Published : 29 Aug 2025, 01:52 AM
চব্বিশের জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনের শুরু থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা সামনের কাতারে থাকলেও এক বছর পরে এসে ভিন্ন এক চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে তাদের উপস্থিতি অনেক কম।
অর্ধেক ছাত্র আর অর্ধেক ছাত্রীর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জাকসু নির্বাচনে প্রার্থী তালিকায় মেয়েরা যেমন পিছিয়ে, তেমনি ছাত্রী হলেও তারা পুরোপুরি সক্রিয়ও নয়।
জাকসুর মোট প্রার্থীর ২৫ শতাংশ ছাত্রী, বাকি ৭৫ শতাংশই ছাত্র। ভিপি পদে কোনো নারী শিক্ষার্থী প্রার্থী হননি। জিএস পদে ১৫ জনের প্রার্থীর মধ্যে মেয়ে দুইজন। আর চারটি পদে কোনো মেয়ে প্রার্থেই নেই। সবগুলো হল সংসদ মিলিয়ে মোট প্রার্থীর ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ ছাত্রী। আর মেয়েদের হলগুলোর পাঁচটিতে ১৫ পদে প্রার্থীই নেই।
মেয়েদের এমন এ অবস্থা কেন? অনেকেরই প্রশ্ন। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের জায়গায় আসতে ‘অনীহার’ কারণগুলোও তারা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন।
তাদের মতে, ‘সাইবার বুলিংয়ের’ মতো ঘটনা জাকসু নির্বাচনে মেয়েদের নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণ।
অনেকের আশঙ্কা, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে ভোটকেন্দ্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
জাকসু নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ও হল সংসদে মোট ৭৪০টি মনোয়নপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন পদে ৫৫৫ জন ছাত্র প্রার্থী হয়েছেন; আর ছাত্রী ১৮৫ জন।

ভিপি পদে ছাত্রী নেই
জাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ২১ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে এর মধ্যে কোনো ছাত্রী নেই।
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৫ প্রার্থীর মাত্র দুজন ছাত্রী। তবে শুধু সংরক্ষিত নারী সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রার্থী হয়েছেন ১০ জন।
এ ছাড়া সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক, ক্রীড়া সম্পাদক, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক এবং পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক- এই চারটি পদে ৩৮ জন মনোনয়ন দাখিল করলেও তাদের মধ্যে কোনো নারী প্রার্থী নেই।
নাট্য সম্পাদক, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক এবং স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক- এই তিনটি পদে ৪৬ ছাত্রের বিপরীতে মাত্র তিনজন ছাত্রী প্রার্থী হয়েছেন।
পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্পাদক পদে ১৪ জন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে নয়জন এবং সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ১১ প্রার্থীর মধ্যে প্রতিটি পদে দুজন করে ছাত্রী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এ ছাড়া নির্বাচনে ছয়টি সংরক্ষিত পদ থাকলেও তাতে ছাত্রীদের অংশগ্রহণে উৎসাহ দেখা যায়নি। সহসম্পাদক (এজিএস), সহক্রীড়া সম্পাদক, সহসমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক এবং তিনটি কার্যকরী সদস্যসহ সংরক্ষিত ছয় পদে মনোনয়ন জমা পড়েছে ৪৩টি।
হলে হলে পদ আছে, প্রার্থী নেই
হল সংসদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ১৫টি পদে নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু ছাত্রী হলে তুলনামূলক প্রার্থী কম দেখা গেছে।
ছাত্রীদের ১০টি এবং ছাত্রদের ১১টি মিলে ২১টি হলে ৩১৫টি পদের বিপরীতে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৪৬৭ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৩৪০ ও ছাত্রী ১২৮ জন।
