১৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর আফতাবনগর থেকে বনশ্রীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজে যাওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান।
Published : 30 Jul 2024, 08:39 AM
‘আমার ছেলেরে গুলি কইরা মারছে, কী দোষ ছিল আমার ছেলের? আমার ছেলে তো বাসা থেকে বের হয়ে হাসপাতালে ডিউটি করতে যাচ্ছিল। আমি এখন কী নিয়ে বেঁচে থাকবো?”
১৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর আফতাবনগর থেকে খাবার খেয়ে কর্মস্থল বনশ্রীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সহিংসতার মধ্যে পড়ে গুলিতে নিহত নাজমুল হাসানের (২১) মা নাজমা বেগম (৪৫) কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন।
নাজমা বেগম এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করছেন। ছেলে নাজমুল হাসান এক বছর ধরে পড়ালেখার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করতেন।
মাস শেষে মা-ছেলের যা রোজগার হতো তা দিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। ১৯ জুলাই কোটা আন্দোলনের সংঘর্ষের দিন বাসা থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে কোমড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান নাজমুল।
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে মা এখন নির্বাক। বাসায় কেউ এলেই হাউমাউ করে কান্নাকাটি করছেন। তার এই আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে আশপাশের পরিবেশ।
নাজমুল কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার চাপাতলি এলাকার সৈয়দ আবুল কায়েসের ছেলে। তবে নাজমুল তার মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার চরগোবিন্দপুর উত্তরকান্দি গ্রামের মাতুব্বরবাড়ি থাকতেন।
বাবার বাড়ি কুমিল্লা হলেও নানাবাড়ি মাদারীপুরেই ছিল নাজমুলের স্থায়ী ঠিকানা। মা নাজমা বেগম কাজের সুবাদে ঢাকার আফতাবনগরে ছেলেকে নিয়ে বাসাভাড়া করে থাকতেন।
মাদারীপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর উত্তরকান্দি গ্রাম।
শনিবার বিকালে নাজমুলের নানাবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিন সেডের একটি বড় ঘর। তার চারপাশ গাছপালা ভরা। এই ঘরের বারান্দায় দেওয়ালে পিঠ দিয়ে নাজমুলের মা নাজমা বেগম বসে আছেন।
বাড়িজুড়ে সুনশান নিরবতা। সবার চোখে-মুখেই কান্নার ছাপ। বাড়ির উঠানে নাজমুলের খালাতো ভাই সুমন কাজী দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সুমন কাজী বললেন, “আমার ভাই আট দিন ধরে কবরে শুয়ে আছে, আপনারা তাকে দেখে আসেন।”
বাড়ির পাশেই মাতুব্বরবাড়ি মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয় নাজমুলকে।
নাজমুলের বড় বোন তানজিলা আক্তার (২৬) তার মা নাজমা বেগমকে বারান্দা থেকে তুলে মেঝেতে থাকা সোফায় নিয়ে বসালেন।
এই প্রতিবেদককে দেখে তিনি হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার মেয়ে ও জামাতা তাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি ছেলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনা স্মরণ করে বিলাপ করছেন।
তিনি বলেন, “আমি ক্যামনে এই যন্ত্রণা সহ্য করবো। আমার তো একটাই মানিক আছিল, ও খোদা। আমার এই সন্তান ছাড়া তো আর কেউ নাই। কষ্ট কইরা মানুষ করলাম, পড়াইলাম, লেখাইলাম, এখন কী পাইলাম, মানুষের হাতে গুলি খাইয়া আমার মানিকের মরতে হইলো, কী দোষ ছিল ওর।
“আমার বাবারে তোমরা আইনা দাও। আমি তো মা, আমি তো সহ্য করতে পারছি না। আমি ক্যামনে বাঁচমু, হায় আল্লাহ। আমার নির্দোষ বাবার মত আর একজনও নাই।”
নাজমা বলেন, “মা-ছেলে একলগে কাম করতাম, ঘর ভাড়া দিতাম, সমান সমান থাকতাম, বাবজান আমারে কইতো, ‘মা তোমার আর কষ্ট করতে হইবে না। আমি টাকা জমিয়ে বিদেশ যামু, আপু চাকরি করব, তোমার আর কষ্ট থাকব না।’ এগুলো মনে পড়লে আমার বুকের মধ্যে যে ক্যামন করে তা কইতে পারতাছি না। সরকারের কাছে একটা জিনিসই চাই, আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়।”
একজন মা তার চোখের সামনে ছেলেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে যেতে দেখেছেন- সেই করুণ পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে নাজমা বলেন, “আমার চোখের সামনে সব ঘটনা ঘটলো। কিন্তু কোনো চেষ্টাতেই আমার ছেলেডারে বাঁচাইতে পারলাম না। চোখের সামনে বাপজান আমার মইরা গেলো।
“ওরে এমনে গুলি করতে পারলো। আমার বাবায় তো কোন ঝায়-ঝামেলায় থাকতো না। দেশের কোনো ক্ষতি করে নাই। তাহলে ওরে কেন গুলিতে জীবন দিতে হইলো?”
