Published : 09 Jul 2026, 05:35 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখে পড়ে হরেক রকমের সুস্থতার পন্থা। এসবের মধ্যে একটি হল ‘স্লিপি গার্ল মকটেইল’ কিংবা হরেক রকমের ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট।
ইনফ্লুয়েন্সারদের দাবি— রাত্রে একটু ম্যাগনেসিয়াম খেলেই নাকি নিমেষে মিলবে চমৎকার ঘুম, আর ঝরঝর করে কমে যাবে শরীরের বাড়তি ওজন!
অনলাইনেও এই খনিজের সাপলিমেন্ট বিক্রির জন্য, নানান আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণা বলছে অন্য কথা।
ভালো ঘুমের দাবি কি সত্যি?
মিশিগান ইউনিভার্সিটির স্লিপ মেডিসিন ফেলোশিপের পরিচালক এবং নিউরোলজির ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ডা. অনিতা শেলগিকার সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খেলে অনিদ্রা এক রাতে উধাও হয়ে যাবে, এমন দাবির পেছনে পর্যাপ্ত বা অকাট্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা নেই।”
যদিও শরীরকে শান্ত করতে এর একটি জৈবিক ভূমিকা রয়েছে।
নিউ ইয়র্কের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ সামান্থা ক্যাসেটি একই প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, “ম্যাগনেসিয়াম শরীরে ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ উৎপাদনে সাহায্য করে এবং মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে।”
তবে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য কনভারসেশন’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কথা উল্লেখ করে এই পুষ্টিবিদ জানান- দেখা গেছে, ম্যাগনেসিয়াম কেবল ঘুমিয়ে পড়ার সময়টিকে সামান্য কমাতে পারে, পুরো অনিদ্রা রোগ ভালো করতে পারে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ও ঘুমের মান বাড়ানোর কোনো স্বাস্থ্য দাবির সঙ্গে ম্যাগনেসিয়ামের সরাসরি যোগাযোগের অনুমোদন দেয়নি।
ওজন কমানোর দাবি কতটুকু সত্যি?
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকীগুলোর মতে, ম্যাগনেসিয়াম কোনো ‘ফ্যাট বার্নার’ বা চর্বি গলানোর ওষুধ নয়। তবে এটি পরোক্ষভাবে কাজ করে।
হেল্থ ডটকম’য়ে প্রকাশিত ‘হোয়াট হ্যাপেন্স হোয়েন ইউ অ্যাড ম্যাগনেসিয়াম টু ইয়োর ডায়েট’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ম্যাগনেসিয়াম মূলত রক্তে শর্করা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।
শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের তীব্র ঘাটতি থাকলে বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং মানসিক চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’ বেড়ে যায়। কর্টিসল বাড়লে মানুষের মিষ্টি বা ফাস্টফুড খাওয়ার প্রতি ক্রেভিং বা লোভ বাড়ে, যা ওজন বাড়িয়ে দেয়।
তাই পুষ্টিবিদদের মতে, ম্যাগনেসিয়াম সরাসরি ওজন কমায় না; বরং শরীরের মেটাবলিজম ঠিক রেখে ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে সহজ করে মাত্র।
শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি বোঝার উপায়
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য-বিষয়ক ওয়েবসাইট ফাউন্টেন লাইফ-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব ঘটলে সাধারণত ৭টি প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায়।
পেশিতে অনবরত টান ধরা: বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় পায়ের পেশিতে তীব্র টান বা ক্র্যাম্প লাগা।
অস্বাভাবিক ক্লান্তি: পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও সারাদিন শরীরে চরম শক্তির অভাব ও অলসতা বোধ করা।
অনিদ্রা ও অস্থিরতা: বিছানায় এপাশ-ওপাশ করা, সহজে গভীর ঘুম না আসা।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি: হুট করে মন খারাপ হওয়া, খিটখিটে মেজাজ কিংবা বিষণ্ণতা বেড়ে যাওয়া।
হজমের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য: অন্ত্রের পেশি শিথিল না হওয়ার কারণে নিয়মিত পেট পরিষ্কার না হওয়া।
হৃদস্পন্দনের অনিয়ম: বুক ধড়ফড় করা বা হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বা ধীর হওয়া।
হাড়ের দুর্বলতা: দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
ঘাটতি পূরণের পন্থা
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৩১০ থেকে ৪২০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়ামের প্রয়োজন হয়। বিষয় হল, কোনো সাপ্লিমেন্ট ছাড়াই প্রতিদিনের সুষম খাবার থেকে এই চাহিদা শতভাগ পূরণ করা সম্ভব।
প্রাকৃতিক উৎস:
বাদাম ও বীজ: চিনা বাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম বিশেষ করে কুমড়ার বীজকে বলা হয় ম্যাগনেসিয়ামের ‘পাওয়ার হাউজ’।
সবুজ শাকসবজি: পালংশাক, পুঁইশাক বা যে কোনো গাঢ় সবুজ রংয়ের শাক।
গোটা শস্য: লাল চালের ভাত, ওটস, গম এবং কিনোয়া।
ফল ও ডাল: কলা, কালো শিম, ছোলা ও মসুর ডাল।
ডার্ক চকোলেট: যারা চকোলেট ভালোবাসেন, তাদের জন্য ৭০ শতাংশ বা এর বেশি ডার্ক চকোলেট, ম্যাগনেসিয়ামের ভালো উৎস হতে পারে।
সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার আগে সাবধানতা
ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট এবং খাদ্যের গুণগত মান যাচাইয়ের প্রতিষ্ঠান ‘এনএসএফ ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রধান প্রধান কারিগরি ব্যবস্থাপক জন ট্র্যাভিস সিএনএন-কে জানান, বাজারচলতি ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্টগুলো মূলত সমুদ্রের পানি বা খনি থেকে পাওয়া উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো খাওয়া মোটেও ঠিক নয়।
মার্কিন চিকিৎসকদের নির্দেশিকা অনুসারে ওয়েবএমডি ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, দৈনিক ৩৫০ মিলিগ্রামের বেশি সাপ্লিমেন্ট নিজে নিজে খেলে তীব্র ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, পেট কামড়ানো এবং কিডনি বা বৃক্কের ওপর মারাত্মক চাপ পড়তে পারে।
বিশেষ করে যাদের কিডনির রোগ রয়েছে, তাদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি সেবন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
মনে রাখতে হবে
ওজন কমানো বা ভালো ঘুমের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট খনিজের ওপর অলৌকিক ভরসা করা ভুল। বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত পরামর্শ হল, অনলাইনের চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে সাপ্লিমেন্ট না কিনে, রোজকার খাদ্যাভ্যাসে বাদাম, শাকসবজি আর ফলমূল রাখতে হবে।
সেই সঙ্গে ক্যাফিন বর্জন ও স্ক্রিন টাইম কমালেই ঘুম এবং ওজন— দুটোই থাকবে একদম নিয়ন্ত্রণে।
আরও পড়ুন