Published : 11 Jun 2026, 10:29 AM
একটি ছোট ঘটনা দিয়েই শুরু করছি। দেশের বাইরের এক বিশ্ববিদ্যালয়-শহর, একই ভবন—দোতলায় থাকে একটি বাঙালি পরিবার, নিচতলায় আরেকটি। প্রতি দুপুরে, প্রতি সন্ধ্যায়, কখনো গভীর রাতে দোতলার বারান্দা থেকে ধোঁয়া নেমে আসে নিচের বারান্দায়, শোবার ঘরে। সেখানে একটি শিশু নিঃশ্বাস নেয়। ঘটনাটি একান্তই ব্যক্তিগত, প্রায় তুচ্ছ। অথচ এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে নাগরিক জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি—আমার স্বাধীনতা কোথায় শেষ হয়, আর অন্যের ফুসফুস কোথায় শুরু?
দৃশ্যটি কাল্পনিক নয়, এত সাধারণ যে প্রবাসের প্রায় প্রতিটি পরিবার এর কোনো-না-কোনো সংস্করণের মুখোমুখি হয়। ওপরের প্রতিবেশী সিগারেট ধরান—কখনো নিছক সিগারেট, কখনো বেশি কিছু—আর ধোঁয়া নামে নিচের জানালা গলে। নিচের পরিবার এই ধোঁয়া বেছে নেয়নি, চায়ওনি; তবু সেটি মেশে তাদের রাতের খাবারে, ঘুমে, সন্তানের শ্বাসতন্ত্রে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবস্থান স্পষ্ট: পরোক্ষ ধূমপানের কোনো ‘নিরাপদ মাত্রা’ নেই, আর শিশুরা এর সবচেয়ে অরক্ষিত শিকার—তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেশি, ফুসফুস তখনো গড়ে উঠছে। অর্থাৎ এখানে যা ঘটছে, তা নিছক শিষ্টাচারের প্রশ্ন নয়, স্বাস্থ্যেরও প্রশ্ন। অথচ আমরা একে আটকে রাখি ব্যক্তিগত বিরক্তির খোপে—কারণ অভিযোগ করতে গেলে থাকে সম্পর্ক নষ্টের ভয়, আর ঝামেলা এড়িয়ে চলার পুরোনো অভ্যাস।
দুই.
সবচেয়ে সহজ হতো ওপরতলার মানুষটিকে খলনায়ক বানিয়ে দেওয়া। সহজ, কিন্তু অসৎ। কারণ খলনায়ক খুঁজে পাওয়া আসলে এক ধরনের স্বস্তি—ক্ষতির পেছনে একজন নিষ্ঠুর মানুষ থাকলে অন্যায়টা সরল হয়ে যায়: তার একটা মুখ থাকে, একটা নাম থাকে, আর সেই মুখের দিকে আঙুল তুলে আমরা নিজেদের নিরপরাধ ভেবে নিতে পারি। বাস্তব এতটা সোজা নয়।
কারণ বাস্তবে তিনি সম্ভবত নিতান্তই এক ক্লান্ত মানুষ—পিএইচডির মাঝপথে, কোলে হয়তো ছোট্ট একটি সন্তান, মেয়াদ ফুরিয়ে আসা ভিসা, দেশে এক মা যিনি ফোনে জানতে চান, কবে ফিরছ। তার দিন কাটে অন্যের প্রত্যাশার ভার বইতে বইতে। দিনের শেষে ওই নয় মিনিটের ধোঁয়া তার কাছে নৈতিক স্খলন নয়, সব চাপের বাইরে দুদণ্ড দাঁড়ানোর একফালি দরজা। তিনি আসলে ধোঁয়া ছাড়েন না; একটুখানি শ্বাস নিতে চান। বিদ্রূপটা এখানেই—নিজে এক মুঠো বাতাসের খোঁজে তিনি নিচের তলার বাতাসটুকু বিষিয়ে তোলেন।
এই সহানুভূতি অপরাধকে মাফ করে না; শিশুর ফুসফুসের ক্ষতি তাতে এক অণুও কমে না। কাউকে বোঝা মানে তার অন্যায় মেনে নেওয়া নয়, কেবল অন্যায়ের আসল চেহারাটা চিনে নেওয়া। আর সেই চেহারা চিনলে বোঝা যায়, আমাদের জীবনে অন্যের দ্বারা যত ক্ষতি, তার বেশির ভাগই ঘৃণা নয়, নিছক অমনোযোগ থেকে আসে। ঘৃণা অন্তত আমাদের চোখে চোখ রাখে; অমনোযোগ দেখতেই পায় না। ওপরের মানুষটি আমার পরিবারের খারাপ চান না; তিনি কেবল আমার পরিবারের কথা একবারও ভাবেন না। আর এই না-ভাবাটাই বহু ক্ষেত্রে ঘৃণার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে—কারণ ঘৃণার বিরুদ্ধে অন্তত লড়া যায়, কিন্তু যে আঘাত কেউ টেরই পায় না, তার বিচার চাওয়া যায় কার কাছে?
