১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ছেলের বউডা আট মাসের গর্ভবতী; অহন বউ-বাচ্চারে কে দেখবো?’

কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় ১৮ জুলাই বিকালে ঢাকার উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন লেগুনা চালক মো. আসাদুল্লাহ।

‘ছেলের বউডা আট মাসের গর্ভবতী; অহন বউ-বাচ্চারে কে দেখবো?’
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত আসাদুল্লাহর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা জয়নুদ্দীন।

মো. আব্দুর রহিম বাদল

শেরপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Jul 2024, 01:33 AM

Updated : 26 Aug 2026, 10:07 AM

“ছেলেডাই আমার শেষ সম্বল। ভাবছিলাম ছেলেডা কামাই রোজগার করছে সবাই মিলা এক সঙ্গে থাকমু। এডাও কপালে আমার সইলো না। আমার ছেলে গুলি খাইয়া মইরা গেল গা।”

কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় ১৮ জুলাই বিকালে ঢাকার উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত লেগুনার চালক মো. আসাদুল্লাহর (২২) বাবা জয়নুদ্দীন কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন।

আসাদুল্লাহ শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের পশ্চিম চাউলিয়া গ্রামের জয়নুদ্দীন ও রাশেদা বেগম দম্পতির ছেলে। 

১৮ জুলাই দুপুরে লেগুনা নিয়ে বের হয়ে বিকাল ৫টার দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকার উত্তরার আজমপুরে সংঘটিত সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন আসাদুল্লাহ।

মঙ্গলবার শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের পশ্চিম চাউলিয়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় আসাদুল্লাহ পরিবারের সঙ্গে। 

পরিবারের একমাত্র সম্বল সন্তানকে হারিয়ে আসাদুল্লার বাবা বলেন, “আমার নিজের কোনো বাড়িঘর নাই। অন্যের বাড়িতে থাইকা দিনমজুরি করি। ছেলেডারে নিয়া অনেক স্বপ্ন দেখছিলাম। অনেক শখ কইরা বছরখানেক আগে ছেলেডারে বিয়া করাইছি। 

“ছেলের বউডা আট মাসের গর্ভবতী। অহন বউ-বাচ্চারে কেরা দেখবো? ১০ বছর বয়সে ছেলেডা গাড়ির হেলপারির কাজ করা শুরু করে ঢাকায়। আমি একেক সময় একেক জনের বাড়িতে থাহি। আসাদুলের মা রাশেদা মাইনষের বাড়িতে কাম কাইজ করে। ১৮ বছর বয়স হওয়ার পর গাড়ির ড্রাইভারি লাইসেন্স করছে আসাদুল।”

তিনি বলেন, “ছেলেডা কেবল কামাই করা শুরু করছে। সংসারটা কেবল গুছাইতাছে। আমারে মাঝে মধ্যে টেহা (টাকা) পাডাইতো। আমি মাইনসের বাড়িতে দিনমজুরি করি। হঠাৎ কইরা ছেলেডা নাই হইয়া গেলো। ভাবছিলাম আমার শেষ সম্বল ছেলেডারে নিয়া এটু সুখের মুখ দেখমু। এডাও কপালে সইলো না।”

জয়নুদ্দীন বলেন, “ছেলেডা কোনো রাজনীতি করতো না। গোলাগুলি মধ্যে পড়ইরা ছেলে গুলি খাইয়া মইরা গেল গা। আমি মরার আগে আমার ছেলে হত্যার বিচার দেইখা যাইতে চাই। 

“আর সরকার যদি মনে করে আমাদের পরিবারের জন্য কোনো কিছু দরকার, করুক। যেডা ভাল সেডাই করুক সরকার।”

আসাদুল্লাহর মা রাশেদা বেগম বলেন, “ছেলেডা শ্রীবরদী উপজেলার রহমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছে। পড়ার পর ঢাহায় গেছে গাড়ির হেলপারি করছে। পরে ড্রাইভার অইছে। আমার ছেলেডা খুব ভাল ছিল। যেদিন মরা যায় সেদিন সকাল ১০টার দিকে আমার সঙ্গে ফোনে কতা কইছে। 

