২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

পিবিআইয়ের পরিদর্শক মাসুদের ‘শরীরজুড়ে ছিল কোপ আর রডের আঘাত’

ছুটিতে থাকা অবস্থায় ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকার বাসা থেকে বেরিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

পিবিআইয়ের পরিদর্শক মাসুদের ‘শরীরজুড়ে ছিল কোপ আর রডের আঘাত’
ছেলে পিবিআইয়ের পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ ভুঁইয়ার ফ্রেমবন্দি ছবি হাতে মা গুলজান বেগম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ইলিয়াস আহমেদ. ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

Published : 30 Jul 2024, 10:13 AM

Updated : 01 Sep 2026, 10:52 AM

এক নজরে

ছুটিতে থাকা অবস্থায় ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকার বাসা থেকে বেরিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ছুটিতে থাকা অবস্থাতেই সাদা পোশাকে রাজধানীর রামপুরায় হামলাকারীদের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন পিবিআইয়ের পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ ভুঁইয়া। তার পরিবার বলছে, মাসুদের সারা শরীরজুড়ে ছিল অস্ত্রের কোপ আর রড দিয়ে পেটানোর জখম। আন্দোলনের মধ্যে ১৮ জুলাই কয়েক হাজার মানুষ গিয়ে তালা ভেঙে মাসুদের কর্মক্ষেত্র নারায়ণগঞ্জের পিবিআই কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। সেদিন তিনি কার্যালয়ে ছিলেন না। ছুটিতে রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় ছিলেন। পরদিন ১৯ জুলাই বাসা থেকে বেরনোর পর তিনি হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও রড দিয়ে পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখে। পরে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরিবারের সদস্যরা এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না, কেন তাকে হত্যা করা হল? কারণ, ছুটিতে থাকায় সেদিন তিনি ডিউটিতে ছিলেন না। সাদা পোশাকে ছিলেন। ‘পরিকল্পিত হত্যার’ অভিযোগও করেছেন। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি ইউনিয়নের কালান্দর গ্রামের আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া ও গুলজান বেগমের আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে মাসুদ পারভেজ ষষ্ঠ। ১৯৯৬ সালে উপ-পরিদর্শক হিসেবে পুলিশে যোগদান করেন মাসুদ। পরে পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হন। কর্মক্ষেত্র নারায়ণগঞ্জ হলেও স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ঢাকার রামপুরা বনশ্রী এলাকায় বসবাস করতেন মাসুদ পারভেজ-মেরিনা আক্তার বীনা দম্পতি।

তাদের বড় মেয়ে উম্মে মাইশা স্নেহা ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। মেঝ মেয়ে উম্মে মাহিরা নেহা এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সবার ছোট ছেলে আহনাফ মাহিন ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

মাসুদকে তার গ্রামের বাড়িতেই দাফন করা হয়েছে। রোববার দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনশান নিরবতা। বাড়ির একটি ঘরে খাটে শুয়ে ছিলেন গুলজান বেগম।

তার পাশেই দেয়ালে ফ্রেমবন্দি মাসুদের দুটি ছবি। সাদাকালো ছবি হাতে নিয়ে বারবার আদর করার পাশাপাশি গুলজান বেগম কথা বলছিলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই বাকহীন, স্তব্ধ হয়ে গেছেন গুলজান বেগম। কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্চ্ছা যাচ্ছেন তিনি। আহাজারি যেন কোনোভাবেই থামছে না। তাকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই। বয়সের ভারে দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন কিডনি, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ সমস্যায়।

বারবার বলছেন, “তুমরা আমার কলিজার টুকরো ছেলেকে এনে দাও; আমার ছেলে নেই, এখন কে আমাকে ওষুধ কিনে দিবে? আমার ছেলেকে সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই।”

মাসুদ পারভেজ পরিবারের পাশাপাশি গ্রামের মানুষদেরও সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। বেশ বন্ধু-বৎসল ছিলেন বলে প্রতিবেশীরা জানান। মাসুদের এমন হত্যায় গ্রামের শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। তার এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

মাসুদ পারভেজ ভুঁইয়ার ছোট ভাই সোহেল ভুঁইয়া বলেন, “বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের সব দায়-দায়িত্ব ভাইয়ের হাতে ছিল। আমাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের আগে মায়ের খবর নিতেন। মাস শেষ হওয়ার আগেই মায়ের ওষুধ কিনে পাঠিয়ে দিতেন। প্রতিমাসে মাকে একবার ডাক্তার দেখাতেন।”

তিনি বলেন, “আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে কর্মরত থাকলেও অফিস করতেন ঢাকার বাসা থেকে গিয়ে। ঘটনার দিন বাসা থেকে চা খেতে সন্ধ্যার পর বের হন। পরে অপরিচিত নাম্বার থেকে বাসায় কল দিয়ে জানানো হয়, ভাইকে কুপিয়ে রাস্তার মধ্যে ফেলা রাখা হয়েছে। তাকে এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে মানুষ মানুষকে এভাবে কখনও মারতে পারে না। আমি ভাই হত্যার সঠিক বিচার চাই।”

কোটা আন্দোলনের মধ্যে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়া, ট্যুরিস্ট পুলিশের এএসআই (নিরস্ত্র) মো. মোক্তাদির এবং ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগের নায়েক গিয়াস উদ্দিন।

তাদের পরিবারকে আইজিপির ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অনুদান দেওয়া হয়।

মাসুদ পারভেজের মেরিনা আক্তার বীনা রোববার দুপুরে তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী হত্যার বিচারের পাশাপাশি সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। কোনো সহযোগিতা না পেলে তিন সন্তানকে নিয়ে চলা খুব কষ্ট হয়ে যাবে।”

বীনা বলেন, ঘটনার দিন তাকে (মাসুদ) বাস থেকে বের হতে না করেছিলেন। কিন্তু সে সবাইকে সতর্ক করে নিজেই বের হয়ে মৃত্যু ডেকে আনল।

“তার সারা শরীরে শুধু আঘাত আর আঘাতের চিহ্ন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে, রড দিয়ে মাথায় ও শরীরে আঘাত করা হয়। পরে স্থানীয় এক নারী রাস্তা থেকে মাসুদকে তুলে নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে ভর্তি করে।”

সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকালে মাসুদ মারা যান। পরে ওইদিন রাতে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা খোকন মিয়া বলছিলেন, “মাসুদ ভাই এলাকার মানুষের কাছে ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যু কোনোভাবেই আমরা মেনে নিতে পারছি না। কেউ কোনো সমস্যায় পড়ে এলাকার নাম বলে কল দিলেই তিনি সাহায্য করতেন। যারা ভাইকে হত্যা করেছে, তারা যেন কোনো ভাবেই ছাড় না পায়।”

আরও পড়ুন:

'যৌন হেনস্তা' করে, লাইটার দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেয়: নারী সাংবাদিক

'বাবা ওঠো, আমি আম খাব': কবরের সামনে ৩ বছরের ইসরাতের আকুতি

স্বামীকে হারিয়ে ছেলের জন্য চাকরি চাইছেন গণির স্ত্রী

মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? প্রশ্ন জুয়েলের বাবার

'লাঠি ফেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সেলফি', তারপরই হামলা, সিঙ্গাপুরে কেম

'কী অপরাধে কারা এমনে আমার মেয়েটাকে মারল'

একমাত্র উপার্জনক্ষম তাজুলকে হারিয়ে অসহায় পরিবার

'কতই না কষ্ট প্যায়ে আমার কলিজার টুকরা মারা গেছে'

নিস্তব্ধ রুদ্রদের বাড়ি, নির্বাক বাবা-মা

'বাবা, তোমার মনের আশা পূরণ করতে পারলাম না, মাফ করে দিও'

'আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়

'তিন শিশুকে নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াব, এখন কে ওদের দেখবে?'

কোটা: সাঈদের পরিবারকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ সহায়তা

কোটা: 'ও ভাইও হামাক এনা বোন কয়া ডাকো রে', সাঈদের বোনের আহাজারি

নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট কার্যালয়: 'ডাকাতি হইলেও তো এমন হয় না'

'লাঠি ফেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সেলফি', তারপরই হামলা, সিঙ্গাপুরে কেম