নাজমুলের পরিবার জানায়, ১৯ জুলাই দুপুরের খাবার খেয়ে নাজমুল আফতাবনগর থেকে বনশ্রী ফরাজি হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। এই হাসপাতালে পার্টটাইম ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করতেন তিনি। ঢাকায় সেদিন কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
তখন নাজমুল সংঘর্ষ এড়াতে গুদারাঘাট এলাকা দিয়ে বনশ্রীর দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। গুদারাঘাটের নার্সারির কাছে সেতুতে উঠার পরেই গুলিবিদ্ধ হন নাজমুল। পরে কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ নাজমুলকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে গুদারাঘাট এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন।
পরে ওই দিন সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাজমুল মারা যান। পরে তার লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে রাতেই তার নানাবাড়ি মাদারীপুরে আনা হয়। পরে নাজমুলকে জানাজা শেষে নানা আব্দুল রহমান মাতুব্বরের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নাজমুলের বড় বোন তানজিলা আক্তার বলেন, “ভাই, চাকরি করে আমাকেও লেখাপড়ার কাজে সহযোগিতা করতো। ভাইকে যে এভাবে মরতে হবে, এটা এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।
“বুকের ভেতরটায় যে কি হচ্ছে তা কাউকে বোঝাতে পারব না। আমার ভাইকে কেন গুলি করে মারা হলো, এটার বিচার আমি আল্লাহ ছাড়া কার কাছে দেবো?”
নাজমুলের খালাত ভাই সুমন কাজী বলেন, “নাজমুল গত বছর ঢাকা ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে অর্নাস করছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি নাজমুল ওই হাসপাতালে পার্টটাইম কাজ করে মাসে ১২ হাজার টাকা পেত। এই টাকা দিয়ে সংসার চালাতে তার মাকে সহযোগিতা করতেন।”
এ বিষয়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশীদ খান বলেন, “সহিংসতায় অনেকেই মারা গেছেন। তবে কোন স্থানে সেই তথ্য আমাদের কাছে আপতত নেই।
“তবে নিহতের পরিবার আমাদের কাছে আবেদন জানালে আমরা সাধ্যমত সহযোগিতা করবো।”
আরও পড়ুন-
স্বামীকে হারিয়ে ছেলের জন্য চাকরি চাইছেন গণির স্ত্রী
মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? প্রশ্ন জুয়েলের বাবার
‘লাঠি ফেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সেলফি’, তারপরই হামলা, সিঙ্গাপুরে কেমন আছেন
'কী অপরাধে কারা এমনে আমার মেয়েটাকে মারল'
একমাত্র উপার্জনক্ষম তাজুলকে হারিয়ে অসহায় পরিবার
'কতই না কষ্ট প্যায়ে আমার কলিজার টুকরা মারা গেছে'
নিস্তব্ধ রুদ্রদের বাড়ি, নির্বাক বাবা-মা
'বাবা, তোমার মনের আশা পূরণ করতে পারলাম না, মাফ করে দিও'
'আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়
'তিন শিশুকে নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াব, এখন কে ওদের দেখবে?'
কোটা: সাঈদের পরিবারকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ সহায়তা
কোটা: 'ও ভাইও হামাক এনা বোন কয়া ডাকো রে', সাঈদের বোনের আহাজারি
নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট কার্যালয়: 'ডাকাতি হইলেও তো এমন হয় না'
'লাঠি ফেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সেলফি', তারপরই হামলা, সিঙ্গাপুরে কেম