Published : 11 Jun 2026, 11:49 AM
‘বাজেট আসছে’–শুনলেই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।
মে মাস আসলেই শুরু হয় আরেক দফা বিড়ি-সিগারেটের দামবৃদ্ধি এবং চারদিকে বন্ধু-বান্ধবের শুকনো মুখ! এ প্রসঙ্গে আমাদের দুই গ্রাম পরের হালিম কাকার কৌশলটা কিন্তু মন্দ ছিল না! সে বছর বাজেটের মাস দুয়েক আগে ছিল জমজমাট ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচন শেষে আবিষ্কার করা গেল যে, হালিম কাকার খাটের নিচে মাটির কলসিভর্তি বিড়ি! শুকনো ত্যানা দিয়ে কলসির মুখ আটকানো।
ঘটনা কী, ঘটনা কী? চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। জানা গেল, সামনেই বাজেট! অবধারিতভাবেই বিড়ির দাম আরেক দফা বাড়বে। ফলে আপৎকালীন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন দলের মিছিলে অংশগ্রহণ বাবদ বিড়ির এই মজুত! ফ্রিতে পাওয়া বিড়ির মজুত করে হালিম কাকা তো ধরা পড়লেন; কিন্তু বাজেটকে সামনে রেখে রুই-কাতলারা অবৈধ সম্পদের যে মজুত রাখেন, তাদের নামধাম কখনোই জানার সুযোগ হয় না আমাদের! এবারও জানা যাচ্ছে, কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই কালো টাকা সাদা করা যাবে। তবে বিড়ির দাম যে বাড়বে না, তার নিশ্চয়তা অবশ্য অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন!
বাজেট নিতান্তই বড়দের জিনিস, বড়লোকদেরও বটে! জ্ঞানী-গুণীদের কারবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক-বাজেট বক্তৃতা হয়, সেখানে আবার জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও হয়। টেলিভিশনগুলো বেছে বেছে চুল-দাড়ি পাকাদের ডাকে। তারা কী কী যেন ‘ডিমান্ড’ আর ‘সাপ্লাই’ নিয়ে কপচায়। পত্রিকার পাতায় চক্রাবক্রা আঁকাআঁকি শুরু হয়। ওগুলোকে নাকি ‘গ্রাফ’ বলে! আর দরিদ্র মানুষেরা বোঝে, অর্থমন্ত্রীর হাতের ওই কালো ব্রিফকেস মানে জিনিসপত্রের আরেক দফা দাম বাড়বে। যেহেতু বাজার দৌড়াচ্ছে, ফলে তাকেও এখন দৌড়াতে হবে!
তবে অর্থমন্ত্রী আজ বিকেলে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেটটি ঘোষণা করবেন, সেটি যে বাজেট, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বুশের মহান বাণী আছে। তিনি বলেছেন, ‘এটা নিশ্চয়ই একটা সত্যিকারের বাজেট, কারণ এতে অনেক সংখ্যা দেখা যাচ্ছে।’
বাজেট মানে করের বোঝা! আয় করবেন আপনি, আর কেটে রাখবে সরকার!
ছোট্ট ছেলেটা বিধাতার কাছে রোজ প্রার্থনা করে, ‘হে প্রভু, আমাকে মাত্র ৫০০টা টাকা দাও। আমার আর কিছু চাই না।’ কিন্তু টাকা আর আসে না। তারপর বুদ্ধি করে একদিন সে বিধাতাকে একটা চিঠি লিখল। সেই চিঠি ডাকঘরে পড়েই রইল কিছুদিন। তারপর একদিন সহৃদয় কোনো একজন পড়ে থাকা চিঠিটা খুলে পড়লেন এবং পাঠিয়ে দিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। আশ্চর্য ঘটনা হলো, সেই চিঠি গিয়ে পড়ল শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীর হাতে। তিনিও মজা করে ২০০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন, সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর একটা স্বাক্ষর। ২০০ টাকা পেয়ে মহাখুশি ছেলেটি হাত তুলে মোনাজাত ধরে অভিযোগ করল, ‘তোমাকে অশেষ ধ্যবাদ। কিন্তু টাকাটা তুমি অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে কেন পাঠালে? তিনি তো ৩০০ টাকা ট্যাক্স কেটে রেখেছেন!’
ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করলে বোঝা যায়, দুনিয়ার তাবৎ কৌতুক মনে হয় অর্থনীতিবিদদের নিয়েই। একজন গণিতবিদ, একজন হিসাবরক্ষক ও একজন অর্থনীতিবিদ আবেদন করেছেন একটা পদের জন্য। তারা একে একে হাজির হলেন ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে।
‘দুই আর দুই যোগ করলে কত হয়?’—প্রশ্নকর্তা গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করছেন।
গণিতবিদ বললেন, ‘দুই আর দুইয়ে চার হয়।’
হিসাবরক্ষক বললেন, ‘দুই আর দুই যোগ করলে গড়ে চার আসবে। তবে টেন পারসেন্ট এদিক-ওদিক হতে পারে।’
আর অর্থনীতিবিদ ঝুঁকে বসলেন প্রশ্নকর্তার দিকে, ‘স্যার, আপনিই বলুন, দুই আর দুইয়ে ঠিক কত হলে আপনার সুবিধা হয়!’
অর্থনীতিবিদদের বুদ্ধিশুদ্ধিও সর্বজনবিদিত! তিন গণিতবিদ আর তিন অর্থনীতিবিদ ট্রেন ভ্রমণে বেরিয়েছেন। তিন গণিতবিদ তিনটা টিকিট কিনলেও, তিন অর্থনীতিবিদ মিলে টিকিট কিনলেন মোটে একটা। গণিতবিদেরা তো অবাক! টিটি যখন চেক করতে আসলেন, তিন অর্থনীতিবিদ দৌড়ে বাথরুমে ঢুকলেন। টিটি বাথরুমের দরজা ধাক্কালেন, আর একজন হাত বের করে টিকিট দেখালেন। টিটি চেক করে চলে গেল। পরদিন গণিতবিদেরা একই কৌশল ধরল আর অর্থনীতিবিদেরা টিকিটই কাটল না। টিটি আসছে দেখে গণিতবিদেরা দৌড়ে বাথরুমে ঢুকলেন। দরজার বাইরে টোকা পড়ল। একজন টিকিট বের করে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ঘাপটি মেরে থাকা এক অর্থনীতিবিদ সেই টিকিট নিয়ে পাশের বাথরুমে ঢুকে গেলেন।
যাই হোক, আনন্দের কথা হলো আমাদের অর্থমন্ত্রী মোটেও অর্থনীতির ছাত্র নন; তিনি হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র। এর আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। সাহিত্যের ছাত্র হয়ে দেশের বাজেট ঘোষণার রেকর্ড করেছিলেন তিনি। সংসদে মোট ১২ বার বাজেট পড়েছেন, তার মধ্যে একটানা ১০ বার বাজেট ঘোষণা করে বিরল এক রেকর্ড তার দখলে।
বেশ লম্বা ভাষণ দিতেন তিনি। এ নিয়ে আমরা খুব হাসাহাসি করতাম, বিশেষ করে বাজেট বক্তৃতায়। ওদিকে অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে ‘খুব মনোযোগ’ দিয়ে বাজেট বক্তব্য শোনা নিজের দায়িত্ব বলে মনে করতাম কিনা! এ নিয়ে পরে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, "বক্তৃতা লম্বা না খাটো, সেটা কোনো বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো, সেটা কার্যকর কিনা। যেমন বিড়াল সাদা না কালো, সেটা কোনো বিষয় নয়; বিষয় হলো ইঁদুর ধরে কিনা।"
রেকর্ড অনুযায়ী এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। পত্রপত্রিকায় দেখলাম, ‘দুঃসাহসী/উচ্চাভিলাষী’ বাজেট নিয়ে আসছেন অর্থমন্ত্রী! আগে দেখতাম পত্রিকায় খবর হতো, ‘আরো সাহসী মুনমুন-ময়ূরী’, ‘সানি লিওন এবার আরো সাহসী চরিত্রে’। কিছুদিন পর সেই সাহসের মানেটাও বোঝা যেত! আশা করি অর্থমন্ত্রীর ব্যাপারটাও বোঝা যাবে!
