কৌশলী মনোনয়নে বড় বদল, নৌকায় বহু আনকোরা মুখ

মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় শেষে আগামী ১৭ ডিসেম্বর জানা যাবে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা। এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারও জয় চান না আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলে আপত্তি নেই ক্ষমতাসীন দলের।

মঈনুল হক চৌধুরীকাজী মোবারক হোসেনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 Nov 2023, 07:59 PM
Updated : 26 Nov 2023, 07:59 PM

চট্টগ্রামের পাঁচটি আসনে নৌকা না পেয়ে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। আরও কিছু জেলায় দলের প্রার্থীরা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যেই অনেক পরিবর্তন ও নতুন মুখ এনে নিজেদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। 

মনোনয়ন ঘোষণার আগে দলের নেতাদেরকে গণভবনে ডেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বার্তা দিয়েছেন, সেটি হল- কোনো আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউকে বিজয়ী হতে দেখতে চান না তিনি।

২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীদের জয়ের কারণে এখনও বিরোধীদের কথা শুনতে হয় আওয়ামী লীগকে। 

আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি ও তার সঙ্গে থাকা দলগুলো ভোট বর্জনের কথা বলছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ট্রেন যাত্রা শুরু করে দিয়েছে আগেই। কাদের নিয়ে এই লড়াই, তা প্রকাশ হলো রোববার।

আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ যে প্রার্থী বাছাই করেছে, তাতে আছে ছয় ডজনের মতো আনকোরা নতুন মুখ। গত নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি কিন্তু অতীতে মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কয়েকজন বাদ পড়লেও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অনেকেই এবারও নৌকার হয়ে নির্বাচনে লড়ার সবুজ সংকেত পেয়েছেন। 

সব মিলিয়ে ১০৫টি আসনে প্রার্থী বদল করেছে আওয়ামী লীগ। বাদ পড়েছেন ৭১ জন সংসদ সদস্য, এদের মধ্যে তিনজন আবার প্রতিমন্ত্রী।

অতীতে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, এমন চারজনও বাদ পড়েছেন, গত নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সাবেক এক আইজিপিও মনোনয়ন পাননি। 

দলের ভাষ্য, ‘জনপ্রিয়তা দেখেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’  

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে বলেন, “নির্বাচনকে সামনে রেখে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাদের অনেক কিছু বিষয় লক্ষ্য করেই দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয়দের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এখানে নতুন পুরানো বলতে কিছু নেই। অধিকতর গ্রহণযোগ্যরাই মনোনয়ন পেয়েছেন।”

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, “নতুনদের বেশি দেওয়া হয়েছে তাদের দক্ষতা, যোগ্যতার এবং জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে। যাদের মধ্যে মানদণ্ডে এগিয়ে তাদেরকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”

সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ যে ২৯৮ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে, তারা সবাই যে নৌকা পেতে যাচ্ছেন, বিষয়টি এমনও নয়। কারণ, জোট ও অন্য দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা ও ছাড় দেওয়ার বিষয় থাকবে।

আগামী ৩০ নভেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের যে সময় বেঁধে দেওয়া আছে, সেখানে তা যাচাইবাছাই এবং প্রত্যাহারেরও আলাদা সময় থাকবে।

১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় আছে। এর আগ পর্যন্ত আসন সমঝোতা করা যাবে। সেদিনই চূড়ান্তভাবে জানা যাবে কারা আওয়ামী লীগের প্রার্থী, কাদেরকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

নতুন মুখের ছড়াছড়ি

এবার যারা নৌকার টিকেট পেয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রায় এক চতুর্থাংশ একেবারেই নতুন মুখ, যারা অতীতে কখনও প্রার্থী হননি বা মনোনয়নও পাননি। এই সংখ্যাটি এবার ছয় ডজনের আশেপাশে।

সব মিলিয়ে প্রার্থী বদল হয়েছে ১০৫টি আসনে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জনপ্রিয়তা, দক্ষতা ও যোগ্যতার মানদণ্ডে যারা এগিয়ে আছেন, তাদেরকেই মনোনয়ন দিয়েছে মনোনয়ন বোর্ড।”

শতাধিক প্রার্থী বদল এবং ৭১ জন সংসদ সদস্যকে মনোনয়ন না দেওয়ার কারণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রতিটি নির্বাচনেই মানদণ্ডটা নতুন করে যাচাই করা হয়, যার জন্য এই পরিবর্তন।”

