Published : 28 Jul 2026, 02:36 PM
‘দিনে এক গ্লাস রেড ওয়াইন পান করা হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো’, কয়েক দশক ধরে এই ধারণা বিশ্বজুড়ে বেশ প্রচলিত। বহু মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ বা সাধারণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে, অল্প মাত্রায় ওয়াইন পানকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা এই ধারণাকে সম্পূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াইন বা অ্যালকোহলকে স্বাস্থ্যকর প্রমাণ করার পেছনের বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর সততা এবং অর্থায়ন নিয়ে।
সায়েন্সডাইরেক্ট ডটকম’য়ে প্রকাশিত, ‘অ্যালকোহল, কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ফান্ডিং’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আসলে বিগত বছরগুলোতে ওয়াইনের উপকারিতা নিয়ে যে গবেষণাগুলো সাড়া ফেলেছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশের পেছনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে বৈশ্বিক অ্যালকোহল ও ওয়াইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কোটি কোটি টাকার ফান্ড বা অর্থায়ন ছিল।
নিউইয়র্ক টাইমসের ‘ইজ অ্যালকোহল গুড ফর ইউ: অ্যান ইন্ডাস্ট্রি ব্যাকড স্টাডি সিকস অ্যান্সারস’ প্রতিবেদন-সহ বিভিন্ন চিকিৎসা সাময়িকীগুলোর নানান অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মদ্যপানকে ‘হার্ট-ফ্রেন্ডলি’ বা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী প্রমাণ করার জন্য বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞানীদের স্পন্সর করতো, যা গবেষণার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যে প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণায় গোপনে অর্থায়ন করেছিল
চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রবিদদের তথ্যানুসারে, নিউইয়র্ক টাইমস এবং বিজনেস ইনসাইডার-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অ্যালকোহল ও ডিস্ট্রিলারি জায়ান্টরা মদ্যপানের কথিত স্বাস্থ্য উপকারিতা বা ‘মডারেট ড্রিংকিং’ (পরিমিত মদ্যপান) এর প্রচারণা চালাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
এই তালিকায় থাকা প্রধান বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে: অ্যানহাইজার-বুশ ইনবেভ, কার্লসবার্গ, ডিয়াজিও, হেইনেকেন, পারনড রিকার্ড।
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ-এর পরিচালিত মদ্যপানের উপকারিতা বিষয়ক একটি বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণা পরবর্তী সময়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। কারণ হিসেবে জানানো হয়, সেই গবেষণার অধিকাংশ অর্থায়ন হয়েছিল পরোক্ষভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে।
২০২৫ সালের আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির গবেষণা
ওয়াইনের এই তথাকথিত ‘উপকারিতা’র বেলুন পুরোপুরি ফুটো হয়ে যায় যখন স্বাস্থ্য সংস্থা আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি এবং আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যান্সার রিসার্চ, তাদের ২০২৫ সালের বার্ষিক বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে।
‘জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘দ্য ল্যানসেট অনকোলজি-তে প্রকাশিত গবেষণার তথ্যানুসারে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘বিশদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে- মদ্যপান বা অ্যালকোহল সরাসরি মানুষের শরীরে ৭টি ভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের জন্ম দেয়। এই তালিকায় রয়েছে: মুখগহ্বর, গলা, স্বরযন্ত্র, খাদ্যনালী, স্তন, লিভার বা যকৃৎ এবং কোলন বা মলাশয়ের ক্যান্সার।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির জ্যেষ্ঠ রোগতত্ত্ববিদ ডা. জোয়ান ফ্রিডেনহেইম, বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স নিউজ’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত কড়া ভাষায় একটি সতর্কবার্তা দেন।
তিনি বলেন, “জনসাধারণের এটা খুব স্পষ্টভাবে জানা উচিত যে, মদ্যপানের বা অ্যালকোহলের এমন কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই যা শরীরের ক্ষতি করে না। যেকোনো পরিমাণ অ্যালকোহল গ্রহণই ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ঘটনা সরাসরি মদ্যপানের কারণে ঘটে থাকে।
‘যেকোনো পরিমাণ অ্যালকোহলই ক্ষতিকর’, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অবস্থান
ওয়াইন বনাম ক্যান্সারের এই দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করতে বোস্টনের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এই বছরের জুন মাসে নতুন সমন্বিত ‘মেটা-অ্যানালিসিস’ বা বিশ্বব্যাপী হওয়া গবেষণার সমন্বিত রূপ প্রকাশ করে।
‘হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সেই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যালকোহল সরাসরি মানুষের শরীরে ‘কার্ডিওমায়োপ্যাথি’, ‘লিভার সিরোসিস’-সহ অন্তত ৬২টি ভিন্ন ভিন্ন রোগের মূল কারণ হিসেবে কাজ করে।
জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এলিজাবেথ প্ল্যাটজ, এই বিষয়ে একমত পোষণ করে স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “অ্যালকোহলের সবচেয়ে নিরাপদ মাত্রা হল, ‘শূন্য’।”
মানে, দিনে মাত্র এক গ্লাস বা এক ফোঁটা অ্যালকোহল গ্রহণ করলেও, সেটা শরীরে সেলুলার বা ডিএনএ স্তরে ক্ষতি করতে শুরু করে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অ্যালকোহলে থাকা ইথানল যখন শরীরে প্রবেশ করে, তখন সেটা মেটাবোলাইজড বা ভেঙে ‘অ্যাসিটালডিহাইড’ নামক বিষাক্ত যৌগে পরিণত হয়। এই রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি কোষের ডিএনএ ধ্বংস বা পরিবর্তন করে ফেলে, যা পরে ক্যান্সারে রূপ নেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যা জানাচ্ছে
চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিষ্কার অবস্থান হল: অ্যালকোহল একটি গ্রুপ-১ কার্সিনোজেন। অর্থাৎ এটি সরাসরি মানবশরীরে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান, ঠিক যেমনটা সিগারেট বা অ্যাসবেস্টস।
এই তথ্য জানিয়ে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়: অ্যানহাইজার-বুশ, হেইনেকেন বা ডিয়াজিও-র মতো মদ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন করা পুরানো গবেষণাগুলো মূলত মদ্যপানের ক্ষতিকর দিকগুলোকে আড়াল করে আংশিক সত্য প্রচার করেছিল।
তবে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, সুস্থ হৃদযন্ত্র এবং দীর্ঘায়ু পাওয়ার জন্য ওয়াইন বা অন্য কোনো অ্যালকোহল পানের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই; বরং সুষম খাদ্য ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমই এর একমাত্র বিকল্প।
আরও পড়ুন
বৈবাহিক অবস্থা থেকে বাড়তে পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি
বৈবাহিক অবস্থা থেকে বাড়তে পারে ক্যান্সারের ঝুঁকি
সানস্ক্রিন ব্যবহার থেকে ত্বকে ক্যান্সার হওয়া বিষয়টা কতখানি সত্য?