Published : 09 Jun 2026, 09:22 AM
বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা, অর্থ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থর গতি, তীব্র রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতার মতো সংকটের পাহাড় সামনে রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষিত হতে যাচ্ছে। এমন এক কঠিন সময়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও পার করছে এক চরম ক্রান্তিকাল।
সরকারি ও বেসরকারি—উভয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অসহনীয় দুর্ভোগ গত দুই বছরে আরও তীব্র হয়েছে। গত ২৪ মাসে হামসহ অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী টিকাদান কর্মসূচি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বিঘ্নিত হয়েছে; যার চড়া মূল্য আমাদের শিশুরা দিচ্ছে নিজেদের জীবন দিয়ে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, খণ্ডিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতার অভাবে নীতি বাস্তবায়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় ও স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। স্বাস্থ্যখাতে এই ছন্নছাড়া অবস্থা অতীতের বহু অর্জনকে আজ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সূচকগুলোতে এক আশঙ্কাজনক অবনতি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবার চাকা এখন সামনের দিকে না গিয়ে উল্টো পেছনের দিকে ছুটছে। আগে যেখানে আমাদের দেশে প্রতি ১,০০০টি জীবিত শিশু জন্মালে মৃত্যুর সংখ্যা কমে সর্বনিম্ন ২১-এ নেমে এসেছিল, তা এখন আবারও বেড়ে ২৭-এ দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৩৩-এ পৌঁছেছে। এর ওপর দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির সমস্যা তো রয়েছেই; পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৪ শতাংশ) শিশু খর্বকায়তায় (Stunting) ভুগছে, যা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। গত দুই বছরে চিকিৎসার লাগামহীন আর্থিক বোঝা লাখ লাখ মধ্যম ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির (GDP) ১ শতাংশেরও কম, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন বরাদ্দগুলোর একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আমাদের মতো দেশের স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করে থাকে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা পূরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য স্বাস্থ্যখাতের বাজেট বরাদ্দ কেবল জনসংখ্যার চাহিদা বা রোগের বোঝার ওপর নির্ভর করে না; তা দেশের আর্থিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতের (যেমন: শিক্ষা, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা) ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। তবে এর জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার আকাঙ্ক্ষাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আসন্ন বাজেটেও স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া এখানে একটি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ রয়েছে। যেমন—২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল স্বাস্থ্য বাজেট ৪১,৪০৭ কোটি টাকা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা ১৩ শতাংশ ছাঁটাই করে ৩৫,৯২২ কোটি টাকা করা হয়। বছর শেষে প্রকৃতপক্ষে কত শতাংশ বাস্তবায়িত হলো, সেটাই মূল প্রশ্ন। তার ওপর এই বাজেটের ৬০ শতাংশের বেশি চলে যায় অনুন্নয়ন বা প্রশাসনিক ব্যয়ে (বেতন-ভাতা)। ফলে রোগীর প্রত্যক্ষ সেবার জন্য বরাদ্দ থাকে খুবই সামান্য। আবার দুর্নীতিরোধ ও সুশাসনের অভাবে এই সীমিত বরাদ্দেরও শতভাগ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা আমাদের নেই।
একটি দেশের বাজেট শুধু অর্থ বরাদ্দ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনকল্যাণের সামগ্রিক প্রতিফলন। এর মাধ্যমে সরকার নির্ধারণ করে কোন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং কীভাবে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হবে। কিন্তু স্বাস্থ্যখাতের সংকট নিরসনে সেই দূরদর্শী ও উদ্ভাবনী পরিকল্পনা কোথায়?
