Published : 05 Jul 2026, 05:13 PM
ভোরের আলো ফোটার আগেই চাঁদপুরের মাছঘাটে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। বরফে মোড়ানো ঝুড়িতে একের পর এক ওঠে রুপালি ইলিশ। নিলামের ডাক, জেলেদের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের দর-কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এই ব্যস্ততার মধ্যেই হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে একের পর এক কল রিসিভ করছেন এক তরুণ। কখনও ঢাকা, কখনও চট্টগ্রাম, আবার দেশের অন্য প্রান্ত থেকেও আসছে ক্রেতাদের ফোন। সবার চাহিদা একটাই-চাঁদপুরের আসল ইলিশ।
চাঁদপুরের ইলিশ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া এই তরুণ উদ্যোক্তার নাম মো. ফাহিম খান। বয়সে তরুণ হলেও ব্যবসায়িক চিন্তায় তিনি অনেক দূর এগিয়ে।
শুরুর দিনগুলোর কথা স্বরণ করে ফাহিম বলছিলেন, “অনলাইনে মাছ বিক্রি করব শুনে অনেকেই হাসতেন। কেউ কেউ বলতেন, মাছ আবার অনলাইনে বিক্রি হয় নাকি!
“কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, যদি ভালো পণ্য আর সৎ সেবা দিতে পারি, তাহলে মানুষ একদিন বিশ্বাস করবে।”
সেই বিশ্বাসই ফাহিমকে অনেক দূর নিয়েছে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা তার অনলাইন ইলিশ ব্যবসা এখন বছরে প্রায় ১৮ লাখ টাকার আয়ের পথ তৈরি করেছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার বাবুরহাট এলাকার বাসিন্দা ফাহিম বর্তমানে ঢাকার স্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের ফাকেই সামলান ব্যবসার পুরো কার্যক্রম।
ফাহিমের বাবা মো. শাহজাহান খানও পেশায় মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন। মা রওশনআরা খানম গৃহিণী। পরিবার থেকে ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হলেও নিজের পথ তাকে নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে।
এত ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে দুটো দায়িত্ব একসঙ্গে সামলান এমন প্রশ্নের জবাবে ফাহিম বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, ইচ্ছাশক্তি থাকলে পড়াশোনা ও উদ্যোক্তা জীবন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।”
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় যখন অনেক তরুণ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন ফাহিম খুঁজছিলেন নতুন সম্ভাবনা। নিজের জেলার সবচেয়ে বড় পরিচয় ইলিশকে কেন্দ্র করেই শুরু করেন অনলাইন ব্যবসা।

প্রথমে পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে শুরু হয় যাত্রা। পরে তাদের মাধ্যমে যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন ক্রেতা। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠে তার নিয়মিত ক্রেতাদের একটি বড় নেটওয়ার্ক।
বর্তমানে শুধু চাঁদপুর নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার নিয়মিত ক্রেতা রয়েছেন। তিনি ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে ইলিশ বিক্রি করেন। অর্থাৎ ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করেন। এতে নতুন ক্রেতাদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হয়েছে।
ফাহিমের ক্রেতাদের তালিকায় অন্যতম রেজাউল করিম। এক সময় ঢাকা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চাঁদপুরে এসে ইলিশ কিনতেন তিনি। তবে ব্যস্ত জীবনে এখন আর ঘন ঘন আসা হয় না।
তবু চাঁদপুরের আসল ইলিশ খাওয়ার আগ্রহ কমেনি। তাই এখন তিনি অনলাইনের ওপরই ভরসা করছেন।
চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটে তরুণ উদ্যোক্তা মো. ফাহিম খানের মৎস্য আড়তের সামনে কথা হয় রেজাউল করিমের সঙ্গে।
