Published : 06 Sep 2025, 08:21 AM
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জাকসু নির্বাচনে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুলিংয়ের শিকার হওয়া নিয়ে আলোচনা ছাপিয়ে তাদের ইশতেহার দৃষ্টি কাড়ছে ভোটারদের।
নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস, ভবিষ্যৎ জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নানা উদ্যোগের প্রতিশ্রুতিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ‘বাস্তবসম্মত’ বলে মনে করেছেন। তবে প্রতিশ্রুতির কতটা ‘বাস্তবায়ন’ হবে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন ভোটাররা।

নারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বিভাগ ও চত্বরে মানসম্মত ওয়াশরুম, সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কাউন্সেলিং সেন্টার, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্ল্যাটফর্ম, ডে কেয়ার সেন্টার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের যে প্রতিশ্রুতি প্রার্থীরা দিচ্ছেন, এই সময়ে এসে সেগুলো আর কোনো অবাস্তব বিষয় নয়। বরং একটি আধুনিক ক্যাম্পাসে নারীদের জন্য এই সুবিধাগুলো থাকবে- এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু নেই।
তফসিল অনুযায়ী, এক সপ্তাহ পরেই ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার অদূরে সাভারের এই ক্যাম্পাসে ভোটগ্রহণ হবে। ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্র ছবিচত্বরের আড্ডা থেকে শুরু করে হলের ডাইনিং টেবিল, লাইব্রেরির করিডর কিংবা হলের বারান্দা- সর্বত্র এখন জাকসু নির্বাচনের উত্তাপ। প্রার্থীর পক্ষে প্রচার আর স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছে এই শিক্ষাঙ্গন।
জাকসুর এবারের নির্বাচনে ১৭৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিভিন্ন পদে।
অপরদিকে ১০টি নারী হলের ১৫০ পদের মধ্যে মাত্র ৩৪টিতে ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়বে। ৫৮টি পদের বিপরীতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রার্থীরা বিনাভোটে বিজয়ী হতে চলেছেন। আর ৫৮টি পদে কোনো প্রার্থী নেই।
শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ পদ সহসভাপতি (ভিপি) পদে নেই কোনো নারী প্রার্থী।
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে রয়েছেন দুইজন নারী। এ পদে আইন ও বিচার বিভাগের সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন; আর সরকার ও রাজনীতি বিভাগের তানজিলা হোসাইন বৈশাখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের হয়ে।
শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, নির্বাচনে নারী প্রার্থী তুলনামূলক কম হলেও তাদের অংশগ্রহণ নির্বাচনি প্রতিযোগিতাকে আরও প্রাণবন্ত করেছে।

জাকসুতে লড়ছেন যে নারীরা
জাকসুর শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আইবিএ এর ফারহানা বিনতে জিগার ফারিনা ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের সৈয়দা মেহের আফরোজ। সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে চারুকলা বিভাগের সাদিয়া রহমান মোহনা, সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মায়মুনা বিনতে সাইফুল ও মার্কেটিং বিভাগের ফাতেমা-তুজ-জোহরা আর নাট্য সম্পাদক পদে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ইগিমি চাকমা লড়ছেন।
পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সোমা ডুমরী, আর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক পদে আছেন প্রাণরসায়ন বিভাগের লাবিবা মুবাশশিরা।
নারীদের সংরক্ষিত আসনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমজমাট। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন দর্শনের আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা, সিএসইর আঞ্জুমান আরা ইকরা, ইংরেজির লামিয়া রহমান তৈশী, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ফারিয়া জামান, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের মালিহা নামলাহ্ এবং নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সোহাগী সামিয়া জান্নাতুল ফেরদৌস।
ক্রীড়া সম্পাদক পদেও চোখে পড়ছে নারীদের প্রার্থীদের ভিড়। পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সৈয়দা আলভী খোরশেদ থেকে শুরু করে ইংরেজির সিফাত আরা রুমকি, নাটক ও নাট্যতত্ত্বের শাহানাজ পারভীন শানু, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাবিকুন্নাহার, গণিতের ফারহানা আক্তার লুবনা এবং নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রত্যাশা ত্রিপুরা লড়ছে এ পদে।
সহসমাজসেবা সম্পাদক পদেও আছেন ফার্মেসির নিগার সুলতানা, অর্থনীতির কাজী মৌসুমি আফরোজ, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজের নাদিয়া রহমান, নৃবিজ্ঞান বিভাগের মায়িশা মনি, দর্শনের তাজনীন নাহার তাম্মি, চারুকলার জান্নাতুল ফিরদাউস আনজুম ও সাদিয়া ইমরোজ ইলা।

কার্যকরী সদস্য পদেও রয়েছেন একঝাঁক তরুণ মুখ- দর্শনের হ্যাপি আক্তার শিলা, ইতিহাসের শেখ নাবিলা বিনতে হারুন, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ের ফাবলিহা জাহান নাজিয়া, প্রাণরসায়নের আরিফা জান্নাত মুক্তা, আইন ও বিচারের নুসরাত জাহান ইমা, নাটক ও নাট্যতত্ত্বের শায়লা সাবরীন নিঝুম, চারুকলার সুমাইয়া সুলতানা ও রোকেয়া আমীন অনুসূয়া, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জান্নাতুল মাওয়া শ্যামন্ত্রী ও অহনা শাহরীন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের আনিকা তাবাসসুম ও তানজিলা তাসনিম, বাংলা বিভাগের ইফফাদ জাহান বিথী, অর্থনীতির আফিয়া ইবনাত, পরিসংখ্যান বিভাগের পৃষতী খান।
‘সমস্যার অভিজ্ঞতা থেকেই সমাধানের প্রতিশ্রুতি’
‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ প্যানেলের সহসমাজসেবা সম্পাদক পদে লড়ছেন নাদিয়া রহমান অন্বেষা। তিনি ক্যাম্পাসে চলতে গিয়ে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন সেগুলোকে প্রাধান্য দিয়েই নিজের ইশতেহার তৈরি করেছেন।
তিনি তার পরিকল্পনায় রেখেছেন প্রতিটি অনুষদে কমনরুম ও নামাজকক্ষ, মানসম্মত ওয়াশরুম, সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কাউন্সেলিং সেন্টার এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্ল্যাটফর্ম।
নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে অন্বেষা বলছিলেন, “আমার ইশতেহারটি আমি সাজিয়েছি, সেসব সমস্যাকে মাথায় রেখে যেগুলো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকে একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে মোকাবেলা করছি। এক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন চলাফেরা এবং তাদের জন্য একটি সুষ্ঠু নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করাকে প্রাধান্য দিয়েছি। একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে আমি উপলব্ধি করেছি আর্থিক স্বনির্ভরতার গুরুত্ব।
“ক্যাম্পাসে, বিশেষ করে বটতলায়, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ওয়াশরুমের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া শিক্ষার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নারী শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে ভাষাশিক্ষার মান উন্নত ও সহজলভ্য করা প্রয়োজন। কারণ, কোনো শিক্ষার্থী দেশের বাইরে যেতে চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি বহু ভাষায় দক্ষতা থাকলে দেশের চাকরির বাজারেও একজন প্রার্থী ভাল করতে পারেন। এখন একজন শিক্ষার্থীকে এটা বাইরে গিয়ে নিজের টাকায় করতে হয়। অনেকে পারেন না। ফলে আমি এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভর্তুকি বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করতে চাই।

“নারী শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বা নেতৃত্ব প্রদানের সময় যে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন, তাদের জন্য টিএসসিতে বিশেষ কাউন্সেলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা রাখি এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চাই। অনেকে অনলাইন ব্যবসা করেন। পারিবারিক অবস্থার কারণে অনেকে নানা উপার্জনের সঙ্গে জড়িত। তারা যাতে পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারেন সেটার সূচনা করতে চাই।”
‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ প্যানেলের এই প্রার্থী বলেন, “এক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পেইজে টিউশন দেওয়ার কথা বলে নারীদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়। আমি ক্যাম্পাসে প্রথম একবছর কোনো টিউশন পাইনি। তাই নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির তাগিদ অনুভব করে এই সংক্রান্ত একটি ইশতেহার তৈরি করেছি। নারীদের আরও বেশি দক্ষ এবং তাদের মানসিক সুস্থতা; একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে যথাযথ নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিই আমার মূল লক্ষ্য।”
তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য হল, নারী শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ ও নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করা।”
‘শিক্ষার্থী মাকে নিশ্চিন্তে ক্লাস করার সুযোগ দিতে চাই’
জাকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবির নিজেদের নামে নির্বাচন করছে না। তারা ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল দিয়েছে। এই প্যানেল থেকে সংরক্ষিত এজিএস পদে লড়ছেন দর্শন বিভাগের আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা।
তার ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণমূলক পরিকল্পনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডে কেয়ার সেন্টার চালু, প্রতিটি অনুষদে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, খাবারের মানোন্নয়ন এবং ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
নিজের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করে মেঘলা বলছিলেন, “অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা মা। এটাকে ভিন্ন চোখে দেখার কোনো কারণ নেই। তাদের জন্য বাচ্চা নিয়ে ক্লাসে আসা কিংবা ছোট বাচ্চাকে বাসায় রেখে আসা কোনোটাই স্বস্তিদায়ক নয়। আমরা যদি তাদের জন্য একটি ডে কেয়ার সেন্টার চালু করি, তাহলে নারী শিক্ষার্থীরা তাদের বাচ্চাকে রেখে নিশ্চিন্তে ক্লাস ও পরীক্ষায় বসতে পারবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থী মায়ের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করতে চাই। এতে তাদের সন্তান সুস্থ ও নিরাপদ থাকবে। শিক্ষার্থী মায়ের সংখ্যা কম হলেও এটা সময়ের চাহিদা। আমরা সবার জন্য একটা ক্যাম্পাস চাই।”
“এ ছাড়া অন্তত প্রতিটি অনুষদে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনের ব্যবস্থা করতে চাই, যেন নারী শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন।”

তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আসে পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য। কিন্তু আমাদের গবেষণা খাতে বরাদ্দ কম এবং গবেষণার কিছু সামগ্রী টাকা দিয়ে কিনতে হয়। সেগুলো যেন বিনামূল্যে পাওয়া যায় সে বিষয়ে কাজ করতে চাই।”
মেঘলা বলেন, “বিগত দিনে আমরা দেখেছি, কিছু হলে চুরির ঘটনা ঘটছে। মেয়েরা হেনস্তার শিকার হচ্ছে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী নারী, সেক্ষেত্রে নারীদের জন্য ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করে তুলতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করব।”
তিনি যোগ করেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মন্দির রয়েছে। সেখানে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটে, এমনকি প্রতিমাও চুরি হয়ে যায়। আমরা চাই, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য একজন প্রহরী নিয়োগ এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় উপাসনার অধিকার নিশ্চিত করতে।”
‘সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের’ দাবি কেন?
অনেকগুলো রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে তৈরি হয়েছে ‘সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেল’। সেই প্যানেল থেকে পরিবেশ সম্পাদক পদে লড়ছেন সোমা ডুমরী। তিনি ছাত্রমৈত্রীর সংগঠক। তিনি তার প্রতিশ্রুতিতে রেখেছেন ‘পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের’ অধীনে ক্যাম্পাসের উন্নয়নের ধারণাকে; যেটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই লড়ছেন ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া আসলে কোনো ধরনের নির্মাণকাজই করা উচিত নয়। আপনারা হয়তো জানেন অথবা জানেন না, আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মাস্টারপ্ল্যান ছিল, সেটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের ক্যাম্পাসের একটি সহাবস্থান তৈরি হয় এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যের বৈচিত্র্যে ভরপুর একটি ক্যাম্পাস গড়ে ওঠে।
“কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, ক্যাম্পাসের প্রয়োজন কিংবা কৃত্রিম প্রয়োজনে এই মাস্টারপ্ল্যান উপেক্ষা করা হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে আমাদের ক্যাম্পাসের প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে সৌন্দর্য ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

তিনি বলেন, “আগে আমরা দেখতাম, বন্যপ্রাণীরা আমাদের সঙ্গে একই পথে চলাফেরা করলেও কখনো আক্রমণ করত না। অথচ সম্প্রতি শিয়ালের আক্রমণের কয়েকটি ঘটনা শোনা যাচ্ছে। অতিথি পাখির জন্য যে কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিল, সেই পাখিরাও আজ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। লেকগুলোও ভরাট হওয়ার পথে।”
এই প্রার্থী বলেন, “তাই আমাদের ফ্যাকাল্টি ও বিভাগগুলোর ক্লাসরুম সংকট নিরসন এবং প্রকৃতির বৈচিত্র্যের সঙ্গে সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য একটি ‘সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান’ জরুরি। যাতে করে আমাদের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় সবুজ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং এখানে বসবাসকারী সকল মানুষ ও জীব-জন্তু, ঢাকার মতো ব্যস্ত, দূষিত, গাছপালাহীন ও উত্তপ্ত নগরের ভোগান্তিতে পড়তে না হয়।”
আরও যত প্রতিশ্রুতি
অন্যদিকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদপ্রার্থী সাদিয়া রহমান মোহনা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য স্থায়ী জায়গা ও বাজেট নিশ্চিত করা, ‘জাবি কালচারাল কাউন্সিল’ গঠন, নিয়মিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন, দেয়ালিকা ও ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ, মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নতুন লেকচার ভবনে একটি কালচারাল ল্যাব প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
প্রায় ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন হচ্ছে, জীবনে প্রথমবারের মত ভোট দিতে পারবেন, এটি ভেবেই সত্যিই অনেক উত্তেজনা বোধ করছেন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী আরশি চাকমা। তার প্রত্যাশা, “ক্যাম্পাসের সুস্থ পরিবেশ যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। নোংরা রাজনীতি ফিরে আসুক, এটা চাই না। সেটা ভিপি, জিএস বা অন্য যে কোনো পদেই হোক।”
তিনি বলেন, “আমাদের কিছু অভিযোগ ও দাবি আছে। যেমন- মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে প্রশাসনকে চাপ দেওয়া, পরীক্ষায় পুনর্মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু, মেডিকেল ও পরিবহন সুবিধা সহজ করা। ক্যাম্পাস যেমন এখন নারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ, ভবিষ্যতেও যেন সেই পরিবেশ বজায় থাকে, সেটাই প্রত্যাশা।”

“‘প্রয়োজন’ কোনো ‘অলীক’ বিষয় না, এটা বাস্তব”
নারীদের কথা ভেবে প্রার্থীরা যে আলাদাভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছেন, তাতে বেশ খুশি আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী মেহজাবিন হৃদি। তিনি মনে করেন, প্রার্থীদের দেওয়া ইশতেহার বাস্তবায়নযোগ্য।
মেহজাবিন হৃদি বলছিলেন, “জাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন পদে নারী প্রার্থীর ইশতেহারে নারীবান্ধব যেসব ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি উঠে আসছে, সেসব ব্যবস্থা আসলে কম-বেশি প্রয়োজনীয়। ‘প্রয়োজন’ কোনো ‘অলীক’ বিষয় না, এটা বাস্তব। তাই, প্রয়োজন পূরণ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন ক্ষেত্রবিশেষে দুঃসাধ্য হলেও, অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য এবং এগুলোর বাস্তবায়ন অবশ্যই করতে হবে বলে আমি মনে করি।”
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী আরশি চাকমার মতে, “জাকসু মানে শুধু রাজনীতি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যার সমাধানের জায়গা। হল, লাইব্রেরি, পড়াশোনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নিরাপদ ক্যাম্পাস- এসব যেন অগ্রাধিকার পায়। তবে খারাপ লাগে যে ভিপি পদে কোনো নারী নেই।
“অনেকে ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের নিষেধে দাঁড়ায়নি। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের চরিত্র নিয়ে হেনস্তা করার সংস্কৃতিও অনেককে নিরুৎসাহ করেছে। কিন্তু এসব বাধা কাটিয়ে নেতৃত্বের বড় জায়গাগুলোতেও নারী প্রার্থীরা আসুক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল হাকিম বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষ ও নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সমান। প্রায় সমান সংখ্যক নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থী থাকার কারণে এই ক্যাম্পাসে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সুবিধা-অসুবিধাগুলো সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।”
তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে আমরা ক্যাম্পাসে সুযোগ-সুবিধার ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন দেখতে পাই না; নারীরা বঞ্চিত হয় অনেক সুবিধা থেকে। যেগুলো সম্পর্কে বেশিরভাগ প্রার্থীর ইশতেহারে উঠে এসেছে। নারী প্রার্থীদের ইশতেহার পড়ে মোটামুটি সন্তোষজনক মনে হয়েছে। এগুলো নিয়ে কাজ করতে পারলে বিদ্যমান বৈষম্য অনেকাংশেই দূর হবে বলে মনে হয়।”

হাকিমের ভাষ্য, “নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিযোগিতা কতটা সুষম হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে, ইশতেহার বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব হবে, তাতে একটা সংশয় থেকেই যায়।”
নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট আটবার জাকসু নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯২ সালে।
গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে তিন দশক পরে জাকসু নির্বাচন আয়োজনে রোডম্যাপ ঘোষণার উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার সংখ্যা হল ১১ হাজার ৯১৯ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ৬ হাজার ১০২ জন এবং ছাত্রী ভোটার ৫ হাজার ৮১৭ জন।
১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। একইদিনে সন্ধ্যা ৭টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুন:
জাকসু: বৃষ্টিস্নাত ক্যাম্পাসে ভোটের প্রচার শুরু
জাকসুতে ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রফ্রন্টের 'সংশপ্তক পর্যদ'
জাকসু: নারী হলে দেড়শ পদের মধ্যে মাত্র ৩৪টিতে ভোট
জাকসু ভোটে সেনা চেয়ে চিঠি, নিরাপত্তা ঘাটতি আসলে কতটা?
জাকসু নির্বাচনে ছাত্রীরা 'কোণঠাসা', কেমন হবে ভোট?
জাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মত প্রার্থী নেপালি শিক্ষার্থী
জাকসুতে জিতু-শাকিলের নেতৃত্বে 'স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন' প্যানেল
জাকসুতে অমর্ত্য-শরণের নেতৃত্বে লড়বে 'সম্প্রীতির ঐক্য'
জাকসুর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা, ২৫ পদে ১৭৯ জনের লড়াই
জাকসুতে ছাত্রশিবির ও বাগছাসের প্যানেলে যারা লড়ছেন
জাকসু নির্বাচন: 'শিক্ষার্থীবিরোধী পদক্ষেপের' নিন্দা ছাত্র ইউনিয়নের
জাকসুতে ছাত্রদল লড়বে সাদী-বৈশাখীর নেতৃত্বে
জাকসু ভোট: সেনা মোতায়েন চেয়ে নির্বাচন কমিশনের চিঠি
জাকসু: দুই দিনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৩২৮ জন
জাকসুর ২৫ পদের বিপরীতে মনোনয়ন সংগ্রহ ২৯৯টি