তিন.
এই দৃশ্যের ভেতরে একটি গভীর পরিহাসও আছে। হাজার মাইল দূরের এক বিদেশি শহরে দুটি বাঙালি পরিবার ঠিক সেই নীরব, ভদ্রতা-মোড়া দ্বন্দ্বটিই গড়ে তোলে, যা রাজধানী ঢাকার ভাগ-করা দেয়াল আর দখল-হওয়া সিঁড়ির সংস্কৃতিতে আমরা প্রজন্ম ধরে রপ্ত করেছি। দেশ বদলায়, ঠিকানা বদলায়, ভাষা বদলায়—বদলায় না কেবল পুরোনো অভ্যাসটুকু: পাশের মানুষকে প্রতিপক্ষ ভেবে নেওয়া। আমরা দেশান্তরী হয়েছি, কিন্তু তর্কটা দেশান্তরিত হয়নি। অথচ এই বিদেশবিভুঁইয়ে যে মানুষটি ধীরে ধীরে আমার সন্তানকে বিষিয়ে তুলছেন, তিনিই একমাত্র মানুষ, যিনি আমার ভাষা বোঝেন, আমার ঠাট্টা বোঝেন, আমার মায়ের ফোনের একাকীত্ব বোঝেন। আমরা প্রায়ই আঘাত পাই ঠিক তাদের কাছ থেকেই, যারা আঘাত করার মতো যথেষ্ট কাছে আসে—কারণ ভালোবাসা আর ক্ষত একই দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে।
চার.
‘পরোক্ষ ধূমপান’ কথাটি প্রতিষ্ঠিত—যে ধোঁয়ার ক্ষতি আপনি বুকে টানছেন, তা জ্বালিয়েছে অন্য কেউ। আমি এর একটি বৃহত্তর সংস্করণের কথা বলতে চাই, যার কোনো চিকিৎসা-পরিভাষা নেই, অথচ যা আমাদের প্রতিটি দিন গড়ে দেয়: পরোক্ষ জীবনযাপন। আমরা কেউই নিজের জীবনটা পুরোপুরি প্রথম হাতে যাপন করি না; যে বাতাসে নিঃশ্বাস নিই, তা কেউ-না-কেউ আগে ছেড়ে গেছে। কেউ একজন ওপরে বসে স্বাধীনতা উপভোগ করেন, আর সেই স্বাধীনতার ছাই গড়িয়ে নামে নিচের সবার শ্বাসে।
পরোক্ষ ধূমপান কেবল ফুসফুসে দাগ ফেলে; পরোক্ষ জীবনযাপন দাগ ফেলে আত্মায়। কারণ একটা সময় পেরোলে নিচের তলার মানুষ ভুলে যায়, এই বাতাসটা একদিন তার নিজেরও ছিল; সে ভাবতে শেখে, দম বন্ধ হয়ে আসাটাই বুঝি স্বাভাবিক। আর ঠিক এখানে এসে পরোক্ষ জীবনযাপন তার সবচেয়ে নিখুঁত জয়টা পায়—যখন শিকার আর বুঝতেই পারে না যে সে শিকার।
একবার চোখ খুলে গেলে দেখা যায়, ধোঁয়া কেবল দোতলা থেকেই নামে না। বসের মেজাজ নামে কর্মচারীর সকালে, বাবার ব্যর্থতাবোধ সন্তানের ভয়ে, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কোটি নাগরিকের দমবন্ধ করা বাস্তবতায়। কেউ ধোঁয়া ছাড়ছে, কেউ নিচে দাঁড়িয়ে তা শ্বাসে টানছে—না চেয়ে, না জেনে, না বুঝে। ক্ষমতা বোঝার জন্য মোটা বই লাগে না—লাগে কেবল দুটি তলা আর একটা বাজে বায়ুচলাচল ব্যবস্থা।
পাঁচ.
