২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

মানসিক চাপ থেকে পেট খারাপ? রয়েছে সমাধান

অন্ত্র বা পেটকে ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা চলে। ফলে হজম প্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলে মানসিক অবস্থা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 28 Oct 2026, 03:30 PM

Updated : 28 Oct 2026, 02:55 PM

কাজের অতিরিক্ত চাপ, পারিবারিক কোনও দুঃসংবাদ বা অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক অস্থিরতায় ভুগলে মন খারাপের পাশাপাশি অনেকেরই হঠাৎ করে পেট ফাঁপা বা গ্যাস্ট্রিকের মতো শারীরিক অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়।

আপাতদৃষ্টিতে মানসিক আবেগের সঙ্গে পেটের এই সমস্যার কোনও মিল খুঁজে পাওয়া না গেলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই দুটি বিষয় আসলে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

অনেক সময় খাবারের তালিকায় কোনও পরিবর্তন না করলেও, অতিরিক্ত টেনশন বা মানসিক চাপের কারণে পেট ফাঁপা, বুক জ্বালাপোড়া বা হজমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

স্বাস্থ্য ও জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সেলফ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পরিপাকতন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘গাট-ব্রেন এক্সিস’ বা অন্ত্র-মস্তিষ্ক অক্ষ বলা হয়।

নিউ ইয়র্ক সিটির নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ ও গবেষক রেবেকা ডিটকফ প্রতিবেদনে বলেন, “অন্ত্র বা পেটকে মূলত মানবদেহের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা চলে। এটি আমাদের নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে মনের ভেতর চলতে থাকা যেকোনও ঝড় সরাসরি পেটের ভেতরের পরিবেশকে ওলটপালট করে দিতে পারে।”

মানসিক চাপ যেভাবে পেট ফাঁপার কারণ হয়

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, পরিপাকতন্ত্র মূলত ‘এন্টারিক নার্ভাস সিস্টেম’-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের নারী-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হরমোন-বিষয়ক পুষ্টিবিদ মেলিসা গ্রোভস আজারো বলেন, “মানবদেহ মূলত দুটি প্রধান স্নায়ুবিক অবস্থায় কাজ করে— প্রথমটি হল ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ এবং দ্বিতীয়টি হল ‘রেস্ট-অ্যান্ড-ডাইজেস্ট’।

যখন কেউ তীব্র মানসিক চাপে বা ভয়ের মধ্যে থাকেন, তখন শরীর ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ বা ‘হয় বাঁচো, নয়ত মরো’ মেজাজে চলে যায়। এই সময় ‘অ্যাড্রিনাল’ গ্রন্থি থেকে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন অনবরত নিঃসৃত হতে থাকে। শরীর তখন এই বিপদ সামাল দিতে পরিপাকতন্ত্রের দিকে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দিয়ে সমস্ত রক্ত ও শক্তি পেশির দিকে পাঠিয়ে দেয়।

ফলে সাময়িকভাবে পেটের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ বা ধীর হয়ে যায়, পাকস্থলীর পেশির সংকোচন কমে যায় এবং প্রয়োজনীয় পাচক রস উৎপাদন ব্যাহত হয়।

খাবার যখন পাকস্থলীতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে অপাচ্য অবস্থায় পড়ে থাকে, তখন সেখানে অতিরিক্ত গ্যাস জমতে শুরু করে, যা পেট ফাঁপা বা পেট ফোলার প্রধান কারণ।

কারও কারও ক্ষেত্রে এই মানসিক চাপ উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে মলাশয়ে বা অন্ত্রে তীব্র ‘ক্র্যাম্প’ বা ব্যথা এবং ডায়রিয়ার জন্ম দিতে পারে (যেমন ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম বা ‘আইবিএস’ রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়)।

মানসিক চাপজনিত পেট ফাঁপা দূর করার ৬টি কৌশল

অস্থিরতার সময় না খেয়ে থাকা যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি তাড়াহুড়ো করে খাওয়াও বিপদ বাড়ায়। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন।

‘ফোর-স্কয়ার’ শ্বাসের ব্যায়াম: খাওয়ার আগে শরীরকে শান্ত বা ‘রেস্ট-অ্যান্ড-ডাইজেস্ট’ মেজাজে ফেরাতে ৪-৪-৪-৪ ছন্দের একটি শ্বাসের ব্যায়াম করা যেতে পারে।

৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নেওয়া, ৪ সেকেন্ড শ্বাস আটকে রাখা, ৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস ছাড়া এবং পুনরায় ৪ সেকেন্ড আটকে রাখা— এই প্রক্রিয়া চারবার করলে স্ট্রেস হরমোন দ্রুত কমে আসে।

ডেস্ক বা কাজের জায়গা ছেড়ে দুপুরের খাবার খাওয়া: ল্যাপটপে টাইপ করতে করতে বা ইমেইলের উত্তর দিতে দিতে খাবার খাওয়া ক্ষতিকর। এতে অবচেতনভাবেই অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলা হয়, যা পেট ফাঁপার সমস্যাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তাই খাওয়ার জন্য অন্তত ২০ মিনিট সম্পূর্ণ আলাদা ও শান্ত পরিবেশ বেছে নেওয়া উচিত।

সহজে হজমযোগ্য বা গরম খাবার খাওয়া: মানসিক চাপের সময় কাঁচা সবজির সালাদ বা ক্রুসিফেরাস সবজি (যেমন ফুলকপি, ব্রকলি, বাঁধাকপি) খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো হজম করা পেটের জন্য বেশ কঠিন।

এর বদলে গরম স্যুপ বা স্মুদির মতো তরল এবং রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া ভালো, যা পেটের পেশিকে শিথিল করে।

কার্বোনেইটেড ও ডায়েট পানীয় বর্জন: কোল্ড ড্রিংকস, সোডা বা ডায়েট সোডা এবং স্ট্র দিয়ে যেকোনও তরল পান করা বন্ধ করতে হবে। এগুলোতে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড ও কৃত্রিম চিনি পেটের ভেতর প্রচুর গ্যাস তৈরি করে।

প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেইট এড়িয়ে চলা: অনেকেই মানসিক চাপ কমাতে ‘ইমোশনাল ইটিং’ বা অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মিষ্টি ও চর্বিযুক্ত মুখরোচক খাবার খেয়ে ফেলেন।

এগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে হজম প্রক্রিয়াকে আরও বিষাক্ত করে তোলে।

ভালোভাবে চিবিয়ে খাবার খাওয়া: তাড়াহুড়ো করে খাবার না গিলে, প্রতিটি লোকমা ভালো করে চিবিয়ে খাওয়া উচিত।

চিবানোর ফলে লালাগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এনজাইম খাবারকে আগেই আংশিক ভেঙে ফেলে, যা দুর্বল পরিপাকতন্ত্রের ওপর বাড়তি কাজের চাপ কমায়।

পুরনো খবর:

বেড়াতে গিয়ে পেটে সমস্যা? এই সমস্যার নামও আছে, সমাধানও আছে
খাওয়ার পরও কি পেট খালি লাগে? জেনে নিন এর পেছনের ৭ কারণ
অজান্তেই হয়ত বাড়াচ্ছেন মানসিক চাপ: এই ছোট অভ্যাসগুলো চিনে নিন