Published : 15 Jul 2026, 07:19 PM
বিশ্বজুড়ে মেদ কমানো এবং মেটাবলিজম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখন আলোচিত নাম ‘ওজেম্পিক’ বা ‘ওয়েগোভি’-র মতো ওজন কমানোর ইনজেকশন।
তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেকেই ঝুঁকছেন এই থেরাপির দিকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘জিএলপি-ওয়ান’ (GLP-1) রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট’। তবে এই ইনজেকশনগুলো ব্যয়বহুল। আর নানান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো দামি ইনজেকশন বা ওষুধ ছাড়াই রান্নাঘরের খুব সাধারণ কিছু খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে এই ‘গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১’ বা (জিএলপি-ওয়ান) হরমোনের নিঃসরণ বাড়ানো সম্ভব।
এই হরমোন, মস্তিষ্ককে পেট ভরা থাকার সংকেত পাঠায় এবং পরিপাক প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। যা দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগা থেকে বিরত রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইউসি ডেভিস ইনোভেশন ইনস্টিটিউট ফর ফুড অ্যান্ড হেলথ’-এর বিভাগীয় প্রধান ও পরিচালক জাস্টিন সিগেল, আন্তর্জাতিক ‘ফুড টেকনোলজি’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্যানেল আলোচনায় বলেন, “জিএলপি-ওয়ান আমাদের জীবনযাত্রার এক রূপান্তরমূলক মুহূর্তে নিয়ে এসেছে। তবে ওষুধ ছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু খাবার প্রাকৃতিকভাবে শরীরের নিজস্ব এল-সেলকে উদ্দীপিত করে এই হরমোন তৈরি করতে পারে।”
পুষ্টি ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে নিচের ৫টি খাবার ও নিয়ম যোগ করে, ইনজেকশনের মতোই ‘ন্যাচারাল ওজেম্পিক ইফেক্ট’ বা প্রাকৃতিক তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব।
ওটস এবং বার্লি
ওটস এবং বার্লিতে ভালো পরিমাণে ‘বিটা-গ্লুকান’ নামক এক ধরনের দ্রবণীয় আঁশ থাকে।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘হেলথ অ্যান্ড ডিসকভারি’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা জানান, এই আঁশ অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ফারমেন্টেড বা গাঁজিত হয়ে ‘শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড’ তৈরি করে, যা সরাসরি পেট থেকে জিএলপি-ওয়ান হরমোন নিঃসরণ শুরু করে।
ফলে সকালের নাস্তায় ওটস খেলে, দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা দূরে রাখে।
ডিম ও চর্বিহীন প্রোটিন
প্রোটিন হল শরীরে প্রাকৃতিক উপায়ে জিএলপি-ওয়ান বাড়ানোর শক্তিশালী উৎস।
হেলথলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, পুষ্টি নির্দেশিকায় বলা হয়- ডিম, মুরগির মাংস বা ডাল ধরনের খাবার পরিপাকতন্ত্রে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শরীর দ্রুত তৃপ্তির হরমোন নিঃসরণ করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।
সকালে একটি বা দুটি ডিম খাওয়া সারাদিনের অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বা ‘ক্রেভিং’ অনেকাংশেই কমিয়ে দেয়।
চিনা বাদাম, তিসি ও সরিষার তেল
খাদ্যাভ্যাসে ভালো চর্বি বা ‘মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট’ রাখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাশন হেলথ প্রাইমারি কেয়ার’-এর চিকিৎসকদের প্রকাশিত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ভালো চর্বি পাকস্থলী খালি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি বজায় রাখে।
এজন্য বিদেশি ও মহার্ঘ্য অ্যাভোকাডো বা অলিভ অয়েলের পেছনে টাকা খরচ না করে, হাতের কাছে থাকা চিনা বাদাম, কাঠবাদাম বা তিসির বীজ খাওয়া যেতে পারে।
এছাড়া রান্নায় খাঁটি সরিষার তেল বা রাইস ব্র্যান অয়েল ব্যবহার করলেও এই উপকারী ফ্যাট বা চর্বি পাওয়া যায়।
কিমচি ও টক দই
অন্ত্রের বা পেটের স্বাস্থ্য যত ভালো থাকবে, শরীর তত বেশি জিএলপি-ওয়ান হরমোন তৈরি করতে পারবে।
‘ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়- টক দই, কিমচি, বা আচারের মতো গাঁজন করা বা ফারমেন্টেড খাবার প্রাকৃতিকভাবে অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের কার্যকারিতা সচল করে তোলে।
খাবার খাওয়ার সঠিক ক্রম
খাদ্যাভ্যাস বা ডায়েটি শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, ‘কীভাবে খাচ্ছেন’ সেটাও জরুরি।
ফোর্বস ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, মার্কিন পুষ্টি প্রশিক্ষক হেইডি বোর্স্ট পরামর্শ দেন, “খাবার খাওয়ার সময় প্রথমে পাতে থাকা শাকসবজি বা আঁশ শেষ করুন, এরপর প্রোটিন (মাছ বা মাংস) খান এবং সবশেষে কার্বোহাইড্রেইট (ভাত বা রুটি) মুখে তুলুন। এই ক্রমান্বয় বা সিকোয়েন্স প্রাকৃতিকভাবে শরীরের জিএলপি-ওয়ান হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।
মনে রাখতে হবে
ওজন কমানোর জন্য কৃত্রিম ওষুধের চেয়ে জীবনযাপনের এই পরিবর্তনগুলো টেকসই।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আঁশ ও প্রোটিন রাখার পাশাপাশি প্রতি বেলা খাওয়ার পর ১০-১৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমানো, শরীরের এই মেদ কমানোর হরমোনকে প্রাকৃতিকভাবেই শতভাগ সচল রাখতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন
জোরে না আস্তে দৌড়ালে ওজন কমবে?