Published : 10 Jun 2026, 02:44 PM
বাংলাদেশের দুটি মূলধারার জাতীয় পত্রিকায় একটি খবর পাঠকদের চমকে দিয়েছিল। দুটি পত্রিকার খবরেই বলা হয় যে, উচ্চশিক্ষা তথা অনার্স কোর্স থেকে বাংলা সাহিত্য, দর্শন ও ইতিহাসের মতো মৌলিক ও মানবিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে দেওয়া হবে। তার বদলে তথাকথিত ‘দক্ষ শিক্ষার্থী’ তৈরির লক্ষ্যে কিছু আধুনিক ও প্রায়োগিক বিষয় যেমন—আইটি, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা সায়েন্স ইত্যাদি যোগ করা হবে। যদিও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক দ্রুততার সঙ্গে এই খবরটিকে সম্পূর্ণ গুজব, অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে নীতিগত পর্যায়ে এমন কোনো ব্যবস্থার আলোচনাও হয়নি; তবুও এই একটি ঘটনাই আমাদের সমাজমানসের একটি দীর্ঘদিনের গভীর ক্ষত এবং যুগপৎ এক সংকীর্ণ মনস্তত্ত্বকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।
আমাদের সমাজমানসে দীর্ঘদিনের একটা 'চালু কথা' বা কুসংস্কারের মতো ধারণা গেঁথে রয়েছে যে—সাহিত্য, দর্শন কিংবা ইতিহাস হলো ‘পেছনের সারি’র বিষয়। এগুলো অলস বা কম মেধাবীদের পড়ার জিনিস এবং এই বিষয়গুলো পড়লে নাকি ভবিষ্যতে কোনো চাকরি পাওয়া যায় না। শুধু তাই নয়, সামাজিকভাবেও যারা বাংলা, দর্শন বা ইতিহাসে উচ্চশিক্ষা নেন, তাদেরকে একধরনের প্রচ্ছন্ন নিগ্রহ, অবজ্ঞা বা করুণার চোখে দেখা হয়। বিয়ের বাজার থেকে শুরু করে পারিবারিক আড্ডায় তাদের চেয়ে একজন সাধারণ মানের আইটি বা বিবিএ গ্র্যাজেুয়েটকে বেশি সফল মনে করা হয়। কিন্তু এই তীব্র সামাজিক অন্ধত্বের মাঝে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তোলা জরুরি—আমরা আসলে ‘দক্ষ শিক্ষার্থী’ বলতে কী বুঝি? শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসায়িক শিক্ষার ডিগ্রি থাকলেই কি একজন মানুষ দক্ষ হয়ে ওঠে? কেন এবং কবে থেকে এ সমাজের মনে হলো যে আইটি বা কম্পিউটার সায়েন্সের উপযোগিতা আছে, কিন্তু বাংলা বা দর্শনের নেই?
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বারবার পরীক্ষার দিন-তারিখ নির্ধারণ থেকে শিক্ষানীতিতে নানা ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী, কিন্তু কোথাও সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা না থাকায় এবং দফায় দফায় খণ্ড খণ্ডভাবে নানা পরিবর্তনের যে অস্পষ্টতা তৈরি করছেন, সে সবের ধোঁয়াশাই আজকের এই গুজব ও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে সহায়তা করেছে।
যাই হোক, আপাতত আমাদের সমাজে ‘দক্ষতা’ শব্দটিকে কিভাবে অত্যন্ত যান্ত্রিক এবং সংকীর্ণ ফ্রেমে বন্দি করে ফেলা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করি বরং। সাধারণের চোখে ধরে নেওয়া হয়, যে শিক্ষার্থী চমৎকার কোডিং করতে পারে, করপোরেট হিসাব মেলাতে পারে কিংবা নেটওয়ার্ক সিকিউরিটির জটিল জাল বুনে দিতে পারে, সেই কেবল দক্ষ। অবশ্যই এসব এক ধরনের দক্ষতা। এ ধরনের দক্ষতাকে Hard Skills বা কঠোর কারিগরি কর্মদক্ষতা বলা হয়ে থাকে। অথচ বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO)-র মতো বৈশ্বিক নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠানগুলো একবিংশ শতাব্দীর কর্মক্ষেত্রের জন্য দক্ষতার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নির্ধারণ করেছে। তাদের মতে, আগামী দিনের পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে জরুরি দক্ষতাগুলো হলো:
শুধুমাত্র আইটি বা বিবিএ পড়ে এই মানবিক ও মননশীল দক্ষতাগুলো পুরোপুরি অর্জন করা একেবারেই অসম্ভব। কারিগরি শিক্ষা আপনাকে হয়তো একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা মেশিন চালানো শেখাতে পারে, কিন্তু সেই সফটওয়্যারটি সমাজের কোন স্তরে কী ধরনের নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলবে, তা বুঝতে গেলে আপনাকে মানবিক বিদ্যার (Humanities) শরণাপন্ন হতেই হবে। আর এক্ষেত্রে আমরা চিরকালই পিছিয়ে।
একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং বুদ্ধিভিত্তিক সমাজ গঠনে মানবিক বিষয় এবং মানবিকতার কোনো বিকল্প হতে পারে না। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাসকে কেবল বইয়ের পাতায় কিছু খসখসে রস-কষহীন কঠিন তথ্যের সমষ্টি ভাবাটা মস্ত বড় ভুল; বরং এগুলো মূলত মানুষের চিন্তার খোরাক এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যম।
সাহিত্য মানুষকে সংবেদনশীল হতে শেখায়। অন্যের জুতোয় পা গলিয়ে তার দুঃখ-কষ্ট ও মনস্তত্ত্ব অনুভব করার যে ক্ষমতা (Empathy), তা কেবল সাহিত্যই দিতে পারে। একটি রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসের ভেতরের মানবিক আর্তি বুঝতে পারবে না। তাছাড়া, একজন সাহিত্য অনুরাগী শিক্ষার্থী ভাষার ওপর যে অসামান্য নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেন, তা করপোরেট বা সরকারি—যেকোনো চাকরিতে নিজের আইডিয়া প্রকাশ করার জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
দর্শন মানে ঘরের কোণে বসে শুধু ভাবা নয়; দর্শন শেখায় 'প্রশ্ন করতে'। যেকোনো প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারকে মেনে না নিয়ে তার পেছনে যৌক্তিক কারণ খোঁজার নামই দর্শন। আজকের যুগে আমরা হাজার হাজার সাইবার সিকিউরিটি বা আইটি বিশেষজ্ঞ তৈরি করছি, কিন্তু তাদের পাঠ্যসূচিতে যদি ‘এথিক্স’ বা নৈতিকতার দর্শন না থাকে, তবে সেই অতি-দক্ষ টেকনিশিয়ানরাই একদিন সমাজের সবচেয়ে বড় হ্যাকার বা ডিজিটাল অপরাধী হয়ে উঠতে পারে। দর্শন মানুষকে প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে দূরে রেখে সঠিক ও ভুলের তফাত করতে শেখায়।
ইতিহাস হলো মানবসভ্যতার উত্থান-পতনের জীবন্ত দলিল। অতীতকে না জেনে বর্তমানকে বোঝা এবং ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করা পুরোপুরি অসম্ভব। যেকোনো দেশের বড় বড় নীতিনির্ধারণ, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, এমনকি ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা অপরিহার্য। ইতিহাস সচেতনতাহীন একটি প্রজন্ম শিকড়হীন গাছের মতোই বেড়ে উঠেছে বলেই ওরা আজ মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় চেতনা নিয়ে বিভ্রান্ত এবং সামান্য ঝড়েই ভেঙে পড়ছে।
সমাজ যে মনে করে দর্শন বা ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের কোনো চাকরির বাজার নেই—এটি কেবলই একটি অমূলক মিথ। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে STEM (Science, Technology, Engineering, Math) ধারণার চেয়ে STEAM (যেখানে 'A' দিয়ে Arts বা Humanities বোঝায়) ধারণাকে বহুগুণ বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল (Apple)-এর দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস একবার বলেছিলেন: “শুধুমাত্র প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে যখন মানবিক বিদ্যা (Humanities) ও শিল্পকলার মিলন ঘটে, তখনই মানুষের হৃদয় জয় করার মতো সুন্দর ফলাফল আমাদের সামনে আসে।”
বর্তমানে গুগল, মাইক্রোসফট কিংবা মেটার মতো শীর্ষস্থানীয় গ্লোবাল টেক জায়ান্টগুলোতে প্রচুর পরিমাণ নৃবিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা অ্যালগরিদম কীভাবে মানুষের আচরণ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছে, তা একজন কোডারের চেয়ে একজন দার্শনিক বা সমাজবিজ্ঞানী অনেক নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন।
আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটেও বিসিএসসহ যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, গণমাধ্যম, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা (NGO), ব্যাংকিং খাত এবং বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্স (HR), ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং বিভাগে সাহিত্য ও ইতিহাসের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কারণ তাদের দীর্ঘ পড়ার অভ্যাসের ফলে তৈরি হওয়া বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও চমৎকার লিখিত প্রকাশভঙ্গি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি ধারালো ও পরিপক্ব।
