Published : 10 Jun 2026, 01:05 PM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং আগ্রাসনপন্থি মার্কিন সিনেটররা প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে তাদের মুখপাত্রদের দিয়ে বিশ্বকে বারবার যে কথাটি বলেন, সেটি হচ্ছে—কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকি!
এতটুকু কাণ্ডজ্ঞান আছে এমন যেকোনো মানুষের কাছেই এই দাবি অত্যন্ত হাস্যকর মনে হবে। কিউবা এমন একটি ছোট ক্যারিবীয় দ্বীপ, যার জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি এবং যে দেশটি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক অবরোধের শিকার। কিউবার কোনো কৌশলগত অস্ত্রভাণ্ডার নেই, বিদেশে সামরিক ঘাঁটি নেই, বিশ্বের মহাসাগরজুড়ে মোতায়েন করা নৌবহর নেই কিংবা নিজ সীমান্তের বাইরে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও নেই।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক পরাশক্তি। তারা এমন এক রাষ্ট্র, যার বিশ্বজুড়ে আটশোর অধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যার সামরিক বাজেট উন্নয়নশীল বহু দেশের সম্মিলিত বাজেটের চেয়েও বেশি, যার বিমানবাহী রণতরীগুলো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে পৌঁছাতে পারে এবং যার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার পৃথিবীকে বহুবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে।
সাধারণভাবে এই অভিযোগ হাস্যকর বলে মনে হলেও এক অর্থে ট্রাম্প ও তার মুখপাত্ররা পুরোপুরি ভুল নন; হয়তো এক অর্থে তারা সত্যই বলছেন। তবে তারা যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে ভুলে যান, তা হলো এই ‘হুমকি’র প্রকৃতি। কিউবা তাদের জন্য কীভাবে হুমকি তৈরি করছে?
এটি ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি নয়, বোমার হুমকি নয়, সেনাবাহিনীর হুমকি নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হুমকি নয় কিংবা জৈব অস্ত্রের হুমকিও নয়। রাষ্ট্রগুলো সাধারণত যেসব উপায়ে একে অপরকে হুমকি দেয়, তার কোনোটিই নয়। কিউবার হুমকি ভিন্ন ধরনের—এটি একটি নীরব হুমকি, একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক হুমকি। একটি অনুকরণীয় উদাহরণের হুমকি। ১৯৫৯ সালের কিউবার বিপ্লব, যা ওয়াশিংটনকে এখনও উদ্বিগ্ন করে রেখেছে, তা কিউবার যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করার ক্ষমতা নয়, বরং কিউবার সেই ক্ষমতা, যা দেখাতে পারে যে আরেকটি পথও সম্ভব।
সাম্রাজ্যবাদীদের দৃষ্টিতে কিউবার বিপ্লব যেন একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ; পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের হুমকির পরও বুক চিতিয়ে টিকে থাকার অপরাধ। শুধু টিকে থাকাই নয়—নিরক্ষরতা দূর করা, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসক তৈরি করা ও শিক্ষক গড়ে তোলা ইত্যাদি। নিজেদের যা ছিল, এমনকি যা ছিল না তাও নিজেদের চেয়ে দরিদ্র জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
যখন পরাশক্তিগুলো যুদ্ধ রপ্তানি করছিল, কিউবা তখন রপ্তানি করছিল সংহতি। যখন আমেরিকা পাঠাচ্ছিল মেরিন সেনা, কিউবা পাঠাচ্ছিল চিকিৎসক দল। যখন আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছিল, কিউবা পাঠাচ্ছিল টিকা ও স্বাস্থ্যসেবা। যখন বাজারপন্থিরা ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, তখন কিউবা দেখাচ্ছিল যে সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মানুষ ও পরিবেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখা সম্ভব।
এটাই প্রকৃত হুমকি। কারণ সাম্রাজ্যগুলো শুধু সমশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বীকেই ভয় পায় না; তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় তাদের, যারা তাদের আধিপত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি শহর ধ্বংস করতে পারে, একটি ধারণা মহাদেশ পেরিয়ে যেতে পারে, একটি বোমা ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে, আবার একটি উদাহরণ পুরো প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। ইতিহাস দেখায়—বৃহৎ শক্তিগুলো সামরিক শক্তি মোকাবিলার চেয়ে নৈতিক বিরোধের মুখোমুখি হতে বেশি অসহায় বোধ করে। সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা যায়, ধারণাকে নয়। এই কারণেই ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের প্রশাসন কিউবাকে নতজানু করার চেষ্টা করে এসেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট বদলেছে, ভাষণ বদলেছে, পদ্ধতি বদলেছে, আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বদলেছে; কিন্তু কিউবা রয়ে গেছে। কিউবা দেখেছে আইজেনহাওয়ার, কেনেডি, জনসন, নিক্সন, ফোর্ড, কার্টার, রিগ্যান, জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, ওবামা, ট্রাম্প, বাইডেন এবং আবারও ট্রাম্পকে।
সবাই কিউবার বৈপ্লবিক সরকারের পরিসমাপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারা সবাই চলে গেছেন, কিন্তু কিউবা রয়ে গেছে। বিষয়টি সত্যিই এক অসাধারণ বৈপরীত্য। ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী পরাশক্তি এখনো নিজেকে একটি অবরুদ্ধ ও অবরোধকবলিত ছোট দ্বীপের সম্ভাব্য শিকার হিসেবে উপস্থাপন করে। কেন করে?