হল সংসদে মোট প্রার্থীর ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ ছাত্রী।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল, সুফিয়া কামাল হল, বেগম খালেদা জিয়া হলসহ অন্তত পাঁচ হল সংসদের ১৫টি পদে প্রার্থী পাওয়া যায়নি। ছাত্রীদের বাকি হলেও পদের তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অনেক কম। একটিতে সমান সমান।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ছয়জন, ১৩ নম্বর ছাত্রী হলে ছয়জন, সুফিয়া কামাল হলে ১০ জন, বেগম খালেদা জিয়া হলে ১১ জন এবং প্রীতিলতা হলে ১৩ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
ফজিলাতুন্নেছা হলে ১৫ জন, জাহানারা ইমাম হলে ১৬ জন এবং ১৫ নম্বর ছাত্রী হল, বীরপ্রতীক তারামন বিবি হল ও রোকেয়া হলে ১৭ জন করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, এসব হলে বেশির ভাগ পদে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেকে বিজয়ী হতে চলেছেন।
সংগঠনে ছাত্রীর হিস্যা
এদিকে নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কোনো প্যানেলে শীর্ষ দুই পদে নারী প্রার্থী দেখা যায়নি। প্রতিটি প্যানেলে সংরক্ষিত সহসম্পাদক (নারী) ছাড়া সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন ছাত্ররা।
ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল ও ছাত্রদলের সম্ভাব্য প্যানেলের ছয় ছাত্রীই সংরক্ষিত পদের।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সমর্থিত প্যানেল ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ এ আট ছাত্রীর ছয়জনই সংরক্ষিত পদে প্রার্থী হয়েছেন।
সংরক্ষিত পদে আবদুর রশিদ জিতু-শাকিল আলী সম্ভাব্য প্যানেলে রয়েছেন চারজন ছাত্রী।
সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত নয়টি সংগঠন ও ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক) সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলে ছাত্রী আছেন সর্বাধিক ১২ জন।

‘ট্যাগিং-বুলিং দায়ী’
বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলছিলেন, “দীর্ঘদিন ধরে জাকসু নির্বাচন না হওয়ায় এর গুরুত্ব নারী শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায়নি। গত বছরের ৫ অগাস্ট থেকে মূলধারার রাজনীতিতে নারীরা ব্যাপকভাবে কটূক্তি ও তাদের শরীর নিয়ে বিদ্রূপের শিকার হয়েছেন। এমনকি সিনিয়র নারী রাজনীতিবিদরাও অনলাইনে হয়রানির মুখে পড়েছেন, যা অনেক তরুণীকে ব্যথিত করেছে; তাদের রাজনীতি-নির্বাচন এসবে অংশগ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করেছে।”
“জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রতিবাদের মানসিক দৃঢ়তা থাকলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তারা ততটা সক্রিয় নন।”
দর্শন বিভাগের ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী তাম্মি রহমানের ভাষ্য, “রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীদের মূল্যায়ন আমরা নিশ্চিত করতে পারি না। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নারীদের আমরা বিভিন্ন আন্দোলনে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে দেখেছি।
“আন্দোলনের পরে তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এটিও নারীদের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বড় একটি কারণ।”
আরেক শিক্ষার্থী মেহজাবিন হাসান হৃদি মনে করেন, “নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কম, এর একটা কারণ বিদ্যমান ট্যাগিং এবং বুলিংয়ের সংস্কৃতি। অনেকক্ষেত্রেই নারীদের জন্য রাজনীতি মানে শুধু মত নয়, সেই সঙ্গে মানসিক ধকলও।
“আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়ানো সংবাদগুলোর কমেন্ট বক্স যদি দেখে থাকেন, খেয়াল করবেন- পান থেকে চুন খসলে বিপরীত মতের ব্যক্তিরা একজন নারীকে আক্রমণ করেই থাকে তার চরিত্রের দিকে নোংরা ভাষ্যের আঙুল তুলে।”

হৃদি বলেন, “আর, অযাচিত লেবেলিং তো আছেই, নারী-পুরুষ উভয়েই এর শিকার। ফলে, ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের আগ্রহ অনেকেই হারিয়ে ফেলেন ট্যাগিং-বুলিং সংস্কৃতির মানসিক চাপ ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতার ভয়ে।”