বাজেট আসলে প্রতিবারই মনে হয়, এবার ভালো কিছু হবেই হবে। দারিদ্র্যের হার কমবে, গৃহহীন ঘর পাবে ইত্যাদি। যারা আশাবাদী, তারা আশায় থাকেন। ‘গরিবদের আর যত কষ্টই থাক না কেন, একটা বড় সুবিধা হলো, গরিব থাকার জন্য কোনো খরচা লাগে না।’ স্কটল্যান্ডের এই প্রবাদটা মানলে অবশ্য আক্ষেপ কমে আসে। অথবা আদার ব্যাপারির জাহাজের খবর না নেওয়ার মতোই, দরিদ্র মানুষদের বাজেট নিয়ে মাথা না ঘামানোই মঙ্গল!
তার চেয়ে চলুন আরেকটা গল্প শুনি—হঠাৎ লোকসানের মুখে পড়া এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কর্মচারীদের বার্ষিক বোনাসের বাজেট বাঁচাতে একটা নোটিশ টাঙাল—‘আপনি যদি দামি কাপড় পরে অফিসে আসেন, তাহলে আমরা বুঝব আপনি খুবই সচ্ছল; বোনাসের এই সামান্য ক’টা টাকা না হলেও আপনার চলবে। আপনি যদি আজেবাজে কাপড় পরে অফিসে আসেন, তাহলে আমরা বুঝব আপনি ফালতু খরচ করেন না; তাই বার্ষিক বোনাসের টাকা আপনাকে দেওয়া হবে না। আপনার জামা-কাপড়ে যদি মদের গন্ধ, মাংসের ঝোল লেগে থাকে আপনি বোনাস পাবেন না? কেননা আপনি সেটাও উড়িয়ে দেবেন। আর আপনি যদি একদম ঠিকঠাক কাপড় পরে অফিসে আসেন, সে ক্ষেত্রে আমরা বুঝব আপনি বেশ ভালোই আছেন; তাহলে বোনাসের টাকা নিয়ে করবেনটা কী, শুনি?’
সারমর্ম হলো, এই যে বাজেট নিয়ে এত বাগাড়ম্বর, এর সবই ধনীদের জন্য; যারা ভালো আছে তাদের জন্য। আর যাদের করের টাকায়, ভ্যাটের টাকায় এই বাজেট, তারা রাস্তায় হয়রানি হবে, প্রতিবাদ করতে গেলে মার খাবে। আর যারা এসব খেতে চান না তাদের জন্য চুপ থাকাটাই মঙ্গল!
১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পর, বাংলাদেশের প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন পেশ করা সেই বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। সেই হিসেবে এবারের বাজেটের আকার অন্তত ১২০০ গুণেরও বেশি বড়। সে বছর বাজেটের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং অর্থনীতিকে টেনে তোলা। আর এবারের বাজেটের মূল দিক হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন করা। ৫৫ বছরে আমাদের অগ্রগতি নেহায়েত কম নয়।
সেই বিখ্যাত ছড়া আউড়াতে আউড়াতে প্রাক-বাজেট লেখা শেষ করা যাক:
‘বাজেট বাজেট মরার বাজেট
বাজেট আলুর দম
বড়র পাতে পড়ল বেশি
ছোটর পাতে কম।’
সবাইকে বাজেট মোবারক!
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]