Published : 01 Aug 2024, 12:37 PM
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকার মিরপুরে সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হন কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার তরিকুল ইসলাম রুবেল। ১৯ জুলাই রাত ৮টার দিকে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে তার মাথায় গুলি লাগে বলে জানান স্বজনরা।
প্রাণের ভয়ে সড়কের পাশে কভার্ড ভ্যানের আড়ালে লুকিয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি রুবেল। হঠাৎ গুলি এসে তার বাম কানের পাশ দিয়ে মাথায় ঢুকে কপাল ভেদ করে বেড়িয়ে যায়।
২৪ বছর বয়সী রুবেল ঢাকার মিরপুর-১৪ সেকশনে রাকিন বিজয় ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তিনি তাড়াইল উপজেলার দামিহা ইউনিয়নের হাছলা গ্রামের কৃষক মো. ফরিদ উদ্দিনের ছেলে।
চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে রুবেল পঞ্চম এবং ভাইদের মধ্যে তৃতীয়। সবার বড় ভাই সোহেল হোসেন গাজীপুরে পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। দ্বিতীয় ভাই জুয়েল আহমেদ তাড়াইল মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সবার ছোট ভাই বাড়িতে থাকে এবং বিয়ের পর দুই বোন স্বামীর সংসারে আছেন।
রুবেল স্থানীয় মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে ঢাকায় চাকরি নেন। দেড় বছর আগে কর্মস্থলের কাছেই হবিগঞ্জের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। তবে তাদের কোনো সন্তান নেই।
ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা রুবেলের ভগ্নিপতি মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন রাতে রুবেল অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলেন। পথে মিরপুর-১৩ এলাকার ১ নম্বর ভবনের জিরো পয়েন্টে কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল।
“সেই সময় রুবেল নিজেকে বাঁচাতে একটি কভার্ড ভ্যানের পেছনে লুকিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে অবস্থা বোঝার জন্য উঁকি দিতেই তার মাথায় গুলি লাগে।
“গুলি রুবেলের বাম কানের পাশ দিয়ে মাথায় ঢুকে কপাল ভেদ করে বেড়িয়ে যায়। এতে রুবেলের মগজ ছিটকে রাস্তায় পড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়।”
শরিফুল ইসলাম বলেন, মাটিতে পড়ে থাকা রুবেলকে চিনতে পেরে একজন তাকে মোবাইল ফোনে জানালে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
রুবেলের চাচাতো বোন নাজমা আক্তারের স্বামী শফিকুল ইসলাম। শফিকুল ইসলামের শ্বশুরবাড়ি হাছলা গ্রামে রুবেলদের বাড়িতে কাছে।
রুবেলের বাবা ফরিদ উদ্দিন জানান, রাত পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা থেকে শফিকুল ইসলাম মোবাইলে রুবেলের মৃত্যুর কথা জানান। রুবেল কখনও কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। জীবিকার তাগিদে ঢাকা গিয়েছিল রুবেল।
“শুধু শুধু ছেলেকে হত্যা করে আমার বুক খালি করা হয়েছে; আমি এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
ছেলেকে হারিয়ে মা হেলেনা আক্তার বারবার বুক চাপড়ে বলছিলেন, “আমার রুবেলকে কেন হত্যা করা হল। আমার বুকের ধন ফিরিয়ে দাও।”
রুবেলের বড় ভাই জুয়েল আহমেদ জানান, ২০ জুলাই জোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে রুবেলকে দাফন করা হয়। পরে ঘটনাটি তাড়াইল থানার এসআই লুৎফুর রহমানকে মোবাইল ফোনে জানানো হয়।
রুবেলের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকার কাফরুল থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে চাইলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে জানান তিনি।
তবে তাড়াইল থানার এসআই লুৎফুর রহমান বলেন, ঢাকার মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে রুবেল মারা গেছেন। তবে কার গুলিতে মারা গেছেন তা নিশ্চিত নয়।
ঢাকায় আন্দোলনের সময় গুলিতে রুবেলের মৃত্যু হয়েছে উল্লেখ করে দামিহা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এ কে মাইনুজ্জামান নবাব স্বাক্ষরিত একটি মৃত্যু সনদ তাদের দেওয়া হয়েছে বলে জানান জুয়েল আহমেদ।
আরও পড়ুন:
'ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল, তারে মাইরা হালাইলো'
'যৌন হেনস্তা' করে, লাইটার দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেয়: নারী সাংবাদিক
'বাবা ওঠো, আমি আম খাব': কবরের সামনে ৩ বছরের ইসরাতের আকুতি
স্বামীকে হারিয়ে ছেলের জন্য চাকরি চাইছেন গণির স্ত্রী
মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? প্রশ্ন জুয়েলের বাবার
'লাঠি ফেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সেলফি', তারপরই হামলা, সিঙ্গাপুরে কেম
'কী অপরাধে কারা এমনে আমার মেয়েটাকে মারল'
একমাত্র উপার্জনক্ষম তাজুলকে হারিয়ে অসহায় পরিবার