তবে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের ভিপি প্রার্থী অদ্রি অঙ্কুর বলেন, “জাকসুর বিভিন্ন প্যানেল সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, কার প্যানেলে কতজন নারী, কতজন পুরুষ রয়েছেন- এই নিয়ে এক প্রকার প্রতিযোগিতা হচ্ছে।
“আমরা মনে করি, এখানে কতজন নারী, পুরুষ, আদিবাসী প্যানেলে থাকছেন এটা কোনো প্রতিযোগিতার বিষয় না। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে যারা যোগ্য প্রতিনিধি তাদেরই নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের লক্ষ্য করে যে সাইবার বুলিং ও আপত্তিকর মন্তব্য হয় সেসব সাইট বন্ধের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনন বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলে জিএস প্রার্থী শরণ এহসান৷
বাগছাসের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র নাদিয়া রহমান অন্বেষা বলেন, “এই নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ কম হওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল- ৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে নারীদের জন্য একটা ‘স্বস্তির রাজনৈতিক পরিবেশ’ তৈরি করতে পারিনি।
“এ ছাড়া সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলে বিভিন্ন সময়ে নারীদের সাইবার বুলিং এবং স্লাটশেমিংয়ের শিকার হতে হয়। এ ছাড়া বিগত ১৬ বছর আমরা যে নোংরা রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখেছি সেটা মোটেও নারীদের ভালো অভিজ্ঞতা দেয়নি। তাই এই নির্বাচনে নারীরা অনাগ্রহ দেখাচ্ছে বলে আমি মনে করি।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক রায়হান রাইন বলেন, “জাকসুতে বিশেষ করে হল সংসদগুলোতে পদের তুলনায় প্রার্থী কম হওয়ার একটা সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, এরই মধ্যেই যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদেরকে বিভিন্নভাবে হেয় করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “গণঅভ্যুথান পরবর্তী সময়ে ডানপন্থি রক্ষণশীলদের উত্থানের পর এই ধরনের আক্রমণ বেড়েছে৷ আর এসব আক্রমণ বাড়ার পেছনে বিভিন্ন সময়ে আক্রমণকারীকে পুরষ্কৃত করার মতো ঘটনাগুলো ভূমিকা রাখছে।”
বিভিন্ন আন্দোলনের সময়ে আমরা নারীদেরকে পুরুষদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে দেখেছেন জানিয়ে রায়হান রাইন বলেন, “কিন্তু আন্দোলন পরবর্তীতে নারীদেরকে বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এটিও সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে।”
নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য
সর্বশেষ জাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯২ সালে। গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে প্রায় ৩৩ বছর পরে জাকসু নির্বাচন আয়োজনে রোডম্যাপ ঘোষণার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অন্তত দুইবার পিছিয়ে আসে। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রোডম্যাপ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১০ জানুয়ারি একটি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করলেও নানা ঘটনার পর ৩০ এপ্রিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩১ জুলাই। পরে কয়েক দফা পেছানোর পর নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয় আগামী ১১ সেপ্টেম্বর।
সেই তফসিল অনুযায়ী, ১৮, ১৯ ও ২১ অগাস্ট প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হয় ২১ থেকে ২৪ আগস্ট এবং খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয় ২৫ অগাস্ট।
এ ছাড়া, মনোনয়নপত্রের বৈধতার বিষয়ে এবং বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন গ্রহণ করা হয় ২৬ অগাস্ট (মঙ্গলবার)। আপিলের শুনানি হয় ২৭ অগাস্ট (বুধবার)।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন বৃহস্পতিবার। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে শুক্রবার।
আর ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। একইদিনে সন্ধ্যা ৭টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুন: