Published : 14 Jun 2026, 04:31 PM
শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করার জন্য দরকার পর্যাপ্ত পানি। প্রচলিত ধারণায়, দিনে আট গ্লাস পানি গ্রহণ করাই যথেষ্ট। তবে বিষয়টি এতটা সহজ ভাবেও ভাবা যাবে না।
বয়স, লিঙ্গ, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং গর্ভাবস্থা বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে পানির চাহিদা পরিবর্তিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পুষ্টিবিদ লোটা আন্দোনিয়ান রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “পর্যাপ্ত পানি পান শুধু তৃষ্ণাই মেটায় না বরং হজম, রক্তচাপ, পেশির কার্যকারিতা, মনোযোগ, মেজাজ এবং বিপাকক্রিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে।”
প্রতিদিন যতটুকু পানি প্রয়োজন
মার্কিন পুষ্টিবিদ গ্যাব্রিয়েল কিশনার একই প্রতিবেদনে বলেন, “সবার জন্য একই পরিমাণ পানি নির্ধারণ করা যায় না। বয়স, লিঙ্গ, জলবায়ু, দৈহিক পরিশ্রম, ঘামের পরিমাণ, বিভিন্ন রোগ, গর্ভাবস্থা কিংবা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো বিষয় পানির চাহিদাকে প্রভাবিত করে।”
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক পুষ্টিবিদ ড্যানি ডোমিঙ্গেজ বলেন, “প্রয়োজন অনুযায়ী অধিকাংশ নারীর প্রতিদিন প্রায় ৯ কাপ এবং পুরুষের প্রায় ১৩ কাপ পানি প্রয়োজন হতে পারে। তবে গরম আবহাওয়া, ব্যায়াম, জ্বর বা অতিরিক্ত ঘামের কারণে এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে।”
আবার দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ বা কিছু ওষুধ খেলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানির পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
শরীরের প্রতিটি অঙ্গের জন্য জরুরি
পানি শরীরের প্রতিটি কোষে পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সন্ধি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সুরক্ষা দেওয়া এবং প্রস্রাব, ঘাম ও মলত্যাগের মাধ্যমে বর্জ্য বের করে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও পানি দরকার।
গ্যাব্রিয়েল কিশনার বলেন, “দেহে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে, এসব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে শরীর ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।”
শক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়
অনেকেই দুপুরের দিকে অকারণ ক্লান্তি অনুভব করেন। অনেক সময় এর পেছনে পর্যাপ্ত পানি পান না করার বিষয়টি থাকে।
ড্যানি ডোমিঙ্গেজ বলেন, “শরীরে পানির ঘাটতি হলে কোষগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শক্তি কমে যায়, কাজের গতি ধীর হয়ে পড়ে এবং ব্যায়ামের সক্ষমতাও কমে যায়।”
হজম ভালো রাখে
ভালো হজমের জন্যও পানি অপরিহার্য।
লোটা আন্দোনিয়ান বলেন, “পর্যাপ্ত পানি পান, খাদ্য হজমে সহায়তা করে। কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমায়। বিশেষ করে যারা আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান, তাদের পর্যাপ্ত পানি পান করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পানি ছাড়া আঁশ ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।”
এছাড়া পানি শরীরে পুষ্টি উপাদান পরিবহনেও দরকার।
মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব
অনেক সময় পানি কম পানে মাথাব্যথা, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা খিটখিটে মেজাজও দেখা দিতে পারে।
লোটা আন্দোনিয়ান বলেন, “পর্যাপ্ত পানি পানে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয় এবং মেজাজও তুলনামূলক ভালো থাকে।”
অন্যদিকে গ্যাব্রিয়েল কিশনার বলেন, “শরীরে পানির ঘাটতি হলে মস্তিষ্ক স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে। ফলে চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা স্মৃতিশক্তিতেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে।
কিডনি সুস্থ রাখতে
কিডনির প্রধান কাজ হল, শরীর থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত লবণ বের করে দেওয়া। এই কাজের জন্য পর্যাপ্ত পানির প্রয়োজন।
নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পানে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে এবং মূত্রনালির সংক্রমণের সম্ভাবনাও হ্রাস পেতে পারে।
তবে যাদের দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানির পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি।
অতিরিক্ত পানি ক্ষতিকরও হতে পারে
পানি উপকারী। তবে অতিরিক্ত পান করা নিরাপদ নাও হতে পারে।
ড্যানি ডোমিঙ্গেজ বলেন, “অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি পান করলে, শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। এর ফলে বমিভাব, মাথাব্যথা, পেশিতে টান, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে ফোলাভাবও হতে পারে।”
তাই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নয়, বরং শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পানি পান করাই সবচেয়ে ভালো অভ্যাস।

শরীরে পানির ঘাটতির লক্ষণ
শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন- সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা, মনোযোগ কমে যাওয়া, গাঢ় হলুদ রংয়ের প্রস্রাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বিরক্তি, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ত্বকে চিমটি কাটার পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দেরি হওয়া।
যেভাবে সহজে পানি পানের পরিমাণ বাড়ানো যায়
নিজের সঙ্গে সব সময় পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল রাখা ভালো অভ্যাস হতে পারে। পানির স্বাদ বাড়াতে এতে লেবু, কমলা বা বিভিন্ন ফলের টুকরো যোগ করা যেতে পারে।
এছাড়া তরমুজ, শসা, কমলা, টমেটোর মতো পানিসমৃদ্ধ ফল ও সবজি প্রয়োজন বুঝে খাওয়াও উপকারী। চিনি ছাড়া ভেষজ চা বা সাধারণ পানিও তরলের চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে।
আরও পড়ুন
যেভাবে পানি পান করলে উপকার মিলবে বেশি