১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘মা রাস্তায় গুলি হচ্ছে, এখন ফোন রাখো’… তারপর নিস্তব্ধ

“আমার ছেলে তো শ্রমিক ছিল। কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাহলে কী দোষে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো?”

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2024, 10:39 AM

Updated : 10 Sep 2026, 12:13 PM

এতিম নুরনাহার বেগমকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. ফয়েজ। তাদের সংসার আলো করে ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তান আসে। ঢাকার ভাড়া বাসায় ভালোই কাটছিল তাদের দাম্পত্য জীবন।

পৃথিবীতে নুরনাহারের একমাত্র আপনজন ছিল তার স্বামী। সেই আপনজনকে কেড়ে নিয়েছে গুলি। নিভে গেছে ৩২ বছর বয়সী ফয়েজের তাজা প্রাণ। এখন তাকে হারিয়ে দিশেহারা গোটা পরিবার। 

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের পশ্চিম ঝাউডগি গ্রামের কাঠমিস্ত্রি আলাউদ্দিন ও সবুরা বেগম দম্পতির সন্তান ছিলেন ফয়েজ। 

ঢাকার যাত্রাবাড়ী সাইনবোর্ড এলাকায় ২১ জুলাই সন্ধ্যায় গুলিতে তার মৃত্যু হয়। ২২ জুলাই জানাজা শেষে ফয়েজকে গ্রামের বাড়ির পাশে দাফন করা হয়।

মৃত্যুর ঠিক আগে মা সবুরা বেগমের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল ফয়েজের। সে স্মৃতি এখনও দগদগে মায়ের মনে।     

ছেলের কথা বলতে গিয়ে ডুকরে ওঠেন সবুরা বেগম। বলছিলেন, “ঘটনার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি ফয়েজকে কল দিয়েছিলাম। সে বলছিল, কাজ শেষে বাসায় যাচ্ছে। এরপর বলে, মা রাস্তায় অনবরত গুলি হচ্ছে। এখন ফোন রাখো। 

“এরপর আর তার কথা শুনতে পাইনি। সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বারবার কল দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।”

কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

তিন ভাইবোনের মধ্যে ফয়েজ ছিল সবার বড়। তার কবরের পাশে বার বার ছুটে যাচ্ছেন মা সবুরা। আর ছেলের শোকে হাউমাউ করে কাঁদছেন। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও খুঁজে পাচ্ছেন না।

ফয়েজের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি ঢাকায় স্যানিটারি মিস্ত্রি হিসেবে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংসারে জন্ম ফয়েজকে অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে মালদ্বীপ যেতে হয়েছিল। এরপর ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। ফের পরিবারের হাল ধরতে চাকরি খুঁজতে তিনি ঢাকায় যান।

সেখানে স্যানিটারি মিস্ত্রি (পাইপ ফিটিংস) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর মধ্যেই গাজীপুরের টঙ্গীর বাসিন্দা এতিম নুরনাহারকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। ১৮ মাস আগে তাদের সুখের সংসার আলো করে আসে এক ছেলে। ফয়েজ সন্তানের নাম রাখেন রাফি মাহমুদ।

ফয়েজের বাবা আলাউদ্দিন বলেন, “আমার ছেলে তো শ্রমিক ছিল। কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাহলে কী দোষে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো? সে তো আর ফিরে আসবে না। তার স্ত্রী-সন্তানকে কে দেখবে। বউটাও এতিম। আমি ফয়েজ হত্যার বিচার কার কাছে চাইব?”

ছোট রাফিকে নিয়ে সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে অনবরত সেটাই ভেবে চলেছেন নুরনাহার। স্বামীর মরদেহ দাফন শেষে শিশু রাফিকে নিয়ে গাজীপুরের টঙ্গীতে খালার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। 

মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে নুরনাহার বলেন, “২১ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাসায় ফেরার পথে সাইনবোর্ড এলাকায় গুলিতে আমার স্বামী মারা যায়। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন তো কেউই নেই। ফয়েজ আমাকে বিয়ে করে আপন করে নিয়েছিল। পৃথিবীতে সেই আমার একমাত্র আপনজন ছিল; একমাত্র আশ্রয় ছিল। 

“তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন আমার আর কেউ রইল না। কে দেখবে আমার ছোট্ট রাফিকে। কী দোষ ছিল ফয়েজের, কে দেবে এর জবাব? আমি এখন বড় একা।”

স্বামীর কথা বলতে বলতে কেঁদেই চলছিলেন নুরনাহার। 

তিনি বলেন, “শ্বশুর বাড়ির লোকজনও গরিব। তাই ফয়েজের মরদেহ দাফন শেষে টঙ্গীতে খালার বাসায় এসে উঠেছি। খালাও অসুস্থ; তার পরিবারও থাকে অর্ধাহারে অনাহারে,” কথাগুলো বলেই কান্নায় তিনি ভেঙে পড়েন। এরপর তিনি আর কোনো কথা বলতে পারেননি।

গুলিবিদ্ধ ফয়েজকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন তার পরিচিত স্যানিটারি ঠিকাদার মো. কাশেম। 

মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অ্যাম্বুলেন্স করে প্রথমে ফয়েজকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

কাশেম বলেন, “ফয়েজের মাথা ও ঘাড়ে গুলি লেগেছিল। পরে তার মরদেহ লক্ষ্মীপুরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ফয়েজ খুব শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের ছিল। দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরি পেতেন। ওই টাকায় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি যাত্রাবাড়ী সাইনবোর্ড এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।”

আরও পড়ুন:

৪ মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে স্বামী হত্যার বিচার চাইলেন রিতু

বাসায় এসে শিশুটি কেঁদে কেঁদে বলল, 'মা, বাবা গুলি খেয়েছে'

লুকিয়েও রক্ষা হয়নি রুবেলের, মাথা ফুঁড়ে চলে যায় গুলি

কৌতূহল কাল হল সাদের, পেটে গুলি নিয়ে পাঁচ দিন লড়েছেন তুহিন

'ছেলের বউডা আট মাসের গর্ভবতী; অহন বউ-বাচ্চারে কে দেখবো?'

বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন সুমাইয়া, গুলিতে লুটিয়ে পড়েন মেঝেতে

পিবিআইয়ের পরিদর্শক মাসুদের 'শরীরজুড়ে ছিল কোপ আর রডের আঘাত'

'কী দোষ ছিল আমার ছেলের? সে তো হাসপাতালে ডিউটিতে যাচ্ছিল'

জিল্লুরকে 'বড় অফিসার' বানানো স্বপ্নই থেকে গেল বাবা-মায়ের

'যৌন হেনস্তা' করে, লাইটার দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেয়: নারী সাংবাদিক

'বাবা ওঠো, আমি আম খাব': কবরের সামনে ৩ বছরের ইসরাতের আকুতি

স্বামীকে হারিয়ে ছেলের জন্য চাকরি চাইছেন গণির স্ত্রী

মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? প্রশ্ন জুয়েলের বাবার

'লাঠি ফেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সেলফি', তারপরই হামলা, সিঙ্গাপুরে কেম

'কী অপরাধে কারা এমনে আমার মেয়েটাকে মারল'

একমাত্র উপার্জনক্ষম তাজুলকে হারিয়ে অসহায় পরিবার

'কতই না কষ্ট প্যায়ে আমার কলিজার টুকরা মারা গেছে'

নিস্তব্ধ রুদ্রদের বাড়ি, নির্বাক বাবা-মা

'বাবা, তোমার মনের আশা পূরণ করতে পারলাম না, মাফ করে দিও'

'আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়

'তিন শিশুকে নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াব, এখন কে ওদের দেখবে?'

কোটা: সাঈদের পরিবারকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ সহায়তা

কোটা: 'ও ভাইও হামাক এনা বোন কয়া ডাকো রে', সাঈদের বোনের আহাজারি

নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট কার্যালয়: 'ডাকাতি হইলেও তো এমন হয় না'