Published : 05 Jul 2026, 11:02 AM
অনেকেই মনে করেন, আঁকতে না পারলে, গান গাইতে না জানলে বা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে না পারলে, সৃজনশীল কাজ তাদের জন্য নয়।
তবে সৃজনশীলতার সুফল পেতে অসাধারণ প্রতিভার প্রয়োজন হয় না। বরং কিছু তৈরি করার পুরো প্রক্রিয়াটিই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
রং করা, ডায়েরি লেখা, রান্না, বাগান করা, সেলাই, কাগজ দিয়ে কিছু বানানো কিংবা নিজের মতো করে গান গাওয়া -এসবই হতে পারে মানসিক প্রশান্তির উপায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৃজনশীল চর্চা মানসিক চাপ কমায়, আবেগ প্রকাশে সাহায্য করে এবং বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখতেও কার্যকর।
সৃজনশীলতার আসল শক্তি কোথায়?
অনেকেই ভাবেন, একটি সুন্দর ছবি আঁকা বা নিখুঁত কোনো শিল্পকর্ম তৈরি করাই সৃজনশীলতার উদ্দেশ্য। আসলে লাভটি হয় কাজটি করার সময়।
যুক্তরাষ্ট্রের মেন্টাভি হেলথ-এর পরামর্শক ও মনোবিজ্ঞানী অ্যামি মার্শাল রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীলতার প্রকাশে মানসিক সুস্থতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই উপকারিতা আসে কোনো শিল্পকর্মের সৌন্দর্য থেকে নয়, বরং কিছু তৈরি করার অভিজ্ঞতা থেকে।”
অর্থাৎ, ছবি নিজের রেখে দেওয়া বা না দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, কিছু সময় নিজের অনুভূতির সঙ্গে কাটানো।
ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এমন অনুভূতিরও প্রকাশ
সব অনুভূতি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। দুঃখ, হতাশা, রাগ, একাকিত্ব কিংবা ভয়— অনেক সময় এগুলোর ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।
দাম্পত্য ও পারিবার বিষয়ক মার্কিন থেরাপিস্ট শ্যারন ইউ একই প্রতিবেদনে বলেন, “সৃজনশীল কাজ ভেতরের অনুভূতিগুলোর জন্য একটি নিরাপদ জায়গা তৈরি করে। যেসব আবেগ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না সেগুলো রং, নকশা, সুর কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টিশীল মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব হয়।”
তিনি উদাহরণ দেন, “ধরা যাক, কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই রং তুলিতে আঁকছেন। হয়ত ছবিটি নিখুঁত হবে না। তবে সেই রং, রেখা কিংবা আকৃতির মাধ্যমে নিজের কষ্ট ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। এতে মন কিছুটা হালকা হয়।”
মানসিক চাপ কমায়
ব্যস্ততা, কাজের চাপ এবং নানান দুশ্চিন্তায় অনেকেই সারাক্ষণ মানসিক চাপে থাকেন।
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, সৃজনশীল কোনো কাজে মন দিলে মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য উদ্বেগ থেকে দূরে সরে যায়। এতে শরীর ও মন দুটিই ধীরে ধীরে স্বস্তি অনুভব করে।
রান্না, গাছের পরিচর্যা বা রং করা- এই ধরনের কাজে মন পুরোপুরি ব্যস্ত থাকে। ফলে অপ্রয়োজনীয় চিন্তার প্রবণতা কমে আসে।
বর্তমান মুহূর্তে থাকতে শেখায়
মানুষ প্রায়ই অতীতের অনুশোচনা কিংবা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকে। তবে সৃজনশীল কাজ বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে।
তাই সৃজনশীল চর্চার উদ্দেশ্য সুন্দর দেখানো নয়, বরং বর্তমান মুহূর্তে সম্পূর্ণ মনোযোগী হওয়া। এই মনোযোগ ধীরে ধীরে মানসিক প্রশান্তি বাড়ায় এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।