বাজট সামনে রেখে কিছু বিক্ষিপ্ত প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে—যেমন প্রতি জেলায় বিশেষায়িত আইসিইউ (ICU) স্থাপন, স্বাস্থ্য কার্ড বিতরণ, কিংবা তৃণমূল পর্যায়ে হেলথ স্ক্রিনিং চালু করা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নরসিংদীতে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং দেশের ৫টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এগুলো মূলত খণ্ডিত এবং বাজেটের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর বাইরে থাকা কিছু সাময়িক ‘ফানুস’, যা স্বাস্থ্যখাতের গভীর ক্ষতের ওপর সামান্য প্রলেপও দিতে পারবে না।
জনগণের জন্য সমতার ভিত্তিতে একটি অর্থসাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পথে আমাদের সামনে রয়েছে বহুমুখী জটিল প্রতিবন্ধকতা। সীমিত সম্পদের মধ্যে একটি উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার এই কঠিন পরীক্ষা পার হতে কোন বিষয়টিকে আগে গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারাটাই সাফল্যের প্রথম ধাপ।
সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (UHC) অর্জনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথ হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিকের একটি কাঠামো থাকলেও, নগর এলাকায় সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যত অনুপস্থিত। তাই নগর স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার আইনি সংস্কার এবং নগরে স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রাখা জরুরি। একই সঙ্গে, সরাসরি মাঠপর্যায়ে দক্ষ মিডওয়াইফের (ধাত্রী) উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি—মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার টেকসই সমাধান করা প্রয়োজন। সীমিত সম্পদের কারণে দেশের ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে এই সেবা চালু করা সম্ভব না হলেও, ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকা ৩,৭০০টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে (UHFWC) অবকাঠামো ও জনবল উন্নত করে নিবেদিত মিডওয়াইফের মাধ্যমে ‘২৪/৭’ (দিন-রাত) স্বাভাবিক প্রসব সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই কর্মীরাই পার্শ্ববর্তী কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর প্রসবপূর্ব (ANC) ও প্রসবোত্তর (PNC) সেবার ওপর নজরদারি রাখতে পারবেন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো জনবল কাঠামোর চরম ভারসাম্যহীনতা। বর্তমানে দেশে প্রায় ২.৮০ লাখ নার্সের ঘাটতি রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৪৪.৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন, যেখানে আমাদের আছে মাত্র ৮.৪ জন। তাই নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি, পারফরম্যান্স-ভিত্তিক প্রণোদনা এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে একীভূত করে প্রশাসনিক অপচয় রোধ করা এখন সময়ের দাবি।
পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জেলা হাসপাতালগুলোকে সব ধরনের বিশেষজ্ঞ ও বিশেষায়িত সেবা প্রদানে সক্ষম হতে হবে, যাতে আইসিইউ, সিসিইউ এবং আধুনিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার জন্য কোনো রোগীকে জেলা পার হয়ে রাজধানীতে আসতে না হয়। জেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে স্থানীয়ভাবে নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামত ও তাৎক্ষণিক জনবল নিয়োগের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে হবে, যেন তারা পুরো জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বনির্ভর নেতৃত্ব দিতে পারেন। এটি করা গেলে একটি কার্যকর ‘রেফারেল পদ্ধতি’ গড়ে উঠবে এবং ঢাকাসহ বড় শহরের টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় কমবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মাথাপিছু প্রয়োজন ১৪৬ ডলার। সেখানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৪৬ ডলার, যার ৭৭ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে (Out-of-pocket expenditure-OOP) খরচ করতে হয়। এই অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে বা অসুস্থতায় উপার্জনহীন হয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৫২ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংক মনে করে, ব্যক্তির নিজস্ব পকেট থেকে এই সরাসরি চিকিৎসা ব্যয়ই (OOP) সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায়। তারা জোরের সঙ্গে বলছে, আগাম-পরিশোধ (প্রিপেইড) ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ব্যক্তির নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় কমানো সম্ভব।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কি এমন কোনো উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব, যা ব্যক্তির নিজস্ব পকেট-ব্যয় (OOP) কার্যকরভাবে কমিয়ে আনবে?
স্বাস্থ্যখাত কে যদি কোনো একটি উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে বদলে দিতে পারে, তবে তা হলো একটি ‘সমন্বিত জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটাবেজ’। আসন্ন বাজেটে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এই ডেটাবেজ প্রতিটি নাগরিকের ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (EHR) সংরক্ষণ করবে, যা সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করবে এবং স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এই ডেটাবেজের আওতাতেই প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি করে ‘স্বাস্থ্য সঞ্চয় হিসাব’ (Health Savings Account) ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়কে অনুৎপাদনশীল খরচ হিসাবে দেখার সুযোগ নেই, এটি একটি সুস্থ-সবল শ্রমশক্তি ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ার দীর্ঘমেয়াদি মাধ্যম।
লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধানে আমরা লিখেছি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো নাগরিক বা পরিবার যেন নিঃস্ব না হয়, আরও দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত না হয়—এটিই হোক আমাদের মানবিক রাষ্ট্রীয় আকাঙ্ক্ষার মূল ভিত্তি।
স ম মাহবুবুল আলম চিকিৎসক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। বর্তমানে এভারকেয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও ল্যাব কো-অর্ডিনেটর। ই-মেইল: [email protected]