এবার সবচেয়ে বেশি ১৬ জন সংসদ সদস্য বাদ পড়েছেন ঢাকা বিভাগে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ জন বাদ পড়েছেন খুলনা বিভাগে। রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১০ জন করে, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯ জন, রংপুর ও সিলেট বিভাগে ৬ জন করে এবং বরিশাল বিভাগে বাদ পড়েছেন মোট তিনজন সংসদ সদস্য।

প্রথমবারের মতো নৌকা পেয়েছেন: পঞ্চগড়-১ আসনে নাইমুজ্জামান ভুইয়া, ঠাকুরগাঁও-২ আসনে মো.মাজহারুল ইসলাম, নীলফামারী-৪ আসনে জাকির হোসেন বাবুল, লালমনিরহাট-৩ আসনে মো.মতিয়ার রহমান রংপুর-৫ আসনে রাশেক রহমান, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে সৌমেন্দ্র প্রসাদ পান্ডে, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে বিপ্লব হাসান, গাইবান্ধা-১ আসনে আফরোজা বারী।

রাজশাহী বিভাগে বগুড়া-২ আসনে তৌহিদুর রহমান মানিক, বগুড়া-৩ আসনে সিরাজুল ইসলাম খান, বগুড়া-৪ আসনে হেলাল উদ্দিন কবিরাজ, রাজশাহী-২ আসনে মোহাম্মদ আলী, রাজশাহী-৩ আসনে আসাদুজ্জামান আসাদ রাজশাহী-৪ আসনে আবুল কালাম আজাদ, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে শফিকুল ইসলাম, পাবনা-৪ আসনে গালিবুর রহমান শরীফ এর আগে কখনও মনোনয়ন পাননি।

খুলনা বিভাগে মেহেরপুর-২ আসনে আবু সালেহ মোহাম্মদ নাজমুল হক, ঝিনাইদহ-৩ আসনের সালাউদ্দিন মিরাজী, যশোর-২ আসনে তৌহিদুজ্জামান, যশোর-৪ আসনে এনামুল হক বাবু, মাগুরা-১ আসনে সাকিব আল হাসান, বাগেরহাট-৪ আসনে বদিউজ্জামাল সোহাগ, খুলনা-৩ আসনে এস এম কামাল হোসেন, খুলনা-৬ আসনে মো. রশীদুজ্জামান, সাতক্ষীরা-১ আসনে ফিরোজ আহমেদ স্বপন, সাতক্ষীরা-২ আসনে মো. আসাদুজ্জামান বাবু, সাতক্ষীরা-৪ আসনে এসএম আতাউল হকও একবারেই নতুন।

বরিশাল বিভাগে বরগুনা-২ আসনে সুলতানা নাদিরা, বরিশাল-৩ আসনে সরদার মো. খালেদ হোসাইন, বরিশাল-৪ শাম্মী আহমদ, বরিশাল-৬ আসনে আব্দুল হাফিজ মল্লিক, পিরোজপুর-৩ আসনে মো. আশরাফুর রহমানও এর আগে কখনও মনোনয়ন পাননি।

ঢাকা বিভাগের মধ্যে রাজধানীর ঢাকা-৫ আসনের হারুনুর রশিদ মুন্না, ঢাকা-৬ আসনে সাঈদ খোকন, ঢাকা-৭ আসনের সোলাইমান সেলিম, ঢাকা-১০ আসনের ফেরদৌস আহমেদ, ঢাকা-১১ আসনের মো. ওয়াকিল উদ্দিন ও ঢাকা-১৪ আসনে মাইনুল হোসেন খান নিখিলও এর আগে কখনও মনোনয়ন পাননি।

বিভাগের অন্য জেলাগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইল-৩ আসনে কামরুল হাসান খান, টাঙ্গাইল-৪ আসনে মো.মাজহারুল ইসলাম তালুকদার টাঙ্গাইল-৫ আসনে মো.মামুন অর রশিদ, কিশোরগঞ্জ-২ আসনে আব্দুর কাহার আকন্দ ৪৩, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে মহিউদ্দিন আহমেদ গাজীপুর-৩ আসনে রুমানা আলী, নরসিংদী-৩ ফজলে রাব্বী খান ও ফরিদপুর-৩ আসনে শামীম হক প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন।