আমাদের সমাজের গভীর মনস্তত্ত্বে এক ধরনের ‘উপযোগিতাবাদী’ (Utilitarian) এবং নিরেট 'ব্যবসায়িক' মানসিকতা বাসা বেঁধেছে। আমরা শিক্ষাকে জ্ঞানের আলো বা মানবিকতার বিকাশ হিসেবে না দেখে কেবল ‘টাকা উপার্জনের লাইসেন্স’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছি। এই সংকটের মূল আসলে প্রোথিত রয়েছে আমাদের ঔপনিবেশিক অতীতে। ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি আমল থেকেই আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল—‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। এই ‘গাড়ি ঘোড়া’ চড়ার অন্ধ ইঁদুরদৌড় থেকেই আমরা বিজ্ঞান ও বাণিজ্যকে আভিজাত্যের প্রতীক এবং মানবিক বিদ্যাকে ‘গরিবের বা কম মেধাবীদের বিষয়’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছি। এই সামাজিক নাক সিটকানো ভাব আসলে আমাদের সামগ্রিক নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে বিশেষ নমনীয় কিছু কাঠামো থাকা উচিত, যেখানে বাংলা সাহিত্যের একজন শিক্ষার্থী চাইলে তার মূল বিষয়ের পাশাপাশি 'ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ', 'কনটেন্ট রাইটিং' বা 'মিডিয়া স্টাডিজ' ইত্যাদি কোর্স মাইনর হিসেবে নিতে পারবেন। আবার দর্শনের শিক্ষার্থীকে 'এআই এথিক্স' (AI Ethics) কিংবা 'বিজনেস এথিক্স' শেখানো যেতে পারে।
অনার্স কোর্সের চার বছরের শিক্ষাজীবনে প্রতিটি মানবিক বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৩ থেকে ৬ মাসের কিছু মৌলিক আইটি স্কিল বাধ্যতামূলক করা উচিত। যেমন—অ্যাডভান্সড ডেটা অ্যানালিসিস, বেসিক কোডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং বা সাইবার হাইজিন (Cyber Hygiene)। এতে করে তার মৌলিক মননশীলতাও বজায় থাকবে, আবার সে চাকরির বাজারে প্রযুক্তিতেও পিছিয়ে থাকবে না।
বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণগত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বিশাল 'অনুবাদ শিল্প' (Translation Industry), সাবটাইটেল রাইটিং, প্রুফ রিডিং এবং কপিরাইটিংয়ের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে ইতিহাস ও দর্শনের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের ব্লগিং, শিক্ষামূলক কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং গবেষণায় দারুণ ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির মেরুদণ্ড কেবল তার জিডিপির গ্রাফ বা চোখধাঁধানো প্রযুক্তিগত অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না। প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে গতিশীল ও আরামদায়ক করতে পারে, কিন্তু সেই জীবনকে অর্থপূর্ণ, সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মানবিক করে তোলে সাহিত্য, দর্শন ও ইতিহাস। যে সমাজ কেবল রোবটের মতো প্রযুক্তিবিদ তৈরি করে কিন্তু কোনো কবি, চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী বা ইতিহাসবেত্তা তৈরি করতে পারে না, সেই সমাজ আত্মাহীন, যান্ত্রিক এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর হয়ে পড়ে।
আমাদের উচিত সামাজিক ট্যাবু ভেঙে এই মননশীল বিষয়গুলোকে অবজ্ঞা না করে, সেগুলোর আধুনিক রূপান্তর ঘটানো। মানবিক বিদ্যার গভীরে প্রোথিত সুতীক্ষ্ণ চিন্তাশক্তি এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকরী প্রায়োগিক দক্ষতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই গড়ে তোলা সম্ভব আগামী দিনের প্রকৃত 'দক্ষ, মানবিক ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্বনাগরিক'।
ফজিলাতুন নেসা শাপলা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: [email protected]