Published : 25 Jul 2026, 12:09 AM
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন সরে দাঁড়ানোর পর কে হচ্ছেন বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা, দেশের রাজনীতিতে সেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে কারো কারো নাম আলোচনায় এলেও ক্ষমতাসীন দল বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেছেন, এটি এখনো ধারণাগত জায়গায় আছে।
তারা বলছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার ব্যাপারে দলে আলোচনা হবে; এরপর নির্বাচন হবে। সব মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করাটা কোনো কোনো নেতা ‘অনেক সময়ের ব্যাপার’ মনে করছেন।
আবার কোনো কোনো নেতা আভাস দিয়েছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে পারে সংবিধানের সংশোধনের পর, যেখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ভারসাম্য আনার মতো প্রস্তাব রয়েছে।
২০২৩ সালে ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটলেও বঙ্গভবনে থেকে যান সাহাবুদ্দিন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠনের তুমুল আন্দোলন করলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে, এমন যুক্তিতে বিরোধিতা করেছিল বিএনপি। ফলে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও আর সে পথে হাঁটেনি।
শেখ হাসিনার সবশেষ সরকার, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের শপথ হয় সাহাবুদ্দিনের হাতেই।
এর মধ্যে বুধবার গুঞ্জন ওঠে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এর দুই দিন পর শুক্রবার ‘শারীরিক ও মানসিক’ সক্ষমতা না থাকার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
তার পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিনিই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সামলাবেন।
সংবিধান অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। এটি সর্বোচ্চ সময়সীমা; তার আগে যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে।
তবে শিগগিরই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না দলের একাধিক নেতা।
তাদের মতে, বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টি না তোলা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তবে যেদিনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হোক, যেদিনই নাম ঘোষণা হোক, সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, সেই আলোচনা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরেই শুরু হয়। সাহাবুদ্দিনের সরে দাঁড়ানোয় সেই আলোচনা আরো জোরালো হল।

২৩তম রাষ্ট্রপতির আলোচনায় কারা আছেন, সেই ধারণা দিতে গিয়ে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মোটা দাগে ছয়জনের নাম বলেছেন।
এ তালিকায় আছেন— স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল মঈন খান ও ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী। অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও আছে।
এর মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় থাকার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের একজন নেতা।
এদের বাইরে যাদের নাম আছে, তাদের কথা এসেছে দলের স্থায়ী কমিটির অন্তত তিনজন সদস্যের মুখ থেকে।
অবশ্য দলের কোনো কোনো নেতা বলেছেন, পত্রপত্রিকায় অনেকের নাম আলোচনায় এলেও সবই ধারণাপ্রসূত; এখনো কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি।
এ বিষয়ে দলের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী তো স্পিকার ইতোমধ্যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। এরপর পার্টির সিদ্ধান্ত হবে, নির্বাচন হবে; অনেক সময়ের ব্যাপার আছে।”
সরকার কাউকে চিন্তা করছে কিনা, এমন প্রশ্ন করা হয় বিএনপির মহাসচিবকে।
জবাবে তিনি বলেন, “এটা তো আমি বলতে পারি না, আমি কোনো নাম জানি না।”
একই প্রশ্নে একই ধরনের জবাব আসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কাছ থেকেও, যিনি দলটির স্থায়ী কমিটিতেও আছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এটা সত্যিকারার্থে জানা নেই। সবকিছু দেখছি, মিডিয়াতে যা আসছে।”
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে ১৫ জুলাই। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের এক অধিবেশন সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি দেওয়া যাবে না। সে হিসেবে সেপ্টেম্বরে পরবর্তী অধিবেশন বসবে।
ক্ষমতাসীন দল সেপ্টেম্বরে অষ্টাদশ সংশোধনী সংসদে তুলতে পারে আভাস দিয়ে বিএনপির ওই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে যে কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে, সেই কমিটির মাধ্যমে সংশোধনীর কার্যক্রম সামনে আসবে। সেই সংশোধনীতে জুলাই সনদের অনেক বিষয় যুক্ত হবে।
তার ভাষ্য, সেই সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়ে কিছু প্রস্তাব আছে।
“বিএনপির তরফেও একই ধরনের প্রস্তাব আছে। ফলে ওই সংশোধনীর আগে সম্ভবত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে না।”
বুধবার বিকালে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়। সেই পোস্টে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নামও তুলে ধরেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “যে সচিবের নাম এসেছে, তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।”
সরকারের সঙ্গে যুক্ত, আবার দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদেও আছেন, এমন একজন নেতা বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নাম আছে রাষ্ট্রপতির আলোচনায়।
রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে বিষয়ে ধারণা নেই দাবি করে একজন মন্ত্রী বলেছেন, “বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ দুজন মন্ত্রীর কেবল জানার সুযোগ আছে। এর বাইরে বিষয়টি এখনো আসেনি।”
এর আগে বিএনপির সংসদীয় দলের অনাস্থার মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
তখনকার স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ওই দিন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে কার্যভার নিয়েছিলেন।
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
ফলে কোনো দল উত্তরসূরি হিসেবে কারও নাম ঠিক করলেই তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে যাবেন না। তাকে প্রার্থী হতে হবে এবং আইন অনুযায়ী নির্বাচিত হতে হবে।
সংবিধানের ১১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে এই নির্বাচন পরিচালনা করেন।
নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করবে। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ঘোষণা করবে নির্বাচনের তফসিল।
বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোট নেওয়া হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হয় প্রকাশ্যে, গোপনে নয়। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট থাকে।
আরো পড়ুন:
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন সাহাবুদ্দিন
'আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান': পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
'মাফিয়া সরকারের' রাষ্ট্রপতি হলেও বিএনপি সরকারে শ্রদ্ধা ছিল সাহাবু