নিখুঁত হওয়ার চাপ থেকে বেরিয়ে আসা
অনেকেই শুরুই করেন না, কারণ মনে হয় তাদের কাজ যথেষ্ট ভালো হবে না।
অ্যামি বলেন, “যারা নিজেদের অসৃজনশীল মনে করেন, তাদের উচিত শিক্ষার্থীর মানসিকতা নিয়ে শুরু করা।”
মানে শুরুতেই নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা না করে শেখার আনন্দ উপভোগ করতে হবে। ভুল হবে, আঁকিবুকি হবে, রান্নায় স্বাদ কম-বেশি হবে— এসবই শেখার অংশ।

অল্প থেকে শুরু করাই ভালো
বড় পরিকল্পনা অনেক সময় ভয় তৈরি করে।
শ্যারন ইউ পরামর্শ দেন, “এমন একটি কাজ বেছে নিতে হবে, যা করতে মাত্র দশ মিনিট সময় লাগে।”
প্রতিদিন অল্প সময় আঁকিআঁকি করা, কিছু লেখা কিংবা কয়েকটি ফুলের গাছে পানি দেওয়াও যথেষ্ট হতে পারে।
যদি কাজটি করতে ভালো লাগে, তাহলে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যায়।
শিশুদের মতো আনন্দ ফিরে পাওয়া
শৈশবে রং করা, কাগজ কাটা, মাটির খেলনা বানানো কিংবা ছবি আঁকার সহজ আনন্দগুলো আবার ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।
“রং করার বই দিয়ে শুরু করা যায়। যদিও ছবিটি আগে থেকেই আঁকা থাকে তবুও রং নির্বাচন, নকশা তৈরি এবং নিজের মতো করে সাজানোর মধ্যে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে”, বলেন শ্যারন ইউ।
নরম মাটি দিয়ে কিছু বানানোও ভালো উপায়। কারণ এটি শক্ত হয়ে যায় না, ফলে কোনো কাজ শেষ করার চাপও থাকে না।
লেখা হতে পারে মনের আয়না
ডায়েরি লেখা কিংবা খাতার এক কোণে নিজের মতো করে আঁকাআঁকি করাও কার্যকর। বানান বা ভাষা ঠিক হচ্ছে কি-না, সেটি নিয়ে চিন্তা না করে নিজের অনুভূতিগুলো লিখে ফেলা সহায়ক।
অনেক সময় লিখতে লিখতেই নিজের সম্পর্কে এমন কিছু উপলব্ধি তৈরি হয়, যা আগে কখনও বোঝা যায়নি।
গান ও নাচের শক্তি
নিজের ঘরে, রান্না করতে করতে কিংবা গাড়ি চালানোর সময় প্রিয় গান গাওয়াও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
শ্যারন ইউ বলেন, “একইভাবে নিজের মতো করে নাচলে শরীর নড়াচড়া করে, মন ভালো হয় এবং চাপ কমে।”
রান্না ও বাগান করাও সৃজনশীলতা
রান্না শুধুই প্রতিদিনের কাজ নয়। নতুন স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করা, খাবার সাজানো কিংবা নিজের মতো করে কোনো পদ তৈরি করাও সৃজনশীল কাজ। রান্নার শেষে সুস্বাদু খাবার পাওয়া অতিরিক্ত আনন্দ এনে দেয়।
অন্যদিকে বাগান করার সময় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা যায়। গাছের বৃদ্ধি দেখা, পরিচর্যা করা এবং ফুল ফোটার অপেক্ষা ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে।

নিজের জন্য সময় বের করা
“নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য প্রতিদিন মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট নিজের পছন্দের কোনো সৃজনশীল কাজে ব্যয় করলে ধীরে ধীরে মানসিক চাপ কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং নিজের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়”, মন্তব্য করেন অ্যামি।
সৃজনশীলতার কোনো পরীক্ষা নেই
সৃজনশীল কাজের সৌন্দর্য হল- এখানে নম্বর নেই, প্রতিযোগিতা নেই, ব্যর্থতার ভয়ও নেই।
ছবি আঁকা, রান্না করা, গাছ লাগানো, গান গাওয়া কিংবা ডায়েরি লেখা- প্রতিটি কাজই মনকে একটু একটু করে সুস্থ হতে সাহায্য করতে পারে।
আরও পড়ুন