Published : 15 Jul 2026, 04:32 PM
রাত জেগে কাজ করতে বা পড়াশোনা অনেকের প্রতিদিনের কাজ। কেউ গভীর রাত পর্যন্ত বই পড়েন, কেউ কাজ করেন, আবার কেউ বিনোদনে সময় কাটান। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে লাগে কষ্ট।
তবুও রাতেই তারা সক্রিয়।
এমন মানুষদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলিছে নানান গবেষণা। এবার নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের স্বাভাবিক অভ্যাস রাতে জেগে থাকা, তাদের হৃদ্স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে।
‘জার্নাল অব দ্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এর তিন লাখ বাইশ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের মধ্যবয়স্ক এবং বয়স্ক মানুষ।
বোস্টনের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং ব্রিঘাম অ্যান্ড উইমেনস হসপিটালের মেডিসিন বিভাগের করা এই গবেষণার ফল বলছে, ‘বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে রাতে সক্রিয় থাকার অভ্যাস হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
শরীরের নিজস্ব সময়সূচির গুরুত্ব
গবেষণার প্রধান গবেষক সিনা কিয়ানার্সি সিএনএন ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “প্রত্যেক মানুষের শরীরে একটি স্বাভাবিক জৈবিক সময়সূচি থাকে। এই সময়সূচি ঠিক করে দেয়, কে সকালে বেশি সতেজ থাকবেন, কে রাতে বেশি সক্রিয় থাকবেন, আর কার ক্ষেত্রে দুটি সময়ই প্রায় সমান থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন শরীরের এই স্বাভাবিক ছন্দ কর্মস্থল, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন দায়িত্বের সঙ্গে মিলতে পারে না। ফলে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না, খাবারের সময় অনিয়মিত হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর চাপ পড়তে শুরু করে।”
হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গে যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে
গবেষণায় হৃদ্স্বাস্থ্য মূল্যায়নের জন্য আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান না করা, ভালো ঘুম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, রক্তের চর্বি, রক্তে শর্করা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা রাতে বেশি জেগে থাকেন, তাদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপানের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
এসব কারণ একসঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সিনা কিয়ানার্সি বলেন, “মাঝামাঝি ধরনের ঘুমের অভ্যাস যাদের ছিল, তাদের তুলনায় রাতজাগা মানুষের সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ঊনআশি শতাংশ বেশি ছিল। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে হৃদ্রোগ কিংবা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টির ঝুঁকিও বেশি দেখা গেছে।”
যে কারণে নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, রাত জাগার সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্যের নেতিবাচক সম্পর্ক নারীদের ক্ষেত্রে বেশি স্পষ্ট।
যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। গবেষকদের ধারণা, হরমোনজনিত পরিবর্তন, ঘুমের ধরন এবং প্রতিদিনের দায়িত্বের পার্থক্য এর কারণ হতে পারে।
তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
শুধু ঘুম নয়, পুরো জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফাইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক সাবরা অ্যাবট বলেন, “রাত জাগা মানুষের জীবনযাপন অনেক সময় অনিয়মিত হয়ে পড়ে। শুধু ঘুম নয়, খাবার খাওয়ার সময়, আলোতে থাকার সময় এবং প্রতিদিনের কাজের সময়সূচিও এলোমেলো হয়ে যায়।”
তার মতে, “এই অনিয়ম শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দকে আরও ব্যাহত করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
“যারা রাতে জেগে থাকেন, তাদের নিজেদের স্বাভাবিক অভ্যাস পুরোপুরি বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন বিষয়গুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়াই বেশি কার্যকর”, পরামর্শ দেন তিনি।
সকালপ্রিয় মানুষেরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্বাভাবিকভাবে সকালে উঠতে পছন্দ করেন, তাদের মধ্যে হৃদ্স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার ঝুঁকি, মাঝামাঝি ধরনের মানুষের তুলনায় প্রায় পাঁচ শতাংশ কম ছিল।
অন্যদিকে, প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে অংশগ্রহণকারীদের অনুসরণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, রাতজাগা মানুষের হৃদ্রোগ বা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ষোলো শতাংশ বেশি।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই গবেষণা থেকে রাত জাগাই সরাসরি হৃদ্রোগের কারণ, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা, যেখানে দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেছে।
রাতজাগা মানুষের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
যুক্তরাষ্ট্রের ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের সার্কাডিয়ান ও স্লিপ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টেন নাটসন বলেন, “রাত জাগার অভ্যাস থাকলেই যে কারও হৃদ্রোগ হবেই, এমন নয়।”
তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, ধূমপান থেকে দূরে থাকা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখা।
এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ঝুঁকি কমাতে করা উচিত
গবেষকদের মতে, যারা রাতে বেশি জেগে থাকেন, তাদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করতে হবে।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত সময় ঘুমানো গুরুত্বপূর্ণ। সকালে কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকা শরীরের জৈবিক সময়সূচি ঠিক রাখতে সাহায্য করতে পারে।
পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, রক্তচাপ, রক্তের চর্বি এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি।
আরও পড়ুন
ভালো ঘুম আর ওজন কমাতে ম্যাগনেসিয়ামের ভূমিকা