১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্রামের ঘাটতি থেকে কর্মীদের অসুস্থতা

টেবিলে বেশিক্ষণ থাকা মানেই কর্মী বেশি কাজ করছেন, এই ধারণা ভুল।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Jun 2026, 06:09 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:24 PM

বিভিন্ন অফিসে বা কর্মক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কা হচ্ছে। কর্মীরা হয়ত এক নীরব ক্লান্তির মধ্যে দিয়ে পার করছেন।

এটি একদিনের কোনো ক্লান্তি নয়। প্রতিদিনের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চারপাশের মানসিক চাপ আর ‘কষ্ট করলেই কেষ্ট মেলে’— এমন একটি সামাজিক ধারণার ফলে এই ক্লান্তি তৈরি হচ্ছে।

আমাদের সমাজে বিশ্রামকে ভাবা হয় অলসতা বা দুর্বলতা। আর না ঘুমিয়ে একটানা কাজ করাকে দেখা হয় বীরত্ব হিসেবে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্যালপ’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিষয়ে আরও জানানো হয়, এর ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। মিটিং রুমে হয়তো এই ক্লান্তি চট করে চোখে পড়ে না, তবে অফিসে কাজের ক্ষেত্রে ঠিকই ধরা পড়ে।

কর্মীরা কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন, চাকরি ছাড়ার হার বাড়ছে। আর অফিসের সবচেয়ে দক্ষ কর্মীরাই সবার আগে চলে যাচ্ছেন।

কারণ, তারা বুঝতে পারছেন যে, এভাবে দিনের পর দিন চলতে পারে না।

‘বার্নআউট’ আসলে কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালে ‘বার্নআউট’ বা অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে তৈরি হওয়া চরম অবসাদকে তাদের আন্তর্জাতিক রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যার শ্রেণিবিন্যাস-এ একটি দাপ্তরিক পেশাগত সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তিনটি লক্ষণ দেখে এটি বোঝা যায়:

  • শরীরে ও মনে কোনো শক্তি না থাকা।
  • নিজের কাজ বা অফিস থেকে মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়া।
  • কাজের দক্ষতা বা পারফরম্যান্স কমে যাওয়া।

এই বার্নআউটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল, এটি কোনো জানান দিয়ে আসে না। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে এটি মানুষের ভেতরে জমতে থাকে।

যখন একজন কর্মী ঘন ঘন অসুস্থ হতে শুরু করেন বা চাকরি ছেড়ে দেন, তখনই কেবল বিষয়টি সবার নজরে আসে। তবে ততক্ষণে অফিসের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

মার্কিন সংস্থা ‘সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’-এর একটি অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন ভালো কর্মীর বদলে নতুন কর্মী নিতে গেলে, তার পেছনে যে খরচ হয়, সেটা ওই কর্মীর বার্ষিক বেতনের ৫০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে!

বেশি কাজ মানেই কি বেশি উৎপাদন?

যে কর্মী যত বেশি সময় টেবিলে বসে থাকবেন, তিনি তত বেশি কাজ করবেন।  

তবে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জন পিনকাভেল-এর করা ‘দি রিলেশনশিপ বিটউইন আওয়ার্স ওয়ার্কড অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি’ গবেষণা এই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে মানুষের কাজের গতি ও মান দ্রুত কমতে থাকে।

যে কর্মী সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজ করছেন, তিনি আসলে ৫৫ ঘণ্টা কাজ করা কর্মীর চেয়ে বেশি কিছুই তৈরি করতে পারছেন না। তিনি কেবল একই কাজ টেনেটুনে বেশি সময় ধরে করছেন, যার ফলে তার শরীরের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন, তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়।

ক্যালেন্ডারের পাতায় ওভারটাইমের হিসাব থাকলেও, শরীরের ওপর হওয়া অত্যাচারের হিসাব ঠিকই কড়ায়-গণ্ডায় উশুল করে নেয়।

সবচেয়ে বড় বলিদান হয় ‘ঘুম’

শরীর ও মনকে পুনরায় সতেজ করার বড় এবং সহজ উপায় হল ঘুম। অথচ সবার আগে এই ঘুমের সময়ই কাটছাঁট করি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউসি বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্স ও সাইকোলজির অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়াকার, তার বই ‘হোয়াই উই স্লিপ’-এ দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাবকে আমাদের সময়ের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তার গবেষণায় দেখা গেছে, টানা ১৭ থেকে ১৯ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে থাকলে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও মনোযোগ এতটাই কমে যায়, যা রক্তে ০.০৫ শতাংশ অ্যালকোহল থাকার সমান।

অর্থাৎ, একজন মদ্যপ ব্যক্তি যেমন ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, একজন ঘুমহীন মানুষের অবস্থাও তেমন হয়।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হল, ক্লান্ত থাকলে মানুষ নিজেই বুঝতে পারে না যে তার কাজের ক্ষমতা কতটা কমে গেছে।

চারপাশের বেশিরভাগ পেশাজীবী এই ঘুমহীন ক্লান্ত জীবনকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন।

ঊর্ধ্বতনদের এখনই ভাবতে হবে

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যালপ-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন ‘এমপ্লয়ি বার্নআউট: কজেস অ্যান্ড কিওরস’-এ দেখা গেছে, বার্নআউটের শিকার কর্মীরা সাধারণ কর্মীদের চেয়ে ৬৩ শতাশ বেশি অসুস্থতার ছুটি নেন।

আর তাদের নতুন চাকরি খোঁজার সম্ভাবনা থাকে ২.৬ গুনেরও বেশি।

তাই কর্মীদের সুস্থতার পেছনে বিনিয়োগ করাটা কোনো বিলাসিতা নয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বিশ্রামের সুযোগ না দেয়, তবে তার খেসারত দিতে হয় আড়ালে, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির মাধ্যমে।

এই বিষয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ফ্লো ফেস্ট’ কর্মক্ষেত্রে ‘মাইন্ডফুলনেস’ বা মনোযোগের চর্চা, শারীরিক সক্রিয়তা এবং পারস্পরিক মেলবন্ধন তৈরি করে অফিসের কাজের পরিবেশ বদলে দেওয়াতে কাজ করে যাচ্ছে।

এর প্রতিষ্ঠাতা শাজিয়া ওমর বলেন, “কাস্টমাইজড বা বিশেষ ভাবনায় তৈরি এসব প্রোগ্রামের মাধ্যমে কর্মীদের চরম ক্লান্তি (বার্নআউট) দূর করতে এবং কাজের শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে; যা কর্মীদের ভালো থাকাকে কেবল একটি বাড়তি সুযোগ হিসেবে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।”

আরও পড়ুন

সুস্থ থাকতে সকালের ৫টি সহজ অভ্যাস

গভীর ও শান্তিময় ঘুমের জন্য রাতে হালকা ব্যায়াম

পরিমাণ মতো পানি পানে যে উপকার মিলবে