“আমার খোঁজ-খবর নিছে। কইছে মা তুমি কেমন আছ। খাওয়া-দাওয়া করছো। আমি গাড়ি নিয়া বাড়াইছি। আমি কইলাম হুনতাছি ঢাহা শহরও গেনজাম। গাড়ি নিয়া বাড়াইছ কে? আসাদুল্লাহ তহন কইলো মা আমি কোনো গেনজামে যামু না। গেনজাম দেহলে বাসায় যামু গা।” 

তিনি বলেন, “পরে ওই সন্ধ্যায় আসাদুল্লাহর শ্বশুর ফোন করইরা কইল, আসাদুল্লাহ গুলি খাইছে। পরে সোনার টুকরা একমাত্র ছেলে আমার মইরা গেলো। শেরপুর নিয়া আইসা মাডি দিলাম। ছেলের বউডা আট মাসের বাচ্চা পেডে। অহন কেমনে কী হবো কবার পাই না।” 

লেগুনা চালক মো. আসাদুল্লাহ।

লেগুনা চালক মো. আসাদুল্লাহ।

রাশেদা বলেন, “সরকার তো আর আমার ছেলেরে ফেরত দিবার পাবো না। অহন সরকার যদি কোনো সহযোগিতা করে তাইলে আমগরে উপকার অবো।”    

ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আসাদুল্লাহর শ্বশুর মো. নসকর আলী বলেন, “বিয়ের পর থেকে আসাদুল্লাহ আমাদের সঙ্গে ঢাকার উত্তরা এলাকার দক্ষিণখান চানপাড়া মাজার রোডে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত। সে ভাড়ায় লেগুনা চালাইত। ১৮ তারিখ বৃহস্পতিবার দুপুরে সে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যাবার পর আমাদের সঙ্গে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ নেই। 

“আমরা বিকাল পাঁচটায় তাকে ফোন দিলে অন্য এক ছাত্র ফোন ধরে বলে আপনাদের লোক গুলি খেয়ে হাসপাতালে আছে। আপনারা উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চলে আসেন। চারপাশে গুলাগুলি তখনও চলতাছে।”

নসকর আলী বলেন, “আমরা হাসপাতালে যাবার মতো পরিবেশ পাইতাছিলাম না। অনেক দূর দিয়ে ঘুরে ঘুরে আমাদের হাসপাতালে পৌঁছাতেই সময় লেগেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা। ততক্ষণে সব শেষ। আজমপুর কাঁচাবাজারে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গুলি লাগে আসাদুল্লাহর।

“কীভাবে এবং কার গুলি লেগেছে এসব আমরা কবার পাই না। পরে ছাত্ররাই তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। সেখানকার ডাক্তাররা ব্যান্ডেজ করে দিছে কিন্তু মইরা গেছে ততক্ষণে। পরে ১২টার দিকে লাশ বুঝে পেয়ে রাত ১টায় তার লাশ হাসপাতাল থাইকা নিয়া আমরা প্রথম ঢাকায় জানাজা করি। 

“পরে রাত ২টার দিকে লাশ নিয়ে শেরপুরের উদ্দেশে রওনা হই। ১৯ জুলাই শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে শেরপুরে লাশ পৌঁছায়। জুমার নামাজ পর জানাজা শেষে পশ্চিম চাউলিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।”

আসাদুল্লাহর স্ত্রী নুরানি খাতুন বলেন, “আমার স্বামী সাধারণ লেগুনার ড্রাইভার ছিল। তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয় ১১ মাস আগে। সে কোনো রাজনীতি করতো না। প্রত্যেক দিন বাসা থেকে বের হয়ে সারাদিন ভাড়ায় লেগুনা গাড়ি চালাইয়া বাসায় আসত। 

“সে খুবই ধীর স্থির ও শান্ত স্বভাবের ছিল। কারও সঙ্গেই তেমন মিশত না। ঢাকায় গোলমাল হচ্ছে শুনে স্বামীকে ফোন দিয়ে বলি, তুমি আর গাড়ি চালাইও না। তাড়াতাড়ি বাসায় চইলা আস।”

“তখন সে বলে, আমি আসতাছি। এই আসি বলে সে আর জীবিত ফিরে আসে নাই। আসছে লাশ হয়ে। বর্তমানে আমি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমার স্বামী গুলি খাইয়া অকালে মারা গেল। আমার পেটের বাচ্চা ও আমাকে এখন কে দেখবো?

