০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এই প্রথম জোড়া তারার বিস্ফোরণের প্রমাণ পেলেন বিজ্ঞানীরা

মহাকর্ষীয় বন্ধনে বাধা পড়ে কখনও জন্ম নেয় দ্বৈত তারামণ্ডল, যেন মহাজাগতিক বন্ধনে বাধা পড়ে এদের ‘জীবন’। তবে পৃথিবী হোক বা মহাশূন্য কোনো বাঁধনই চিরকাল স্থায়ী হয় না।

এই প্রথম জোড়া তারার বিস্ফোরণের প্রমাণ পেলেন বিজ্ঞানীরা
ধ্বংসের পর দুটি তারাই মহাশূন্যে রেখে গেছে উজ্জ্বল গ্যাসে ভরা এক একটি আলোক মেঘ, যা ‘নেবুলা’ বা নিহারিকা নামে পরিচিত। ছবি: নাসা

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Jul 2026, 02:53 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:26 PM

মহাবিশ্বের দুটি বড় সঙ্গী তারা ধ্বংস হয়ে একের পর এক সুপারনোভা বিস্ফোরণের বিরলতম প্রমাণ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

সূর্যের মতো মহাবিশ্বের বেশিরভাগ বড় আকারের তারা একা জন্মায় না, বরং ‘দ্বৈত তারামণ্ডল’ বা বাইনারি সিস্টেমে মহাকর্ষীয় বন্ধনে বাধা পড়ে জোড়ায় জোড়ায় জন্ম নেয়, যেন এক মহাজাগতিক বন্ধনে বাধা পড়ে এদের পুরো ‘জীবন’। 

তবে, পৃথিবী হোক বা মহাশূন্য কোনো বাঁধনই চিরকাল স্থায়ী হয় না।

রয়টার্স লিখেছে, মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো দ্বৈত তারামণ্ডলের দুটি তারারই এই চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞ ও নেবুলার উপস্থিতি সরাসরি প্রত্যক্ষ করলেন গবেষকেরা।

বিজ্ঞানীদের সন্ধান পাওয়া এ বড় আকারের দ্বৈত তারামণ্ডলের দুটি তারারই জ্বালানি প্রায় একই সময়ে শেষ হয়ে যায় এবং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুটিতেই ঘটে প্রলয়ঙ্করি বিস্ফোরণ।

ধ্বংসের পর প্রতিটি তারাই মহাশূন্যে রেখে গেছে উজ্জ্বল গ্যাসে ভরা এক একটি আলোক মেঘ, যা ‘নেবুলা’ বা নিহারিকা নামে পরিচিত। তারার এ ধরনের চূড়ান্ত ও মহাশক্তিশালী বিস্ফোরণকে বলা হয় ‘সুপারনোভা’।

এ জোড়া নেবুলার মধ্যে একটি আমাদের মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের অন্যতম সুপরিচিত নিহারিকা ‘জেলিফিশ নেবুলা’। সামুদ্রিক জেলিফিশের মতো পেঁচানো তাঁবুর আকৃতির বাহুগুলোর কারণেই এর এমন নামকরণ।

নাসার ‘ফার্মি গামা-রে স্পেস টেলিস্কোপ’-এর দীর্ঘ ১৬ বছরেরও বেশি সময়ের পর্যবেক্ষণ ডেটা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এ জেলিফিশ নেবুলার কাছেই দ্বিতীয় আরেকটি নেবুলার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। এ আবিষ্কারই জেলিফিশ নেবুলাকে এক মহাজাগতিক ‘জোড়া বিপর্যয়ের’ অংশ হিসেবে সঠিকভাবে উন্মোচিত করেছে।

জেলিফিশ নেবুলার দাপ্তরিক নাম ‘আইসি ৪৪৩’। গবেষকদের ধারণা, এটি তৈরি হয়েছিল সূর্য থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ গুণ ভরের একটি তারার জীবনাবসানে ঘটা বিস্ফোরণ থেকে। আর দ্বিতীয় নেবুলাটির দাপ্তরিক নাম ‘জি১৮৯.৬+৩.৩’। এটি তৈরি হয়েছে প্রথম তারাটিরই সঙ্গী বা দ্বৈত তারাটির বিস্ফোরণে, যা ভরে সূর্যের অন্তত ২০ গুণ ছিল।

জীবদ্দশায় এ দুটি তারায় আমাদের সূর্যের চেয়ে অন্তত দশ হাজার গুণ উজ্জ্বল ছিল। তবে জোড়া প্রলয়ের পর এরা এখন কেবল ঘন ও সংকুচিত তারাবশেষ, যাকে বলে ‘নিউট্রন স্টার’।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে মিথুন তারামণ্ডলে এই নেবুলা দুটি অবস্থিত। আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।

