Published : 21 May 2026, 06:58 PM
কখনও কোনো কারণ ছাড়াই মন ভালো নেই। কখনও বা কারণ আছে, তবে কাউকে বলা যায় না।
আবার কখনও সারাদিন কাজের মধ্যে থেকেও মনে একটা শূন্যতা কাজ করে।
কেন এমন হয়?
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “মন খারাপ মানুষের জীবনের একটা স্বাভাবিক অংশ। সম্পর্কের ঝামেলা, কাজের চাপ, ব্যর্থতার বোঝা, একাকিত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা — কারণ থাকতে পারে অনেক। তবে সমস্যা হয় তখন-ই, যখন এই অনুভূতি চেপে ধরে রাখা হয়, কাউকে বলা হয় না, কোনো উপায় খোঁজা হয় না।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন মন খারাপ ভেতরে জমিয়ে রাখলে ধীরে ধীরে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। তাই সময় থাকতে নিজের অনুভূতির যত্ন নেওয়া জরুরি।”
শ্বাস নিন সচেতনভাবে
এটা পড়ে অনেকে ভাবতে পারেন, ‘শ্বাস নেওয়াতে কী আর এমন হবে।’ তবে বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস’য়ের তথ্যানুসারে- মন অস্থির হলে শ্বাস-প্রশ্বাস এমনিতেই দ্রুত হয়ে যায়। সেটাই উদ্বেগ বাড়ায়, শরীরকে সতর্ক অবস্থায় রাখে। এই চক্র ভাঙতে হলে সচেতনভাবে ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিয়ে, আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে। কয়েক মিনিট এই শ্বাসের ব্যায়াম করলেই পার্থক্য টের পাওয়া যায়।
ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “সচেতনভাবে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্বেগের মুহূর্তে এটি শরীরের 'ফাইট অর ফ্লাইট' প্রতিক্রিয়াকে শান্ত করে।”
ঘর ছেড়ে বের হওয়া, একটু হাঁটা
মন খারাপের সময় বেশিরভাগ মানুষ ঘরের কোণে গুটিয়ে থাকেন। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন, ফোন স্ক্রল করতে থাকেন। তবে এটা আসলে মন খারাপকে আরও গভীর করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘প্রোমোটিং মেন্টাল হেল্থ থ্রু সাইকেলিং অ্যান্ড ওয়াকিং’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট বাইরে হাঁটলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছায় এবং মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলছেন, “প্রকৃতির মাঝে হাঁটলে মানসিক চাপ কমে এবং মন সতেজ হয়। পার্কে যাওয়ার দরকার নেই। বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামুন, গলির মোড় পর্যন্ত হেঁটে আসু — এটুকুই যথেষ্ট শুরুর জন্য।”
কষ্টটা লিখে ফেলা
মনের ভেতরে যা ঘুরছে, সেটা বলতে না পারলেও লেখা যায়। ডায়েরিতে বা নোটবুকে নিজের কষ্ট, ভয়, হতাশার কথা লিখলে একটা অদ্ভুত হালকা লাগা আসে।
এই তত্ত্ব ও ধারণার জনক হলেন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় (অস্টিন)-এর মনস্তত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক ড. জেমস ডব্লিউ পেনেব্যাকার।
‘জার্নাল অফ অ্যাবনরমাল সাইকোলজি’তে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার গবেষণার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়, ‘নিজের অনুভূতি বা আবেগ লিখে প্রকাশ করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী’।
ডা. দিনা পরামর্শ দেন, “শুধু নেতিবাচক কথাই নয়, নিজের ভালো গুণগুলোও লিখুন। আজকে কোন কাজটা ঠিকমতো করেছেন, কে আপনাকে ভালোবাসে, কোন জিনিসটার জন্য কৃতজ্ঞ— এগুলো লিখলে নিজের ইতিবাচক দিকগুলো নতুনভাবে চোখে পড়ে।”
মন খারাপের সময় মনে হয় সবকিছুই নেতিবাচক। তবে লিখতে বসলে দেখা যাবে, ভালো জিনিসও কম নেই।
বর্তমানে থাকা, অতীত আর ভবিষ্যৎ সরিয়ে রাখা
ডা. দিনার ভাষায়, “মন খারাপের একটা বড় কারণ হল, আমরা হয় অতীতের অনুশোচনায় ডুবে থাকি, নয়তো ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায়। তবে এই মুহূর্তে যা আছে, সেটাতেই মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। যাকে বলা হয় ‘মাইন্ডফুলনেস’। আর এটা উদ্বেগ ও হতাশা কমাতে কার্যকর।”
উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টা একটু সহজ। এই মুহূর্তে চা খাচ্ছেন তো চায়ের উষ্ণতা অনুভব করুন। হাঁটছেন তো পায়ের নিচে মাটির স্পর্শ টের পান। এই ছোট্ট সচেতনতাগুলো মাথাকে অতীত বা ভবিষ্যৎ থেকে সরিয়ে বর্তমানে নিয়ে আসে।”
নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করা
মন খারাপের সময় অনেকে নিজেকেই সবচেয়ে বেশি দোষ দেন। ‘আমি কেন এমন করলাম’, 'আমার জন্যই সব হল’, 'আমি আসলে কিছুই পারি না' — এই ধরনের চিন্তা মনকে আরও ভেঙে দেয়।
ভুল মানুষের জীবনের অংশ। সবার জীবনেই ব্যর্থতা আসে, কঠিন সময় আসে। নিজেকে ক্ষমা করতে শিখতে হবে।
ডা. দিনা বলেন, “আত্মসহানুভূতি মানুষের মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং হতাশা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। অন্যের সঙ্গে যেভাবে সহানুভূতি দেখান, নিজের সঙ্গেও সেটুকু দেখান।”
একা থাকা যাবে না, কথা বলতে হবে
মন খারাপের সময় একা থাকার প্রবণতা স্বাভাবিক। তবে এটা সমাধান নয়। কাছের মানুষের সঙ্গে বন্ধু, পরিবারের যে কেউ— মনের কথাটা বলুন। শুধু বললেই অর্ধেক ভার নেমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটি’র মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. জুলিয়ান হোল্ট-লুনস্টাড, তার গবেষণাপত্র ‘সোশাল রিলেশনশিপস অ্যান্ড মর্টালিটি রিস্ক: এ মেটা-অ্যানালিটিক রিভিউ’তে উল্লেখ করেন যে- মন খারাপ বা বিষণ্নতার সময় একাকিত্ব মানুষের নেতিবাচক চিন্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর পরিবর্তে মানুষের সাথে যোগাযোগ করলে মস্তিষ্ককে দ্রুত সুস্থ করে তোলে।
‘পিএলওএস মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় তিনি দেখিয়েছন- মন খারাপ বা মানসিক কষ্টের সময় একা থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া স্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার মতোই ক্ষতিকর।
অন্যদিকে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও সামাজিক সমর্থনে বেঁচে থাকার মাধ্যমে মানসিক কষ্ট কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা পঞ্চাশ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।
“পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের কথাও মাথায় রাখতে হবে। শরীর ভালো না থাকলে মনও ভালো থাকে না”- পরামর্শ দেন ডা. দিনা।
তবে দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ ঠিক না হলে, কোনো কিছুতে আগ্রহ না থাকলে, ঘুম বা খাওয়াতে সমস্যা হলে, একজন মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত হবে।
কারণ, “দীর্ঘস্থায়ী হতাশা কখনও কখনও বিষণ্নতার লক্ষণও হতে পারে। সেটাকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়” মন্তব্য করেন এই মনোবিদ।
আরও পড়ুন