ময়মনসিংহ বিভাগে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের মধ্যে জামালপুর-৪ আসনে মাহবুবুর রহমান, জামালপুর-৫ আসনে আবুল কালাম আজাদ, শেরপুর-৩ আসনে শহিদুল ইসলাম ৩৯) ময়মনসিংহ-৩ আসনে নিলুফা আনজুম, ময়মনসিংহ-৪ আসনে মোহাম্মদ মোহিত উর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ আসনে আব্দুল হাই আকন্দ, নেত্রকোণা-৫ আসনে আহমদ হোসেন এর আগে কখনও দলীয় টিকেট পাননি।

সিলেট বিভাগে সুনামগঞ্জ-১ আসনের রনজিত চন্দ্র সরকার সুনামগঞ্জ-২ আসনের চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের মো. সাদিক, মৌলভীবাজার-২ আসনের শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, মৌলভীবাজার-৩ আসনের মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, হবিগঞ্জ-১ আসনের মো. মুশফিক হোসেন চৌধুরী এবং হবিগঞ্জ-২ ময়েজ উদ্দিন শরিফও নতুন মুখ।

চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন মুখের মধ্যে আছেন কুমিল্লা-১ আসনের আব্দুস সবুর ৬২) কুমিল্লা-৮ আসনের আবু জাফর মো. শফিউদ্দিন, চাঁদপুর-১ আসনের সেলিম মাহমুদ, লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের ফরিদুন্নাহার লাইলী, চট্টগ্রাম-১ আসনের মাহবুব উর রহমান চট্টগ্রাম-২ আসনের খাদিজাতুল আনোয়ার, চট্টগ্রাম-৪ আসনের এসএম আল মামুন ও চট্টগ্রাম-১২ আসনের মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীও এবারই প্রথমবারের মতো নৌকা পেয়েছেন। 

ফিরলেন যারা

আগের নির্বাচনে দলের মনোনয়নের তালিকা থেকে বাদ পড়ে মন ভেঙেছিল যাদের এমন অনেকেই এবার মনোনয়ন পেয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।

এছাড়া সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য আব্দুর রহমান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটের লড়াইয়ে নামতে দলের প্রতীক নৌকা ফিরে পেয়েছেন।

সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে যে ২৯৮ আসনের মনোয়ন রোববার ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ, তাতে এরকম ২৬ পুরনো মুখ নতুন করে ফিরে এসেছে।

মাদারীপুর-৩ আসন থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জিতে এমপি হয়েছিলেন বাহাউদ্দিন নাছিম। ২০১৮ সালে ওই আসনে নৌকার টিকেট পান আবদুস সোবহান গোলাপ। এবারও তাকেই মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আর বাহাউদ্দিন নাছিমকে দেওয়া হয়েছে ঢাকা-৮ আসনের মনোনয়ন, যে আসন থেকে গত তিনবার এমপি হয়েছেন আওয়ামী লীগের শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।  

যুবলীগের সাবেক নেতা চয়ন ইসলাম সিরাজগঞ্জ-৬ আসন থেকে বাদ পড়েন। সেই আসনে ২০১৮ সালে তার বোন মেরিনা জাহান কবিতাকে মনোনয়ন দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এবার বোনকে বাদ দিয়ে আবারও মনোনয়ন পেলেন ভাই।

অন্যদের মধ্যে ময়মনসিংহ-৯ আসনে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের টিকেটে এমপি হন আব্দুস সালাম। পরের দুই নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান আনোয়ারুল আবেদীন খান। আগামী নির্বাচনে সেখানে আবারও সালামকে প্রার্থী করেছে আওয়ামী লীগ।

আলোচিত যারা বাদ

২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে চাঁদপুর-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তার জায়গায় দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদকে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

১৯৯৬ সাল থেকে ফরিদপুর-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকেও পাল্টে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তিনি নবম সংসদ নির্বাচনের পর প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ এবং পরে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তবে গত সংসদ নির্বাচনের পর আর মন্ত্রিত্ব পাননি। তার আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হককে বেছে নেওয়া হয়েছে।

মোশাররফের জামাতা সিরাজগঞ্জ-২ আসনে হাবিবে মিল্লাতকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তার আসনে নবম সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী জান্নাত আবার হেনরীকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