‘বিরল সুযোগ’

বড় আকারের তারা দিয়ে গঠিত দ্বৈত তারামণ্ডল কীভাবে বিবর্তিত হয় এ আবিষ্কারের মাধ্যমে তা বোঝার এক অনন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এ।

এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পোস্টডক্টরাল ফেলো মিল্টিয়াডিস মিচাইলিডিস বলেছেন, “দুটি বড় আকারে তারার জন্ম, এদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রভাব, পর পর দুটি সুপারনোভা বিস্ফোরণ ও পরবর্তীতে অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ এক দ্বৈত তারার পুরো বিবর্তনীয় ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করার জন্য এ পদ্ধতিটি আমাদের এক দুর্লভ সুযোগ করে দিয়েছে।

“বেশিরভাগ বড় তারার জন্মই বাইনারি সিস্টেমে জোড়ায় জোড়ায় হয়। তবে এর আগে এমন কোনো জোড়া তারামণ্ডল খুঁজে পাওয়া যায়নি, যার দুটি তারাতেই সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটেছে ও এদের স্পষ্ট ধ্বংসাবশেষ মহাশূন্যে দেখা যাচ্ছে।”

কিছু বড় তারার জন্ম তিন বা তারও বেশি তারাওয়ালা জটলাতেও হতে পারে। এ দুটি নেবুলা উত্তপ্ত গ্যাস, ত্বরান্বিত কণা ও সুপারনোভা বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছড়িয়ে পড়া আন্তঃনক্ষত্রীয় উপাদানের বড় ও প্রসারমান কাঠামো।

মহাবিশ্বের এসব তারা জীবনযাপন অনেকটা ‘রক স্টারদের’ মতো, অর্থাৎ প্রচণ্ড উজ্জ্বল হয়ে আত্মপ্রকাশ করে, চরম উল্লাসে জীবন কাটায় ও খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। এদের আয়ু কেবল কয়েক লাখ বছর, যা সূর্যের আনুমানিক ১ হাজার কোটি বছরের দীর্ঘ আয়ুষ্কালের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

ড. মিচাইলিডিস বলেছেন, “বড় কোনো তারার পাশে অন্য এক সঙ্গীর উপস্থিতি কীভাবে এর পুরো বিবর্তনকে বদলে দেয় তারা-পদার্থবিজ্ঞানের এ বড় প্রশ্নটি বোঝার ক্ষেত্রে এমন জোড়া ব্যবস্থা সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

“এতদিন পর্যন্ত তারার এসব চূড়ান্ত বিবর্তনীয় পর্যায় বোঝার জন্য আমাদের প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হত কেবল কাল্পনিক তাত্ত্বিক মডেল ও কম্পিউটারের সিমুলেশনের ওপর।”

নতুন আবিষ্কৃত নেবুলার সঙ্গের তারাটিই প্রথমে বিস্ফোরিত হয়েছিল এবং সেই তীব্র ধাক্কায় তার সঙ্গী তারাটি কক্ষপথ থেকে ছিটকে দূরে সরে যায়। গবেষকদের অনুমান, প্রথম ও দ্বিতীয় বিস্ফোরণের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার বছর সময় পার হয়েছিল।

মিচাইলিডিস বলেছেন, “প্রথম বিস্ফোরণটি এদের দ্বৈত বন্ধন ভেঙে দেয় এবং বেঁচে যাওয়া সঙ্গী তারাটি নিজের মতো মহাশূন্যে ছুটে চলতে থাকে, যতক্ষণ না তার নিজেরও বিস্ফোরণ ঘটে।”

একসময় তারা দুটি একে অপরকে খুব কাছ থেকে প্রদক্ষিণ করত। সম্ভবত পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার দূরত্বের কেবল কয়েক গুণ দূরত্বে। তবে পর পর দুটি প্রলয়ঙ্করি বিস্ফোরণের পর এদের কেন্দ্রের দূরত্ব এখন বেড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ আলোকবর্ষে গিয়ে ঠেকেছে।

বাইনারি সিস্টেমটি অক্ষত থাকাকালীর তারা দুটি এতটাই কাছাকাছি ছিল যে এদের মধ্যে ‘    ভর স্থানান্তর’ বা এক তারা থেকে অন্য তারায় উপাদানের আদান-প্রদান ঘটাও বেশ স্বাভাবিক।

তবে প্রথম তারার বিস্ফোরণই সরাসরি দ্বিতীয় তারার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে কি না তা এখনও নিশ্চিত নন মিচাইলিডিস।

“প্রথম সুপারনোভা বিস্ফোরণটি যখন ঘটেছিল ততদিনে হয়ত দ্বিতীয় তারাটির আয়ুও একদম শেষ পর্যায় এসে পৌঁছেছিল।”