অলসতার চাদরে মানসিক ক্লান্তি
টিকটক ট্রেন্ড ‘বেড রটিং’-এর মনস্তাত্ত্বিক কুফল।
টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে তরুণ প্রজন্মের মাঝে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন লাইফস্টাইল ট্রেন্ড বা ধারার জন্ম হচ্ছে। এর মধ্যে বর্তমানে জেন-জি বা তরুণদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘বেড রটিং’, বা ‘বিছানায় পচন’ নামক এক অদ্ভুত অভ্যাস।
এর মূল কথা হল- ঘুমানোর উদ্দেশ্যে নয়, বরং শুধুই অলসভাবে সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে সিনেমা দেখা, খাবার খাওয়া কিংবা মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রোল করা।
আপাতদৃষ্টিতে কর্মক্ষেত্রের বা পড়াশোনার ক্লান্তি দূর করার জন্য একে এক ধরনের ‘সেলফ-কেয়ার’ বা আত্ম-রক্ষণাবেক্ষণ মনে হলেও, মনস্তত্ত্ববিদদের মতে এই দীর্ঘমেয়াদী নিষ্ক্রিয়তা অলক্ষ্যেই মানুষের মন ও শরীরের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করছে।
‘হেলথ ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বিছানাকে শুধুই অলস সময় কাটানোর প্রধান কেন্দ্র বানিয়ে ফেললে, মানুষের স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তোলে।
মস্তিস্কের বিভ্রান্তি ও তীব্র অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া
নিউইয়র্ক-প্রেসবাইটেরিয়ান হসপিটালের সাইকোলজিস্ট ডা. কোর্টনি ডিঅ্যাঞ্জেলিস বলেন, “ঘুমের প্রধান শর্ত হল— বিছানা ও শোবার ঘরকে শুধুমাত্র ঘুম এবং দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য নির্দিষ্ট রাখা। যখন একজন মানুষ দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে কাজ করেন বা ফোনে চ্যাট করেন, তখন মস্তিস্কের স্নায়ুগুলো তীব্র বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় শরীর আর বুঝতে পারে না যে এটি কি ‘ফাস্টিং’ বা আরাম করার সময়, নাকি ঘুমের সময়।”
এই মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির ফলে মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের চক্র বা ‘সারকাডিয়ান রিদম’ নষ্ট হয়ে তীব্র অনিদ্রা দেখা দেয়।
একাকিত্ব ও বিষণ্নতা
যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ইমিউনোলজি ও সাইক্রিয়াট্রি বিভাগের সহকারী ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক ডা. রায়ান সুলতান সতর্ক করে বলেন, “বেড রটিং যদি কোনো ব্যক্তির সাপ্তাহিক বা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে এটি গভীর মানসিক অবসাদ বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের পূর্বলক্ষণ।"
বিছানায় অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে বাইরের বাস্তব জগত, পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সামাজিক যোগাযোগ বা ‘সোশ্যাল ফিটনেস’ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক একাকিত্ব মানুষের মস্তিস্কের ক্ষমতা কমিয়ে অবসাদগ্রস্ততাকে আরও বেশি পুঞ্জীভূত করে তোলে।
কাজের স্তূপ ও পুঞ্জীভূত মানসিক চাপ
ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. নিকোল হেলিংসহেড ব্যাখ্যা করেন, “ব্যস্ত জীবনযাত্রা থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া ভালো। তবে একটানা দুই বা তিন দিন বিছানায় অলস পড়ে থাকলে প্রাত্যহিক জরুরি কাজগুলো জমে যেতে শুরু করে।”
তিনি আরও বলেন, “যখন একজন অলসতার চাদর থেকে বের হয়ে স্তূপাকৃতির কাজের মুখোমুখি হন, তখন তার শরীরে কোর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বৃদ্ধি পায়। এই পুঞ্জীভূত মানসিক চাপ শরীরকে আরও বেশি ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত করে তোলে।
সুরক্ষিত উপায়ে বিশ্রামের ৩টি নিয়ম
যদি শরীর ও মনকে চাঙা রাখতে সাময়িক বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, তবে চিকিৎসকেরা ৩টি নিরাপদ নির্দেশিকা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিছানা ছেড়ে সোফায় আরাম করা: বই পড়া, গান শোনা বা সিনেমা দেখার মতো কাজগুলোর জন্য বিছানা ব্যবহার না করে ড্রয়িং রুমের সোফা, ইজি চেয়ার বা বারান্দা ব্যবহার করা উচিত। এতে শোবার ঘরের সঙ্গে মস্তিস্কের ঘুমের ইতিবাচক উদ্দীপনাটি শতভাগ অক্ষুণ্ণ থাকে।
সময়সীমা নির্ধারণ: বেড রটিংকে কখনই একটানা ১ বা ২ দিনের বেশি দীর্ঘ করা যাবে না। বিশ্রামের জন্য সর্বোচ্চ কয়েক ঘণ্টা বা আধাবেলা নির্ধারণ করা ভালো। আর সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়া জরুরি।
ডিজিটাল ডিটক্স ও সৃজনশীলতা: বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফেইসবুক বা ইন্সটাগ্রাম দেখার পরিবর্তে মেডিটেইশন করা, ডায়েরি লেখা বা হালকা যোগব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তোলা মস্তিস্কের জন্য নিরাপদ। এটি রক্তনালীর অভ্যন্তরীণ প্রদাহ শান্ত রাখে।
আরও পড়ুন