Also Read: ২৯৮ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা

Also Read: আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদল ১০৫ আসনে

Also Read: মনোনয়ন পেলেন না তিন প্রতিমন্ত্রী, ৬৮ সাংসদ

Also Read: ভোটতথ্য: আওয়ামী লীগের ২৬০, বিএনপির ২৫৭ প্রার্থী

Also Read: ভোটের নৌকায় মায়া, নানকসহ ২৬ মুখের প্রত্যাবর্তন

ঢাকা-৭ আসনের আলোচিত হাজী মোহাম্মদ সেলিমকেও পাল্টে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। তার জায়গায় বেছে নেওয়া হয়েছে তার ছেলে মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিমকে।

এক চিত্রনায়িকার সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় জামালপুর-৪ আসনের মুরাদ হাসানকে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণের পর দলীয় পদও হারিয়েছিলেন। চলতি বছর তাকে ক্ষমা করে দলের সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হলেও মনোনয়নের জন্য বিবেচনা করা হয়নি। তার আসনে লড়বেন মো. মাহবুবুর রহমান।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন কুড়িগ্রাম-৪ আসনে এবার নৌকা মার্কা পাচ্ছেন না। তার জায়গায় বিপ্লব হাসানকে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

জাকিরের বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রতিবেদন এসেছে গণমাধ্যমে। 

নৌকার টিকেট পেলেন ব্যবসায়ীরাও

ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জ উপজেলা মিলিয়ে ঢাকা-১ নির্বাচনী আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান।

ঢাকা-২০ আসনে মনোনয়ন পাওয়া বেনজীর আহমেদ জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার একাধিকবারের সভাপতি ছিলেন।

কুমিল্লা-২ আসন থেকে মনোনয়ন পাওয়া সেলিমা আহমাদ এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মাতলুব আহমেদের স্ত্রী ও নিটল নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি।

Also Read: ব্যবসায়ী যারা পেলেন আওয়ামী লীগের টিকেট

Also Read: নারীর মনোনয়ন বাড়াল আওয়ামী লীগ, বাদও দিল চার সাংসদকে

Also Read: দেড় দশক পর কর্নেল তাহেরের পরিবারের বাইরে নৌকার মাঝি

Also Read: চট্টগ্রামের ৫ আসনে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারাই

কুমিল্লা-৩ আসনের প্রার্থী ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি। ব্যাংক বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি।

কুমিল্লা-৯ আসনের নৌকার প্রার্থী বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প, ব্যাংকসহ  বিভিন্ন শিল্প উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। পোশাক খাতে ফেবিয়ান গ্রুপ নামের বড় একটি শিল্প রয়েছে তার।

কুমিল্লা-১০ আসনে মনোনয়ন পাওয়া আ হ ম মুস্তফা কামাল চার্টার্ড অ্যাকাউটেন্ট হিসাবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে জনশক্তি রপ্তানিসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পো উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন।

নোয়াখালী-২ আসনে মনোনয়ন পাওয়া মোরশেদ আলম বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে তার।

নোয়াখালী-৩ আসনে মনোনয়ন পাওয়া মামুনুর রশীদ কিরন ফার্মাসিউটিক্যাল, কোমল পানীয়, বিস্কুট ও কৃষিখাতের প্রতিষ্ঠান গ্লোবের পরিচালক।

Also Read: শ্বশুর-জামাতা দুজনই বাদ

Also Read: সাবেক আইজিপি বাদ, নৌকায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা

Also Read: মেননের আসনে নৌকার প্রার্থী বাহাউদ্দিন নাছিম

Also Read: কুষ্টিয়া-২ ফাঁকা রাখল আওয়ামী লীগ, নৌকায় ভোটের আশা ইনুর

খুলনা-৪ আসনে মনোনয়ন পাওয়া আব্দুস সালাম মুর্শেদী পোশাক রপ্তানিকরকদের সংগঠন বিজিএমএএর সাবেক সভাপতি ও এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এছাড়া বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও বিনিয়োগ রয়েছে তার। 

রংপুর-৪ আসনে মনোনয়ন পাওয়া টিপু মুনশি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি ব্যবসাও সম্প্রসারণ করেছেন। তিনিও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি। সেপাল গ্রুপ নামের একটি পোশাক শিল্প রয়েছে তারা। টিপু মুনশি বর্তমানে বাণিজ্যমন্ত্রী।

