Published : 05 May 2026, 04:33 PM
বহুদিন পর একটা ভ্রমণের সুযোগ এল। পরিকল্পনা করলেন, সব গুছিয়ে নিলেন, উত্তেজনায় রাতে ঠিকমতো ঘুমও হল না।
তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরদিন সকালে টের পেলেন, পেটের স্বাভাবিক কাজকারবার থমকে গেছে। দুদিন, তিনদিন — হচ্ছেই না।
পেটে চাপ নিয়ে সুন্দর জায়গা দেখা, ভালো খাবার খাওয়া — কিছুই উপভোগ হচ্ছে না।
এই সমস্যা অনেকেরই হয়, তবে কেউ সহজে বলেন না।
লজ্জার কিছু নেই। এটা আসলে একটা পরিচিত শারীরিক অবস্থা, যার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নামও আছে।
'ট্রাভল কনস্টিপেইশন'
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন, “ভ্রমণে এই ধরনের সমস্যা এতটাই সাধারণ যে চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাকে আলাদা নামে চেনে— ‘ট্রাভল কনস্টিপেইশন’ বা ‘ভ্যাকেশন-ইনডিউসড কনস্টিপেইশন’ নামে।
পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ বেড়াতে গিয়ে এই সমস্যায় পড়েন। তাই নিজেকে দোষ দেওয়া বা লুকিয়ে কষ্ট পাওয়ার কারণ নেই।
তবে কারণ না বুঝলে সমাধানও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
অন্ত্র আসলে মস্তিষ্কের সঙ্গে কথা বলে- ভ্রমণে সেই যোগাযোগ গোলমাল হয়
এটা শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে, তবে সত্যি। আমাদের অন্ত্র স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। অনেকে রসিকতা করে বলেন অন্ত্র হল 'দ্বিতীয় মস্তিষ্ক'।
ভ্রমণে মানসিক উত্তেজনা থাকে— নতুন জায়গায় যাচ্ছি, নতুন অভিজ্ঞতা হবে। এই উত্তেজনা বা চাপ সরাসরি অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেয়।
মজার বিষয় হল, শুধু ভ্রমণের সময় নয়। ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে থাকলেই অনেকের পেটে গোলমাল শুরু হয়। কারণ মাথায় যে উত্তেজনা, সেটা অন্ত্রেও যায়।
রুটিন ভাঙলেই পেট সমস্যায় পড়ে
এটা আরেকটা বড় কারণ।
ডা. নয়ন বলেন, “দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সবকিছু একটা রুটিনে বাঁধা— ঘুম, খাবার, বাথরুম। শরীর এই রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। বাথরুমের একটা নির্দিষ্ট সময়ও থাকে— সকালে উঠে, বা নাস্তার পরে।”
বেড়াতে গেলে এই রুটিন ভেঙে যায়। ঘুমের সময় বদলায়, খাওয়ার সময় বদলায়। শরীর তখন বিভ্রান্ত— কখন কাজ করবে বুঝতে পারে না। ফলে পেট সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়।
অপরিচিত শৌচাগার, ভাগাভাগির অনীহা— এটাও কারণ
অনেকেই বিষয়টা স্বীকার করতে চান না, তবে এটা সত্যি।
হোটেলের বাথরুম অপরিচিত, পাবলিক টয়লেট অপরিষ্কার, রুম শেয়ার করলে লজ্জা লাগছে। এই কারণে অনেকে বাথরুমের বেগ চেপে রাখেন। এই চেপে রাখার অভ্যাসই সমস্যা তৈরি করে।
একবার, দুবার চেপে রাখলে শরীর বার্তা পাঠানো কমিয়ে দেয়। তখন আর বেগ আসে না, কিন্তু পেটে জমে থাকে।
সমাধান সহজ— শুধু কয়েকটা অভ্যাস মেনে চলতে হবে
সবচেয়ে সহজ সমাধান হল প্রচুর পানি পান করা। বেড়াতে গেলে খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরিতে মনোযোগ যায়। পানির কথা মনেই থাকে না।
তবে শরীরে পানি কম থাকলে মল শক্ত হয়ে যায়, বের হওয়া কঠিন হয়।
“সঙ্গে একটা পানির বোতল রাখলে, আর সারাদিন অল্প অল্প করে পান করলে অনেক সমস্যা এড়ানো যায়” পরামর্শ দেন ডা. নয়ন।
দীর্ঘ যানবাহনে চড়লে একনাগাড়ে বসে থাকা যাবে না। বিরতিতে নামুন, একটু হাঁটুন, শরীর টানটান করুন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পেটের স্বাভাবিক কার্যক্রম ধীর হয়।
খাবারের দিকে একটু মনোযোগ দিতে হবে। বেড়াতে গেলে চা-কফি বেশি গ্রহণ করা হয়। এটা আসলে পানিশূন্যতা বাড়ায়, পেটের সমস্যাও বাড়ায়।
সুযোগ পেলে দই খাওয়া যেতে পারে, যা অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বজায় রাখতে সাহায্য করে। আঁশযুক্ত খাবার, সবজি, ফল— পেট সচল রাখে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, বাথরুমের বেগ এলে চেপে রাখা যাবে না। অপরিচিত শৌচাগার হলেও যেতে হবে। একটু অস্বস্তি হবে। তবে দুই-তিন দিন না হওয়ার কষ্টের চেয়ে অনেক ভালো।
পেটকেও ছুটির অংশ করে নিন
ভ্রমণের আনন্দটা পরিপূর্ণ হয় যখন শরীর ভালো থাকে। আর শরীর ভালো রাখতে পেটের দিকে একটু নজর দিতে হবে।
“পানি পান করা, রুটিন মেনে চলা, নড়াচড়া করা, বেগ এলে চেপে না রাখা— এটুকু করলেই ‘ট্রাভল কনস্টিপেইশন’য়ের সমস্যা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব”- বলেন এই চিকিৎসক।
ভ্রমণ মানে শুধু সুন্দর জায়গা দেখা নয়, নিজেকে সুস্থ ও সতেজ রাখাও এর অংশ। পেট ঠিক থাকলে মন ঠিক থাকে, আনন্দও তখন পরিপূর্ণ।
আরও পড়ুন
ভ্রমণে দ্রুত জেট ল্যাগ কাটানোর উপায়