তিনি বলছিলেন, “চাঁদপুরের আসল ইলিশ খেতে চাইলে আমি ফাহিমের মাধ্যমে অনলাইনে অর্ডার করি। বিশ্বস্ততা ও সুনামের কারণে এখন বেশির ভাগ সময় তার কাছ থেকেই ইলিশ কিনি।”
ফাহিম বলেন, “আমার কাছে লাভের চেয়ে বিশ্বাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন ক্রেতা সন্তুষ্ট হলে তিনি আরও কয়েকজন নতুন ক্রেতা নিয়ে আসেন। তাই আমি কখনো মানের সঙ্গে আপস করি না।”
বর্তমানে ফাহিম মাসে তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি করেন। মাস শেষে মুনাফা থাকে প্রায় এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বছরে তার আয় প্রায় ১৮ লাখ টাকা।
তবে সংখ্যার এই হিসাবের চেয়েও বড় বিষয় হলো, তিনি চাঁদপুরের ইলিশকে একটি বিশ্বস্ত অনলাইন ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
২৫ বছর বয়সী এ উদ্যোক্তার ভাষ্য, “চাঁদপুরের নাম শুনলেই যেমন মানুষের মনে ইলিশের কথা আসে। আমি চাই, মানুষ অনলাইনে ইলিশ কিনতে গেলেও প্রথমে চাঁদপুরের কথাই ভাবুক।
“আমাদের জেলার আসল ইলিশ দেশের প্রতিটি পরিবারের খাবার টেবিলে পৌঁছে দিতে চাই।”
তবে সাফল্যের এই যাত্রায় নানা বাধাও পেরোতে হয়েছে ফাহিমকে। অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার কারণে শুরুতে অনেক ক্রেতা তার ব্যবসার ওপর আস্থা রাখতে দ্বিধায় ছিলেন।
আবার সময়মতো মাছ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিরাপদে পৌঁছে দেওয়াও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু প্রতিটি সমস্যাকেই শেখার সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করার পরিকল্পনা করছেন ফাহিম।
তার স্বপ্ন, ঢাকায় একটি আধুনিক ‘ইলিশ এক্সপেরিয়েন্স সেন্টার’ গড়ে তোলা। সেখানে ক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের রান্না করা ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন। পছন্দ হলে সেখান থেকেই অর্ডার দেবেন।
ফাহিমের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল বারী জমাদার মানিক।
তিনি বলছিলেন, “অনলাইন ইলিশ ব্যবসা এখন সময়োপযোগী একটি ব্যবসা। বড়স্টেশন মাছঘাটে তরুণ উদ্যোক্তা ফাহিম সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “চাঁদপুরের ইলিশের নাম ব্যবহার করে ফেইসবুকে কিছু ভুয়া পেইজের মাধ্যমে প্রতারণা করা হচ্ছে। তাই অনলাইনে ইলিশ কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং যাচাই-বাছাই করে কেনাকাটা করতে হবে।”

একই ধরনের সতর্কতার কথা জানিয়েছেন চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “ডিজিটাল যুগে অনলাইনে ইলিশ কেনাবেচার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফাহিমের মতো অনেক তরুণ এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।
“তবে কিছু অসাধু চক্র ভুয়া ফেইসবুক পেইজ খুলে প্রতারণা করছে। তাই অনলাইনে ইলিশ কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সতর্ক থেকে যাচাই-বাছাই করে লেনদেন করা উচিত।”
তবে ফাহিমের স্বপ্ন শুধু ইলিশ বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী ইলিশকে ঘিরে নতুন এক অভিজ্ঞতার জগৎ গড়ে তুলতে চান তিনি।
ফাহিমের ভাষায়, “আমি শুধু মাছ বিক্রি করতে চাই না। মানুষ যেন ইলিশকে একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে উপভোগ করে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে চাই।”
তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ছোট পুঁজি কোনো বাধা নয়। প্রয়োজন সততা, ধৈর্য আর পরিশ্রম। শুরুটা ছোট হলেও স্বপ্নটা বড় হতে হবে।”