‘ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল, তারে মাইরা হালাইলো’
টাঙ্গাইলে বাড়ি আসার জন্য রওনা হয়ে মিরপুর-১০ নম্বরে গুলিবিদ্ধ হন পলাশ।
কয়েকদিন আগেই বাড়ি গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের ফিরোজ তালুকদার পলাশ। ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়কের কাজ করলেও তার স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করার। মৃত্যুর সঙ্গে সে স্বপ্ন হারিয়ে গেছে।
পলাশের আবারও বাড়ি ফেরার কথা ছিল; ফিরেছে ঠিকই, তবে লাশ হয়ে। তার জন্য অপেক্ষা শেষ হয়েছে স্নেহময়ী মায়ের। কিন্তু চোখের জল যেন শেষ হতে চায় না।
পলাশের গ্রামের বাড়ি ভূঞাপুর পৌরসভার ঘাটান্দি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তাদের থাকার ঘরটি টিনের তৈরি। বাড়িজুড়ে সুনশান নিরবতার মাঝে কানে এলো মা বেনু বেগমের কান্নার করুণ সুর। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে অনবরত কান্না করছেন তিনি। প্রতিবেশীদের কোনো সান্ত্বনাই তাকে শান্ত করতে পারছে না।
বেনুর কাছে ছেলের কথা জানতে চাইলে আর্তনাদ করে ওঠেন। ছেলের শোকে পাগলপ্রায় মা বলেন, “আমার বাবাকে গুলি করে মেরেছে। একটা গুলি লেগেছে তার বুকে। গুলিতে পা-টাও ছ্যাড়াবেড়া হয়েছিল।”
৩৮ বছর বয়সী পলাশ পাঁচ বছর আগে ঢাকার মিরপুর-১২ এলাকায় ‘রংপুর কেমিক্যাল’ নামের একটি কোম্পানিতে অফিস সহায়ক (পিয়ন) হিসাবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই চাকরি করতেন তিনি। ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এরপর হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার।
ওইদিন গভীর রাতেই অ্যাম্বুলেন্সে করে পলাশের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। পরদিন সকালে ঘাটান্দির ‘তালুকদার কবরস্থানে’ পলাশকে দাফন করা হয়।
বেনু বেগম বলছিলেন, “আমার কাছে আসতে চাইছিল আমার বাবা। ১৯ জুলাই স্ত্রী-সন্তানদের বাধা উপেক্ষা করেই ভূঞাপুর আসার জন্য রওনা হয়। পথে মিরপুর-১০ এলাকায় হঠাৎ গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।”
পলাশকে স্থানীয় লোকজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মিরপুরের আলোক হেলথ কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে পলাশের মোবাইল ফোন থেকে তার মায়ের নম্বরে ফোন করে তার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। পলাশের স্ত্রী রেশমা খাতুনকে ঘটনাটি জানানো হলে তিনি হাসপাতালে গিয়ে স্বামীর মরদেহ দেখতে পান।
কথাগুলো বলতে বলতে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন বেনু। জড়ানো কণ্ঠে বলেন, “ছেলের অনেক স্বপ্ন ছিল; তারে গুলি কইরা মাইরা হালাইলো। আমার দুই ছেলের একটা চইলা গেল আমাকে ছেড়ে। আমি বিচার চাই। আমার নাতনি-ছেলের বউ; তাদের ভবিষ্যত কী হবে?”
পলাশের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ইশরাত জাহান সাবিনা বলেন, “পলাশের বুকে একটা গুলি করা হয়েছে। তার পুরো শরীর রক্তাক্ত হয়েছিল। সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে তার বাবাকে হারালো। ঘটনার দিন বিকাল ৫টার দিকে তার সাথে শেষ কথা হয়েছিল।”
বাড়ির ফেরার আকুতি নিয়ে পথে বের হওয়া পলাশ যে আর কোনো দিনই ফিরবেন না, সেটা মানতে পারছেন না ইশরাতও।
চোখের কোণে জল নিয়ে তিনি বলছিলেন, “এইভাবে কারোর মৃত্যু হবে এটা ভাবা যায় না। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও বাড়িতে এসেছিল পলাশ। অনেক স্বপ্ন ছিল তার। কে জানতো বাড়ি আসার জন্য তাকে মরতে হবে।”
আরও পড়ুন:
