Published : 18 Jun 2026, 04:13 PM
কথায় বলে— ‘কাঁদলে মন হালকা হয়’। ছোটবেলা থেকে মন খারাপ হলে কিংবা কোনো বড় ধাক্কা পেলে অনেকেই একা একা কেঁদে বুক হালকা করেন।
তবে আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল একটি আবেগীয় প্রকাশ মনে হলেও, গবেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে শরীরের এক অদ্ভুত বিজ্ঞান।
কান্না আসলে মানুষের দুর্বলতা নয়, বরং এটি শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার এক প্রাকৃতিক নিরাময় ব্যবস্থা বা ‘সেলফ-সুদিং মেকানিজম’।
চোখের পানি আসলে এক ধরনের বিষাক্ত উপাদান দূর করে
মানুষ যখন তীব্র আবেগের কারণে কাঁদে, তখন চোখ দিয়ে যে পানি পড়ে তাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল টিয়ার্স’ বা আবেগীয় অশ্রু; যা ধুলিকণা পড়লে চোখ থেকে বের হওয়া পানির চেয়ে একদম আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা ইউনিভার্সিটি-র নিউরোসায়েন্টিস্ট ও প্রাণরসায়নবিদ ডা. উইলিয়াম এইচ ফ্রে ও তার গবেষক দল ১৯৮১ সালে করা, একটি গবেষণায় এটি প্রমাণ করেছেন।
গবেষণাটি ‘আমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’-তে প্রকাশিত হয়েছিল।
ডা. ফ্রে পেঁয়াজ কাটার চোখের পানি এবং মন খারাপের অশ্রুর রাসায়নিক পরীক্ষা করে দেখান যে, আবেগজনিত অশ্রুতে উচ্চ মাত্রায় কর্টিসল ও প্রোল্যাক্টিনের মতো ‘স্ট্রেস হরমোন’ বা মানসিক চাপের হরমোন থাকে।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বুক ফেটে কান্না করার মাধ্যমে শরীর আসলে এই ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানগুলোকে অশ্রুরূপে বাইরে বের করে দিয়ে নিজেকে শান্ত করে।
মস্তিষ্কের ব্যথা কমানোর প্রাকৃতিক ইঞ্জেকশন
কান্না করার সময় শরীর এক ধরনের হরমোন নিঃসরণ করে, যা প্রাকৃতিকভাবে মনকে শান্ত করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’ এবং নেদারল্যান্ডসের টিলবার্গ ইউনিভার্সিটি-র এক যৌথ মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে কান্না করার ফলে মানুষের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
‘ফ্রেন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত হওয়া গবেষণার প্রতিবেদনে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, কান্না শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটোসিন এবং এন্ডোরফিনস নামক ‘ফিল-গুড’ বা ভালো বোধের হরমোন নিঃসৃত হতে শুরু করে।
এই হরমোনগুলো শরীরের ভেতরের তীব্র মানসিক ও শারীরিক ব্যথা কমাতে প্রাকৃতিক ‘পেইন কিলার’ বা ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে, মনকে দ্রুত হালকা করে তোলে।
সামাজিক বন্ধন ও সহানুভূতির সৃষ্টি
মানুষ একা কাঁদার চেয়ে অন্যের সামনে কাঁদলে মন বেশি হালকা অনুভব করে। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সামাজিক সংকেত’।
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের মারে স্টেট ইউনিভার্সিটি-র আচরণ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা, মানুষের এই কান্নার সামাজিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন।
মনস্তাত্ত্বিক সাময়িকী ‘ইভোলিউশনারি সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, “কান্না হল মানুষের ভাষার অতীত এক আদিম যোগাযোগ মাধ্যম।”
মানুষ যখন অন্যের সামনে কাঁদে, তখন তা অবচেতনভাবেই চারপাশের মানুষের মনে সহানুভূতি ও সাহায্যের ইচ্ছা বাড়িয়ে দেয়।
গবেষকেরা দেখিয়েছেন, যখন কোনো ব্যক্তি তার বিশ্বস্ত বন্ধু বা পরিবারের সামনে কাঁদেন এবং তারা তাকে সান্ত্বনা দেন বা জড়িয়ে ধরেন, তখন মানুষের মন সবচেয়ে দ্রুত হালকা হয়।
একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, ‘সোশ্যাল বাফারিং’।
'ক্যাথারসিস' বা মনের আবর্জনা পরিষ্কার
মনোবিজ্ঞানের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনের ভেতরের জমে থাকা কষ্টকে বাইরে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে বলতেন, ‘ক্যাথারসিস’ বা মানসিক রেচন।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি-র ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যারা সমাজ বা লোকলজ্জার ভয়ে মন খারাপের সময় কান্না চেপে রাখেন, তাদের অবচেতনে সেই কষ্টগুলো ‘ক্রনিক স্ট্রেস’ বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপে রূপ নেয়।
এটি পরবর্তী সময়ে তীব্র ‘অ্যাংজাইটি’ বা দুশ্চিন্তা, ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা বিষণ্নতার কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “কান্না চেপে রাখা মানে বিষাক্ত আবেগকে মনের ভেতর আটকে রাখা। তাই যখন মন চাইবে, তখন ঘরের কোণে বা বিশ্বস্ত কারও কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এতে মনের জমানো সব আবর্জনা পরিষ্কার হয়ে যায়।”
তাই চিকিৎসকেরা পরামর্শ হচ্ছে- কান্না করা কোনো লজ্জার বিষয় নয়, কিংবা এটি কোনো দুর্বলতার লক্ষণও নয়।
এটি প্রকৃতির দেওয়া এমন এক জাদুকরী হাতিয়ার, যা হৃদস্পন্দনকে স্বাভাবিক করে, রক্তচাপ কমায় এবং মনকে আবার নতুন করে বেঁচে ওঠার ইতিবাচক শক্তি দেয়।
তাই পরের বার মন খারাপ হলে, কান্না চেপে না রেখে চোখ থেকে পানি ঝরতে দিন। এতে মন হবে হালকা।
আরও পড়ুন