কারণ আমাদের গোটা সমাজটাই একটা বহুতল ভবন। ওপরে ওঠা মানে কেবল বেশি জায়গা নয়, বেশি বাতাসও; নিচে থাকা মানে অন্যের ছাড়া নিঃশ্বাসটুকু বাধ্য হয়ে গিলে নেওয়া। শ্রেণি, লিঙ্গ, বয়স, পদ—প্রতিটি ব্যবধানই একেকটি তলা। আর এর একটাই নিয়ম, অভিকর্ষের মতোই নির্মম: সুখ ওপরে জমে, ক্লান্তি নিচে নামে; সিদ্ধান্ত ওপরে নেওয়া হয়, মাশুল নিচে গোনা হয়। আর সবচেয়ে নিচের তলায় দাঁড়িয়ে থাকে শিশু, যে কোনো তলা বেছে নেয়নি, কোনো ধোঁয়াও জ্বালায়নি; অথচ ওপরের সব তলার উদ্বৃত্ত জমা হয় তারই ফুসফুসে। সে যেন আমাদের অমনোযোগের শেষ ঠিকানা।
বেশির ভাগ অন্যায়ের পেছনে আসলে কোনো খলনায়ক থাকে না, থাকে কেবল একদল ক্লান্ত, আত্মমগ্ন, মোটামুটি ভালো মানুষ—যারা একে অন্যের কথা ভাবতে ভুলে গেছে। নিষ্ঠুরতার জন্য খানিকটা চেষ্টা লাগে; অমনোযোগের জন্য কিছুই লাগে না। আর এই না-ভাবাই আমাদের সমাজের সবচেয়ে নিঃশব্দ অবিচার।
ছয়.
তবে সবচেয়ে কঠিন স্বীকারোক্তিটি তুলে রেখেছি শেষের জন্য। অভিযোগের আঙুল ওপরে তোলা সহজ; কিন্তু তর্জনি যখন ওপরে ওঠে, তখন মধ্যমা, অনামিকা আর কনিষ্ঠা চুপচাপ নিজের দিকেই ফিরে থাকে। অস্বস্তিকর সত্যটি হলো, নিচতলার মানুষটিও তো কারো না কারো ওপরতলার মানুষ। এই ভবনে নিরীহ ভাড়াটে বলে কেউ নেই; প্রত্যেকের মাথার ওপর কেউ আছে, নিচেও কেউ।
আমি হয়তো বারান্দায় ধোঁয়া ছাড়ি না। কিন্তু ঘরে বয়ে আনি নিজের ক্লান্তি, ব্যর্থতার বোধ, সারা দিনের জমে থাকা অপমান—আর তা ছেড়ে দিই খাবার টেবিলে: নীরবতা হয়ে, পর্দার নীল আলো থেকে চোখ না তোলা হয়ে, কণ্ঠের এক অকারণ ধার হয়ে, যা গিয়ে পড়ে সন্তানের ওপর। আমার সিগারেট নেই, কিন্তু ধোঁয়া আছে—আর সে ধোঁয়াও একই অভিকর্ষে নিচে নামে। তাকে দরজার ফাঁক গলে ঢুকতে হয় না, কারণ সে আগে থেকেই ঘরে—আমার গলার স্বরে, আমার দীর্ঘশ্বাসে, আমার চুপ করে থাকায়। সন্তান বছরের পর বছর তা শ্বাসে টেনে নেয়—বিনা সম্মতিতে, ঠিক যেমন একদিন আমিও টেনেছিলাম আমার বাবার না বলা ক্লান্তির ধোঁয়া। অর্থাৎ ওপরতলায় আমি এমন একজনকে খুঁজছিলাম, যে না ভেবে একটি শিশুর ক্ষতি করছে। তাকে পেয়েও গেছি। সে আমার এক তলা ওপরে। এবং এক তলা নিচে।
সাত.
