হৃদ্-যন্ত্র ভালো রাখতে গভীর বন্ধুত্ব
ভালো বন্ধুদের আড্ডা ও মানসিক সমর্থন হৃদ্-রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
শুধু আড্ডা, হাসি, গল্প বা বিপদে পাশে দাঁড়ানো নয়, জীবনের নানা চাপ সামলে উঠতে, মন ভালো রাখতে এবং সুস্থ অভ্যাসের জন্যও দরকার বন্ধু।
বন্ধুকে নিয়ে কিছুটা সময় কাটানো, মনের কথা ভাগ করে নেওয়া বা একসঙ্গে হাঁটতে বের হওয়া— এসব ছোট ছোট কাজ শরীরের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের সুস্থতার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায়।
যুক্তরাজ্যের চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘হার্ট’-এ ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়।
২৩টি গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্বল সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩২ শতাংশ বেশি হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
বন্ধুর সঙ্গে কথা বললে চাপ সামলানো সহজ হয়
মানসিক চাপ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং শরীরে প্রদাহের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত হতাশা নিয়ে যখন কেউ একা একা ভাবতে থাকেন, তখন মানসিক অস্থিরতা আরও বাড়ে। এমন সময়ে বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাবিষয়ক তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘ইবিএসসিও ক্লিনিক্যাল ডিসিশনস’-এর ‘ডাইনামেড’ বিভাগের প্রধান সম্পাদক এবং হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ রয় জিগেলস্টাইন এ বিষয়ে রিয়েল-সিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “চাপের পরিস্থিতিতে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে লড়াই করা বা পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি তৈরি হয়। এ সময় হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়তে পারে। বারবার এমন প্রতিক্রিয়া ঘটলে এবং যথাযথভাবে সামলানো না গেলে শরীরে প্রদাহ ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।”
জিগেলস্টাইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “অর্থপূর্ণ বন্ধুত্ব মানসিক চাপকে পুরোপুরি দূর করে দেয় না। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সহায়তায় মানুষ চাপের পরিস্থিতিতে তুলনামূলক ভালোভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন। ফলে রক্তচাপ ও প্রদাহের মতো শারীরিক প্রতিক্রিয়া সামলানো সহজ হয়।”
তাই মন খারাপ হলে বা কোনও সমস্যায় দিশেহারা লাগলে বিশ্বস্ত বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা কেবল মানসিক প্রশান্তির বিষয় নয়, সুস্থ জীবনযাপনেরও অংশ।
সুস্থ অভ্যাসের জন্য ভালো বন্ধু
যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ‘ফ্রেমিংহাম হার্ট স্টাডি’ নামের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়, কয়েক প্রজন্মের হাজারও মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বন্ধুত্ব সামাজিক সম্পর্ক ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্তসহ কিছু স্বাস্থ্যসংক্রান্ত আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
জিগেলস্টাইনের মতে, “স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুসরণ করেন এমন ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলে অন্যরাও ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে এবং ধরে রাখতে উৎসাহ পেতে পারেন।”
অসুস্থতার লক্ষণ অবহেলা করতে দেন না
হৃদরোগের কিছু লক্ষণ প্রথমে খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে। বুকে অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা অন্য কোনও নতুন উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেই কাজের ব্যস্ততায় সেটা উপেক্ষা করেন।
জিগেলস্টাইনের মতে, “অর্থপূর্ণ সম্পর্ক, ব্যক্তিকে হৃদরোগের উদ্বেগজনক লক্ষণ উপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করতে পারে। বন্ধুর দায়িত্ব অবশ্য রোগ নির্ণয় করা নয়; বরং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাশে থাকা।”
একাকী মনও হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে
একাকিত্ব শুধু মন খারাপের কারণ নয়, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে।
উদ্বেগ ও বিষণ্নতা হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মাউন্ট সিনাইয়ের চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক ও নিউক্লিয়ার কার্ডিওলজি বিভাগের পরিচালক অ্যালান রোজানস্কি একাকিত্বের প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
তার কথায়, “হৃদরোগের ঝুঁকির ক্ষেত্রে একাকিত্বের প্রভাব ধূমপান বা স্থূলতার মতো পরিচিত ঝুঁকির সঙ্গে তুলনীয় মাত্রার হতে পারে।”
অর্থাৎ, সামাজিক সম্পর্ককে অবহেলা করার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্যেরও যোগ রয়েছে।
ডা. রোজানস্কি ক্ষণস্থায়ী ডিজিটাল বার্তার মোহ পরিহার করে, বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করা বা দীর্ঘ আন্তরিক ফোনালাপের মাধ্যমে গভীর সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
