোবিজ্ঞানীরা ৫টি কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছেন।
‘হেল্পার সিন্ড্রোম’ থেকে বের হয়ে আসা
বন্ধু হিসেবে সাহায্য করেন বলেই যে তারা আপনাকে সমান মর্যাদা দেবে, এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মনস্তত্ত্বে একে বলা হয় ‘হেল্পার সিন্ড্রোম’।
যদি দেখা যায়, সাহায্যের মূল্যায়ন না করে আপনাকে বাদ দিয়ে তারা আলাদা পরিকল্পনা করছে, তবে তাদের জন্য নিজের সময় ও শ্রম দেওয়া সীমিত করতে হবে।
সম্পর্কে ‘উইথড্রয়াল’ বা একটু দূরত্ব বজায় রাখলে অনেক সময় অন্য পক্ষ, অন্যজনের গুরুত্ব বুঝতে পারে।
সরাসরি এবং শান্তভাবে কথা বলা
মনের ভেতর ক্ষোভ পুষে রাখলে তা এক সময় বড় বিস্ফোরণ ঘটাবে। তাই দুই বন্ধুকে একসঙ্গে বসিয়ে বা ‘গ্রুপ চ্যাটে’ শান্তভাবে নিজের খারাপ লাগার বিষয়টি জানাতে হবে।
কোনো অভিযোগের সুরে না বলে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা যায়। যেমন, ‘তোমরা যখন আমাকে না জানিয়ে আলাদা কথা বল বা ভিডিও কল কর, তখন আমার একা লাগে। আমি কি তোমাদের বন্ধুত্বে কোনোভাবে বাধা হচ্ছি?’
তাদের প্রতিক্রিয়া দেখলেই বোঝা যাবে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করছে নাকি অজান্তে।
পরোক্ষ আচরণকে পাত্তা দেওয়া বন্ধ করা
সামনে পাত্তা না দিয়ে আড়ালে খাতির জমানো বন্ধুদের মনস্তত্ত্ব বেশ দুর্বল হয়। তারা দ্বিমুখী আচরণে অভ্যস্ত। এই ধরনের আচরণকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে, এটিকে তাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ত্রুটি হিসেবে দেখতে হবে।
যে মানুষ সামনে অন্যকে সম্মান করতে পারে না, তার আড়ালের খাতির কখনই দীর্ঘমেয়াদী বা সৎ হয় না।
নিজের সামাজিক বৃত্ত বড় করা
একজন যখন কেবল ওই দুই বন্ধুর ওপরেই মানসিকভাবে নির্ভরশীল থাকেন, তখন তার কষ্টের মাত্রা তীব্র হয়।
‘জার্নাল অফ পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’তে প্রকাশিত, ওহাইও ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উইলিয়াম রলিন্সের বন্ধুত্বের গতিবিদ্যা সম্পর্কিত গবেষণায় উল্লেখ করেন, ‘তিন বন্ধুর দল থেকে সাময়িক দূরত্ব বজায় রেখে নতুন বন্ধু তৈরি করলে বা অন্য সামাজিক কাজে যুক্ত হলে মানসিক চাপ দ্রুত কমে যায়।’
তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখা উচিত হবে যেন তাদের ভিডিও কল বা চ্যাটিং আর প্রভাবিত না করে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া: এটি কি আদৌ বন্ধুত্ব?
সম্পর্ক-বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ কেইশা স্যান্ডার্স-ওয়াল্ড্রন সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “বন্ধুত্বে সমতা এবং পারস্পরিক সম্মান থাকা বাধ্যতামূলক। যদি স্পষ্ট কথা বলার পরও তাদের আচরণের কোনো পরিবর্তন না হয় এবং আপনাকে কেবল প্রয়োজনেই মনে রাখা হয়, তবে বুঝে নিতে হবে এই ট্রায়াঙ্গেলটি একটি ‘টক্সিক’ বা বিষাক্ত সম্পর্কে রূপ নিয়েছে।”
এমন পরিস্থিতিতে সেই বন্ধুত্বকে বিদায় জানিয়ে নিজের আত্মসম্মান বাঁচানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন
বয়সের সঙ্গে যে কারণে বদলে যায় বন্ধুত্ব