তাহলে শেষমেশ প্রশ্নটি কী? আমরা কি এমন এক সমাজ গড়ছি, যেখানে কারও স্বাধীনতা মানেই অন্য কারও শ্বাসকষ্ট, যেখানে ওপরে ওঠার অর্থই নিচের তলায় কাউকে রেখে আসা? আর সবচেয়ে নিচের তলায় যে শিশুটি দাঁড়িয়ে—যে আমাদের কারও সন্তান, অথচ একই সঙ্গে আমাদের সবার—তার ফুসফুসের ভার শেষমেশ কে নেবে?
করণীয় আছে। ব্যক্তি-পর্যায়ে চাই অভিযোগ নয়, সংলাপ—দরজায় কড়া নেড়ে, সন্তানদের প্রসঙ্গ সামনে রেখে বলা: ‘ভাই, ধোঁয়া তো নিচে নামে, আর বাচ্চারা থাকে নিচেই।’ অধিকাংশ মানুষ ক্ষতি করেন অজ্ঞতায়, জেদে নয়; মুখরক্ষার একটুখানি সুযোগ পেলে তারা বদলান। আর প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে চাই স্পষ্ট নীতিমালা ও প্রয়োগ, যাতে দায়টা সম্পর্কের ঘাড়ে নয়, কর্তৃপক্ষের কাঁধে পড়ে।
কিন্তু সবচেয়ে জরুরি সমাধানটির সঙ্গে বোধকরি ওপরের প্রতিবেশীর কোনো সম্পর্কই নেই। সেটি হলো নিজের ছাড়া ধোঁয়ার দিকে একবার ফিরে তাকানো: খাবার টেবিলে ফোনটা সরিয়ে রাখা, বিনা কারণে কণ্ঠ কঠিন না করা, নিঃশ্বাস ছাড়ার আগে এক মুহূর্ত নিচের তলার কথা ভাবা। কারণ আমরা সবাই কারও না কারও ওপরতলার বাসিন্দা, আর প্রত্যেকের ছাড়া ধোঁয়া কোথাও না কোথাও নেমে যাচ্ছে। সভ্যতা মানে হয়তো এই একটিমাত্র অভ্যাস: জানালা বন্ধ করার আগে একবার ভেবে দেখা, আমার ধোঁয়াটা ঠিক কার ঘরে গিয়ে ঢুকছে।
মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, পরমাণু ভেঙেছে—অথচ আজও রপ্ত করতে পারেনি সবচেয়ে কঠিন শিল্পটি: নিজের সুখের ছায়া যেন অন্যের অন্ধকার হয়ে না দাঁড়ায়। প্রশ্নটি প্রাচীন, কিন্তু উত্তর দিতে হয় প্রতিদিন নতুন করে—প্রতিটি বারান্দায়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে। কারণ ঠিক এই মুহূর্তে কোথাও না কোথাও একটি শিশু আমাদের কারও ছাড়া ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সে কিছু বলছে না। সে কেবল বড় হচ্ছে—আর নিঃশব্দে শিখে নিচ্ছে, এই দম-বন্ধ-করা বাতাসটুকুকেই বুঝি বলে জীবন।
মাহমুদ উজ জামান সহকারী অধ্যাপক, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: [email protected]