Published : 06 Jul 2026, 01:51 PM
বিশ্বকাপের সময় হোক কিংবা ইউরো কাপ, কোপা আমেরিকা বা আইপিএল- বাংলাদেশি ক্রীড়াপ্রেমীদের একটা বড় অংশ ফুটবল ও ক্রিকেটে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ভারতের মতো বিদেশি দলগুলোকে নিজেদের বুক দিয়ে ভালোবাসে।
তবে প্রশ্ন হল, ভৌগোলিক কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও সেই দূরের কোনো পরদেশি দল হারলে মন কেন এতটা খারাপ হয়? কেন চেনা কোনো বন্ধুর প্রিয় দল হারলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল বা উপহাসে মেতে ওঠা হয়?
আপাতদৃষ্টিতে একে কেবলই পাগলামি মনে হলেও, এর পেছনে কাজ করে জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ।
সাইকোলজি-টুডে ডটকম-সহ, খেলাধুলা-বিষয়ক বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত মনোস্তাত্ত্বিক প্রতিবেদন অবলম্বনে জানানো হল বিস্তারিত।
'মিরর নিউরন' এবং পরোক্ষ অনুভূতি
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্কে ‘মিরর নিউরন’ নামের এক বিশেষ কোষ রয়েছে। যখন প্রিয় কোনো খেলোয়াড়কে (যেমন- মেসি বা নেইমার) মাঠে কাঁদতে বা হতাশ হতে দেখা যায়, তখন সমর্থকের মস্তিষ্কের এই মিরর নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ফলে সেই খেলোয়াড়ের ভেতরের কষ্ট ও হতাশা হুবহু, সমর্থকের মস্তিষ্কেও অনুভূত হয়, যেন হারটা ‘আমাদের নিজেদেরই’!
সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব
১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ সামাজিক মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল একটি তত্ত্ব দেন, যা ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি থিওরি’ নামে পরিচিত।
ব্রিটিশ জার্নাল অব সোশ্যাল সাইকোলজি-তে প্রকাশিত গবেষণায় তিনি দেখান, মানুষ স্বভাবগতভাবেই কোনো একটি শক্তিশালী গ্রুপ বা দলের অংশ হতে চায়, যা তার নিজের আত্মপরিচয়কে বড় করে তোলে।
এই তত্ত্ব অনুসারে, যখন একজন বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমী নিজেকে ‘আর্জেন্টিনা’ বা ‘ব্রাজিল’ ফ্যান ক্লাবের সদস্য মনে করেন, তখন সেই দলের জয়কে তিনি নিজের ব্যক্তিগত জয় এবং হারকে নিজের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
'বার্গিং' এবং 'করফিং' মনস্তত্ত্ব
স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট রবার্ট সিয়ালদিনি এবং তার দল ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণায়, দুটি মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি-তে প্রকাশিত হওয়া তত্ত্ব দুটি হল:
বাস্কিং ইন রিফলেকটেড গ্লোরি বা বার্গিং: প্রিয় দল জিতলে মানুষ নিজেকে বিজয়ী মনে করে অহংকার বোধ করে (যেমন: ‘আমরা জিতে গেছি!’)।
কাটিং অফ রিফলেকটেড ফেইলর বা করফিং: প্রিয় দল হারলে মানুষ তীব্র লজ্জাবোধ ও সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে ভোগে, যা তাকে বিষণ্ণ করে তোলে। কারণ, অন্য দলের সমর্থকরা তখন তাকে ট্রল বা উপহাস করার সুযোগ পায়।

এই মন খারাপ ঠিক করার পন্থা
খেলার হারের কারণে হওয়া এই মানসিক ট্রমা বা বিষণ্ণতাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘স্পোর্টস ফ্যান ডিপ্রেশন’। এই হতাশা কাটিয়ে সুস্থ জীবনে ফেরার জন্য মনোবিদরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
আবেগীয় দূরত্ব বজায় রাখা: যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস সাইকোলজির অধ্যাপক ডা. ড্যানিয়েল ওয়ান, ২৫ বছর ধরে ক্রীড়াপ্রেমীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন।
তার ‘স্পোর্টস ফ্যানস: দ্য সাইকোলজি অ্যান্ড সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অব স্পেক্টেটরস’ বইয়ে পরামর্শ দিয়েছেন যে, ‘খেলা দেখার শুরুতেই মনকে বোঝাতে হবে, এটি কেবলই বিনোদনের একটি মাধ্যম, আমার বাস্তব জীবনের অস্তিত্ব এর ওপর নির্ভর করে না।’
খেলার ফলাফলকে ব্যক্তিগত জীবন থেকে আলাদা রাখার এই দেয়াল তৈরি করা জরুরি।
'২৪ ঘণ্টা নীতি' মেনে চলা: সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ ডা. কেইটি গ্লেন, সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরামর্শ দেন, “প্রিয় দল হারলে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা নিজেকে দুঃখ করার বা মন খারাপ রাখার অনুমতি দিন। তবে এর পরদিনই স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসতে হবে। ২৪ ঘণ্টার বেশি এই দুঃখকে টেনে নেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বিরতি বা ডিজিটাল ডিটক্স: ব্রিটিশ সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রিয় দল হারার পর ফেইসবুক বা এক্স (টুইটার)-এ স্ক্রোল করা বন্ধ রাখুন। কারণ প্রতিপক্ষ দলের ট্রল, মিম এবং কটু মন্তব্য আপনার মস্তিষ্কে কর্টিসল (মানসিক চাপের হরমোন) বাড়িয়ে দেবে, যা বিষণ্ণতাকে দীর্ঘস্থায়ী করবে।’
দলগত সংহতি খোঁজা: ডা. ড্যানিয়েল ওয়ানের মতে, “একা একা ঘরে বসে মন খারাপ না করে, নিজের দলের অন্য সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলুন। একসঙ্গে দুঃখ ভাগ করে নিলে বা খেলার ভুলত্রুটি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করলে মন হালকা হয়। একে মনোবিজ্ঞানে ‘ক্যাথারসিস’ বা মানসিক রেচন বলা হয়।”
শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়, ‘খেলা শেষে তীব্র মেজাজ খারাপ বা দুঃখ লাগলে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটুন, দৌড়ান বা শরীরচর্চা করুন। এতে মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিনস’ বা ভালো বোধের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা খেলার মাঠের হতাশা দূর করতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন