Published : 30 Aug 2025, 09:00 PM
৩৩ বছর পর বৃষ্টিস্নাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ভোটের প্রচার শুরু হল।
শনিবার ছুটির দিন থাকায় এমনিতেই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম ছিল। তার মধ্যেই ঘুরে ঘুরে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছেন প্রার্থীরা।
শুক্রবার বিকালে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। তালিকা অনুযায়ী, জাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫ পদের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন ১৭৯ জন।
অপরদিকে ১০টি নারী হলের দেড়শ পদের মধ্যে মাত্র ৩৪টিতে ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়বে। ৫৮টি পদের বিপরীতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রার্থিরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হতে চলেছেন। আর ৫৮টি পদে কোনো প্রার্থী নেই, সেগুলো ফাঁকা আছে।
আর ছেলেদের ১১টি হলে ১৬৫টি পদের বিপরীতে লড়ছেন ৩১৬ জন। এর মধ্যে ৬১টি পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, ফলে তারা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। আর বিভিন্ন হলে সাতটি পদের কেউ প্রার্থী হননি। ফলে সেগুলো ফাঁকা রয়ে গেছে। ফলে ছেলেদের হলের ৯৭ পদে ভোট হবে।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগেই কয়েকটি সংগঠন তাদের প্যানেল ঘোষণা করেছিল। যারা বাকি ছিল তারাও শুক্রবার ও শনিবার প্যানেলের ঘোষণা দিয়েছেন। তফসিল অনুযায়ী, শনিবার সকালে থেকেই প্রার্থীদের প্রচার শুরু কথা।
এর মধ্যে বৃষ্টি উপেক্ষা করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেছে ছাত্রদল। দুপুর আড়াইটার দিকে বটতলা এলাকায় প্রচার করতে দেখা যায়, ছাত্রদলের প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মো. শেখ সাদী হাসান, জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখীসহ অন্যদের।
প্যানেলের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর ও সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক।
এ ছাড়া জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক পদপ্রার্থী তাওহিদুর রহমান খান, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক লিখন চন্দ্র রায়, তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক মো. জাবের হাসান, ক্রীড়া সম্পাদক উজ্জ্বল হাসান এবং কার্যকরী সদস্য পদপ্রার্থী হামিদুল্লাহ সালমান ও এ এম রাফিদুল্লাহসহ কয়েকজন প্রচার চালান।
ছাত্রদলের ভিপি পদপ্রার্থী শেখ সাদী হাসান বলেন, “আজ থেকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেছি এবং অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি। শিক্ষার্থীরা আমাদের পাশে আছে, আমরা আশাবাদী জয়ী হবো।”
শেখ সাদী হাসান আরও বলেন, “আমাদের ক্যাম্পাস বড় হওয়ায় সব শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে আমরা গ্রুপ করে প্রচার চালাবো।”
প্রচার করতে দেখা যায় কেন্দ্রীয় সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক পদপ্রার্থী মাহমুদুল হাসান কিরণকে।
তিনি বলেন, “আগামী ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় ফুটসাল দলের হয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার ফ্লাইট রয়েছে। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী, তাই সময় সীমিত। এজন্য প্রতিকূল আবহাওয়াতেও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক সাড়া আমাকে অনুপ্রাণিত করছে।”

নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে ইনফরমেশন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও জাকসুর ভোটার মাহবুবুল হাসানের মারুফ বলেন, “৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন হলেও, শিক্ষার্থীদের মাঝে জাকসু নিয়ে আশানুরূপ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। প্রশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারছে না, ভোট দেওয়ার জন্য আইডি কার্ড নবায়ন ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীদের মাঝে আগ্রহ কম। প্রশাসন এই সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করলে হয়তো শিক্ষার্থীদের মাঝে আগ্রহ বাড়বে।
“ডাকসু যেমন মিডিয়া কাভারেজ পাচ্ছে, জাকসু নিয়ে তত আলোচনা হচ্ছে না। শিক্ষার্থী হিসেবে চাই, যারাই নির্বাচনে জয়ী হবেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করবেন। ক্যাম্পাসে গণরুম, গেস্টরুম কালচার যেন আর ফিরে না আসে, সেজন্য ভূমিকা রাখবেন।”
আরেক শিক্ষার্থী আজিজুল হাকিম জয় মনে করেন, “জাকসু তার আমেজ হারিয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, সময়ের আগেই কিছু প্রার্থীকে প্রচার করতে দেখা গেছে, যেটা এখন আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, প্রার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী—যারা ভোটার—তারা কিছুটা আগ্রহ হারিয়েছেন। প্রার্থীরা প্রচার মাধ্যম হিসেবে ফেইসবুকে বেশি জোর দিচ্ছেন, যার ফলে সরাসরি প্রচার কম দেখা যাচ্ছে। এটাও এক কারণ আমেজ না আসার।
“একই সঙ্গে অনেক বিভাগের সামনে ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ কম পাচ্ছেন। সর্বোপরি প্রার্থীদের সরাসরি প্রচারের অভাব, প্রশাসন কর্তৃক সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা এবং ভোটারদের কম উৎসাহের কারণে জাকসুর আমেজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আশা করা যায়, আরও কিছুদিন পর থেকে এটি বাড়বে।”

নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য
সর্বশেষ জাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯২ সালে। গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে প্রায় ৩৩ বছর পরে জাকসু নির্বাচন আয়োজনে রোডম্যাপ ঘোষণার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অন্তত দুইবার পিছিয়ে আসে। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রোডম্যাপ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১০ জানুয়ারি একটি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করলেও নানা ঘটনার পর ৩০ এপ্রিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩১ জুলাই। পরে কয়েক দফা পেছানোর পর নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয় আগামী ১১ সেপ্টেম্বর।
সেই তফসিল অনুযায়ী, ১৮, ১৯ ও ২১ অগাস্ট প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হয় ২১ থেকে ২৪ আগস্ট এবং খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয় ২৫ অগাস্ট।
এ ছাড়া, মনোনয়নপত্রের বৈধতার বিষয়ে এবং বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন গ্রহণ করা হয় ২৬ অগাস্ট (মঙ্গলবার)। আপিলের শুনানি হয় ২৭ অগাস্ট (বুধবার)।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ২৮ অগাস্ট। আর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৯ অগাস্ট। ৩০ অগাস্ট সকাল থেকে প্রার্থিরা প্রচার শুরু করেন।
আর ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। একইদিনে সন্ধ্যা ৭টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুন:
জাকসুতে ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রফ্রন্টের 'সংশপ্তক পর্যদ'
জাকসু: নারী হলে দেড়শ পদের মধ্যে মাত্র ৩৪টিতে ভোট
জাকসু ভোটে সেনা চেয়ে চিঠি, নিরাপত্তা ঘাটতি আসলে কতটা?
জাকসু নির্বাচনে ছাত্রীরা 'কোণঠাসা', কেমন হবে ভোট?
জাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মত প্রার্থী নেপালি শিক্ষার্থী
জাকসুতে জিতু-শাকিলের নেতৃত্বে 'স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন' প্যানেল
জাকসুতে অমর্ত্য-শরণের নেতৃত্বে লড়বে 'সম্প্রীতির ঐক্য'
জাকসুর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা, ২৫ পদে ১৭৯ জনের লড়াই
জাকসুতে ছাত্রশিবির ও বাগছাসের প্যানেলে যারা লড়ছেন
জাকসু নির্বাচন: 'শিক্ষার্থীবিরোধী পদক্ষেপের' নিন্দা ছাত্র ইউনিয়নের
জাকসুতে ছাত্রদল লড়বে সাদী-বৈশাখীর নেতৃত্বে
জাকসু ভোট: সেনা মোতায়েন চেয়ে নির্বাচন কমিশনের চিঠি
জাকসু: দুই দিনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৩২৮ জন