এর কারণ হয়তো গভীরে, তারা এমন কিছু বোঝে যা প্রকাশ্যে স্বীকার করে না। সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র সবসময় সামরিক শিল্প-কারখানায় তৈরি হয় না। কখনো কখনো সেগুলো জন্ম নেয় মর্যাদা থেকে, কখনো কখনো সেগুলো গড়ে ওঠে ঐক্য ও সংহতি দিয়ে, কখনো কখনো সেগুলো তৈরি হয় প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে, কখনো কখনো সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে উদাহরণের মাধ্যমে এবং এই অস্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে কিউবা এক অসাধারণ দীর্ঘ স্থিতিশীলতার পরিচয় দিয়েছে।
চিকিৎসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিকতাবাদী কর্মীসহ এমন সব নাগরিক, যারা বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেও নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে প্রস্তুত, তাদের দিয়েই গঠিত হয়েছে কিউবার এই অস্ত্রভাণ্ডার। এটাই সেই হুমকি, যা প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদকে উদ্বিগ্ন করে। এই আশঙ্কা যে বিশ্বের জনগণ হয়তো আবিষ্কার করবে—শক্তি সবসময় সেনাবাহিনীর আকারে, সঞ্চিত সম্পদে বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতায় নিহিত থাকে না। তারা হয়তো বুঝতে পারবে মর্যাদাও এক ধরনের শক্তি, আর সেই সংগ্রামই কিউবা ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে করে যাচ্ছে এবং জয়ী হচ্ছে।
তবে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না যে, কিউবা শুধু প্রতিরোধের প্রতীক নয়; কয়েক দশক ধরে এটি বিশ্বের জনগণের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে আছে। যেখানেই কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা জরুরি মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে, সেখানেই পৌঁছেছেন কিউবা। এই কারণেই আজ যখন ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে হুমকি, অবরোধ ও নতুন শ্বাসরুদ্ধকর ব্যবস্থাগুলো আরও কঠোর হচ্ছে, তখন দূর থেকে শুধু কিউবার প্রতিরোধের প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়। এই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক অবরোধ যখন লক্ষ লক্ষ মানুষকে শাস্তি দিচ্ছে, তখন তা ন্যায়বিচার, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মর্যাদায় বিশ্বাসী সকল মানুষের সক্রিয় প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া দাবি করে।
আজ সংহতি কেবল একটি ফাঁকা শব্দ হতে পারে না। এটিকে রূপ দিতে হবে প্রতিবাদে, সমর্থনে, অঙ্গীকারে এবং কার্যকর পদক্ষেপে। আমরা কিউবাকে এই মধ্যযুগীয় অবরোধের মুখে একা ফেলে রাখতে পারি না। কারণ কিউবাকে রক্ষা করা শুধু একটি রাষ্ট্র, একটি জনগণ বা একটি বিপ্লবকে রক্ষা করা নয়; কিউবাকে রক্ষা করা মানে জনগণের নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারকে রক্ষা করা। এটি সহযোগিতাকে স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে, মর্যাদাকে জবরদস্তির বিরুদ্ধে এবং মানবতাকে শক্তির রাজনীতির বিরুদ্ধে রক্ষা করা। কিউবাকে রক্ষা করা মানে সবচেয়ে সুন্দর এক আদর্শকে রক্ষা করা।
কিউবাকে ধ্বংস করা শুধু একটি বিপ্লবকে ধ্বংস করার চেষ্টা হবে না; এটি হবে আমাদের সময়ের অন্যতম গভীর আন্তর্জাতিক সংহতির অভিজ্ঞতার ওপর আঘাত। তাই আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কিউবার প্রয়োজনে আমাদের সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে। কিউবা, তার জনগণ এবং তার বিপ্লবী সরকারকে অনুভব করতে হবে যে, যখন আমরা বলি ‘কিউবা একা নয়’, তখন সেটি নিছক একটি স্লোগান নয়। কিউবা বিশ্বের জনগণকে, মানবতাকে অনেক কিছু দিয়েছে; এবার সময় এসেছে আমরা তাকে তার সামান্য হলেও ফিরিয়ে দিই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই কিউবার সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশকে সহযোগিতা করতে ১৯৭৪ সালে কিউবার সঙ্গে বাংলাদেশের পাটের ব্যাগ রপ্তানির চুক্তি হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার শত্রুতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে খাদ্য সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়, যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয় এবং খাদ্য উৎপাদনেও ভয়াবহ বিপর্যয় হয়। বাংলাদেশের দুঃসময়ে যে দেশটি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এই ঘোর বিপদের সময়ে আজ আমরা কি তাদের প্রতি কোনো দায় বোধ করি?
ড. মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: [email protected]
'দেশ নাকি মৃত্যু': যুক্তরাষ্ট্র আঘাত করলে কী জবাব দেবে কিউবা?