রাজশাহী-৬ আসনের মনোনীত প্রার্থী শাহরিয়ার আলম ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের গোলাম দস্তগীর গাজীও পোশাক খাতের ব্যবসায়ী।

মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চান শেখ হাসিনা

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ভোটের মাঠে না থাকলেও কেন্দ্রে ভোটার দেখতে চান আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা।

নাম ঘোষণার আগে রোববার গণভবনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়ে গণভবনে মতবিনিময় করেন তিনি। এ সময় দলের প্রার্থীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কেন্দ্রে নিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় উপস্থিত নেতারা জানান, এই সভায় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তাদের ক্ষেত্রে নমনীয় থাকার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়।

Also Read: সুনামগঞ্জ-২: ‘সেন আমলের’ অবসান!

Also Read: চট্টগ্রামের ১৬ আসনের পাঁচটিতে নতুন মুখ

Also Read: গোপালগঞ্জ ৩: সপ্তমবার নৌকার মাঝি শেখ হাসিনা

Also Read: নৌকা মিলল না, মুরাদ হাসানের নামে স্বতন্ত্র মনোনয়নপত্র

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, “মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর পাশাপাশি ডামি ক্যান্ডিডেটও (বিকল্প প্রার্থী) রাখতে বলেছেন (শেখ হসিনা), যেন কারও মনোনয়ন বাতিল বা প্রত্যাহার করলে যেন ডামি ক্যান্ডিডেট নির্বাচন করতে পারে।"

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, "নেত্রী বিকল্প প্রার্থী রাখতে বলেছেন নির্বাচনে যাতে কেউ কোনো ধরনের অনিয়ম করতে না পারে। ভোটারের উপস্থিতি যাতে বাড়ে, সেজন্যও কাজ করতে বলেছেন।"

‘কৌশলটি’ ভালো না খারাপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গণমাধমে জেনেছি-আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন এবার কেউ চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থীও হতে পারবে। মানে- এরকমও হতে পারে- যারা বাদ পড়লেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করবেন। এই বিষয়টি দলের প্রার্থীদের জন্য ভালো।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু বলেন, “আওয়ামী লীগ নির্বাচনটাকে অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিন্দ্বন্দ্বিতামূলক দেখানোর জন্যে একটা জায়গায় উদারতা দেখাচ্ছে, সেটা হচ্ছে কেউ যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয় তাদের বিরুদ্ধে খুব কড়া ব্যবস্থা নেবে না। মানে যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায় বা ভোটারদের অংশগ্রহণ বেশি দেখা যায়, সেটা আওয়ামী লীগ অনুমোদন করবে।”

Also Read: কুমিল্লায় সুবিদের স্থলে সবুর, নাসিমুলের বদলে শামীম

Also Read: টাঙ্গাইলে ‘খান পরিবারে’ নেই নৌকার প্রার্থী

Also Read: নতুন প্রার্থী সাকিব, ফেরদৌস; এবারও আছেন মাশরাফী, মমতাজ

Also Read: ঢাকার ৯টি আসনে আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থী

তবে এই কৌশলে দলের শৃঙ্খলা থাকবে কি না, এ নিয়ে সন্দিহান তিনি। বলেন “জোট ও সহযোগী (জাতীয় পার্টি, জাসদসহ ১৪ দল) সমন্বয় করার পরেও আওয়ামী লীগ তাদের নিজেদের দলকে কতটা শৃঙ্খলায় রাখতে পারবে এ বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।”

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, “এটার মধ্যে ‘রাজনীতি আছে’। এই নির্বাচনের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি রয়েছে। এখন যত বেশি প্রার্থী হবে তত বেশি অংশগ্রহণমূলক প্রতিপন্ন করানো যাবে। আবার আওয়ামী লীগের ১০জন মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়, একজন দলীয় মনোনয়ন পেল এবং বাকি নয়জনও যদি দাঁড়িয়ে যায় তখন সবাই মিলে ভোটার নিয়ে আসবে।

“তাতে ভোটের হার বাড়বে কিন্তু এ নির্বাচনের বড় সংকট হচ্ছে অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভূক্তিকরণ, এর অভাব বোধ হচ্ছে বিএনপিসহ কয়েকটি দল না আসায়।”