নুরানি খাতুন বলেন, “সরকার এবং আপনারা যদি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ান তাহলে আমাদের মতো গরিব অসহায় পরিবারের খুবই উপকার হইত।” 

আসাদুল্লাহর জ্যাঠা জহুর উদ্দিন মঙ্গলবার সকালে বলেন, “ভাতিজা আসাদুল্লাহ দেখতেও সুন্দর ছিল; তার আচার- ব্যবহারও সুন্দর ছিল। তার মধ্যে কোনো হিংসা ছিল না। সবার সঙ্গে হাসি মুখে চলাফেরা ও কথাবার্তা বলত। কোনো রাজনীতিতে জড়িত না। পেটের ভাত যোগাড় করা নিয়াই সারাক্ষণ ব্যস্ত ছিল; রাজনীতি করব কহন।

“আমার ভাই আসাদুল্লার বাবা জয়নুদ্দীন গরিব অসহায় মানুষ। দিনমজুরি কইরা খায়। তার কোনো জায়গা-জমি নাই। অন্যের বাড়িতে থাকে। ভাতিজা মরার পর আমাদের জমিতেই কবর দিতে নিছি। একমাত্র ছেলেরে হরাইয়া আমার ভাই দিশেহারা। সরকার যদি অহন এই গরিব অসহায় পরিবারডারে দেহে তাহলে খুবই ভাল হয়।”  

শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিল বলেন, “আসাদুলের লাশ শেরপুরে আসার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাদের বাড়িতে গিয়েছি। তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। 

“আসাদুলরা খুবই গরিব মানুষ। কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। আমার ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ওই পরিবার আর্থিক সহায়তা ছাড়াও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করবো। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে যাতে ওই পরিবার সহযোগিতা পায় সে ব্যাপারেও চেষ্টা করব।”

এ বিষয়ে শ্রীবরদী থানার ওসি কাইয়ুম খান সিদ্দিকী বলেন, ১৯ জুলাই সকালে ঢাকা থেকে লাশ আসার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছিলাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকার উত্তরার আজমপুর এলাকায় সহিংতার সময় আসাদুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। 

তিনি এবং তার পরিবারের সবাই শ্রমজীবী মানুষ। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা। 

আরও পড়ুন:

পিবিআইয়ের পরিদর্শক মাসুদের 'শরীরজুড়ে ছিল কোপ আর রডের আঘাত'

'কী দোষ ছিল আমার ছেলের? সে তো হাসপাতালে ডিউটিতে যাচ্ছিল'

জিল্লুরকে 'বড় অফিসার' বানানো স্বপ্নই থেকে গেল বাবা-মায়ের

'যৌন হেনস্তা' করে, লাইটার দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেয়: নারী সাংবাদিক

'বাবা ওঠো, আমি আম খাব': কবরের সামনে ৩ বছরের ইসরাতের আকুতি

স্বামীকে হারিয়ে ছেলের জন্য চাকরি চাইছেন গণির স্ত্রী

মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? প্রশ্ন জুয়েলের বাবার

'লাঠি ফেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সেলফি', তারপরই হামলা, সিঙ্গাপুরে কেম

'কী অপরাধে কারা এমনে আমার মেয়েটাকে মারল'

একমাত্র উপার্জনক্ষম তাজুলকে হারিয়ে অসহায় পরিবার

'কতই না কষ্ট প্যায়ে আমার কলিজার টুকরা মারা গেছে'

নিস্তব্ধ রুদ্রদের বাড়ি, নির্বাক বাবা-মা

'বাবা, তোমার মনের আশা পূরণ করতে পারলাম না, মাফ করে দিও'

'আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়

'তিন শিশুকে নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াব, এখন কে ওদের দেখবে?'

কোটা: সাঈদের পরিবারকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ সহায়তা

কোটা: 'ও ভাইও হামাক এনা বোন কয়া ডাকো রে', সাঈদের বোনের আহাজারি

নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট কার্যালয়: 'ডাকাতি হইলেও তো এমন হয় না'