Published : 17 Sep 2025, 11:23 PM
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ছাত্র সংসদে পদাধিকার বলে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পদ নিয়ে ডাকসু, জাকসুর পর এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনেও আপত্তি ওঠেছে।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠেয় রাকসু নির্বাচনের একটি প্যানেলের ইশতেহারে ছাত্রসংসদে উপাচার্যের ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতার’ পরিবর্তে ‘ভারসাম্যের’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ নামের এই প্যানেল মনে করে, উপাচার্যকে ‘সিনেটের মাধ্যমে নির্বাচিত’ হয়ে আসতে হবে।
২৫ সেপ্টেম্বরের নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে ক্যাম্পাসজুড়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্যানেল, স্বতন্ত্র প্যানেল, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচার করছে বেশ জোরেশোরে।
সবাই শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছেন নিজেদের ইশতেহার নিয়ে, শুনাচ্ছেন আশার কথা, কে কতটা শিক্ষার্থীদের হয়ে কাজ করতে চান সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা চলছে প্রার্থীদের মধ্যে।
গঠনতন্ত্রে কী আছে
কেন্দ্রীয় সংসদের মোট ২৫টি পদের ২৩টিতে প্রচার চললেও দুটো পদে নেই কোনো প্রার্থী, প্রচার কিংবা ইশতেহার। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নাম হলেও সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ পদ দুটিতে কোনো শিক্ষার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। পদাধিকার বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এই সংসদের সভাপতির পদে এবং একজন শিক্ষক কোষাধ্যক্ষ পদে থাকবেন।
অনির্বাচিত এবং পদাধিকার বলে হলেও ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ রয়েছে সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের।
রাকসু গঠনতন্ত্রের দ্বাদশ অধ্যায় অনুযায়ী, সভাপতি বা উপাচার্য সংসদের সব সভায় সভাপতিত্ব করবেন এবং সংবিধান অনুযায়ী কার্যক্রম চলছে কি-না তা নিশ্চিত করবেন। তবে শুধু নিয়ম মানা নয়, তিনি জরুরি পরিস্থিতিতে নিজের বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন। গঠনতন্ত্রের যেকোনো ধারার ব্যাখ্যা সভাপতিরটিই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

এ ছাড়া সভাপতি চাইলে শুধু নির্বাহী কমিটির কোনো সদস্যের পদ স্থগিতই নয়, পুরো কমিটিকেই ভেঙে দিতে পারেন এবং নতুন নির্বাচন আহ্বান করতে পারেন। রাকসু পরিচালনার স্বার্থে তিনি অন্য যেকোনো পদক্ষেপ নিতেও স্বাধীন।
কেন্দ্রীয় সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের অনুমোদন ছাড়া অকার্যকর। তিনি চাইলেই রাকসুর কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করতে পারবেন; তবে পরবর্তীতে সিন্ডিকেটের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
একই অনুচ্ছেদে কোষাধ্যক্ষ সম্পর্কে বলা হয়েছে, সভাপতি নির্বাচনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনকে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মনোনীত করবেন। তিনি সংসদের তহবিলের দায়িত্বে থাকবেন।

জিএস বা অন্যান্য সম্পাদকদের প্রাক্কলিত বাজেটের মধ্যে অর্থ বরাদ্দ দেবেন। সব বিল পাস করবেন এবং ভাউচার পরীক্ষা করবেন।
সিনেটের অবস্থা
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবশেষ সিনেট নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। তবে সেটি শিক্ষক প্রতিনিধি ৩৩টি পদে হয়েছিল। তবে ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, পদাধিকার বলে সিনেট সভাপতি হবেন উপাচার্য, পদাধিকার বলে সদস্য থাকবেন দুজন উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ।
এ ছাড়া ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, পাঁচজন গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতি তথা আচার্য মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, সরকার মনোনীত পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা, স্পিকার মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, পাঁচজন অধিভুক্ত কলেজের অধ্যক্ষদের প্রতিনিধি, শিক্ষা পরিষদ কর্তৃক মনোনীত ১০ জন কলেজ শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় আওতাধীন শিক্ষা বোর্ডের দুজন চেয়ারম্যান, শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত ৩৩ জন শিক্ষক, ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত পাঁচজন ছাত্রপ্রতিনিধি নিয়ে সর্বমোট ১০৪ জন সদস্য নিয়ে সিনেট গঠিত হবে।
ছাত্রদের কেন্দ্রীয় সংসদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উপাচার্যের সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন রাকসু অচল থাকায় সিনেটে ছাত্রপ্রতিনিধি পাঁচজন নেই। এ ছাড়া ১০৪ জনের বাকি পদগুলোতেও নেই নির্বাচিত সিনেট সদস্য।
কেন ‘ভারসাম্যের’ প্রতিশ্রুতি
রাকসু নির্বাচন ঘিরে সব প্যানেল যখন ইশতেহারের ফুলঝুরি ছড়াচ্ছে, ঠিক তখনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক দুই সমন্বয়কের নেতৃত্বে গঠিত ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ ইশতেহারে নিয়ে এসেছে উপাচার্যের এই ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ সীমিত করার বিষয়টি।
প্যানেলটি তাদের অন্যান্য প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এ বিষয়ে বলছে, রাকসুর সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকেও নির্বাচিত হতে হবে। নির্বাচিত হলে তারা সভাপতি তথা উপাচার্যের ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ হ্রাসে সিনেট কার্যকর করে প্যানেলের মাধ্যমে নির্বাচিত উপাচার্য ব্যবস্থায় ফিরে যেতে কাজ করবেন। উপাচার্য পদে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ চান না তারা।
সাবেক সমন্বয়ক ও ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের সহ সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) প্রার্থী মাহায়ের ইসলাম বলেন, “রাকসুর গঠনতন্ত্রে সভাপতি হিসেবে উপাচার্যের একচ্ছত্র ও একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দিয়ে রাখা হয়েছে। যেকোনো কারো পদ স্থগিত করা, সভা ডাকতে পারা অথবা অধিবেশন বাতিল এবং তার অনুমোদন ব্যতীত কোনো সিদ্ধান্ত পাশ না হওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

“তার এই ক্ষমতাটা আমরা হ্রাস করতে চাচ্ছি এবং তা একটি ভারসাম্যের মধ্যে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। এ ছাড়া সিনেটের বাইরে স্বয়ং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি বাতিল করতে চাচ্ছি।”
‘ক্ষমতা দেখানোর ইচ্ছা নাই’
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব বলেন, “আমার ক্ষমতা দেখানোর কোনো প্রবণতাই নাই। যখন রাকসু নির্বাচন হবে তখন সবাই দেখতে পাবে যে, আমি কীভাবে রাকসুতে হস্তক্ষেপ করি।”
শিক্ষার্থীদের গঠনতন্ত্র সংশোধনের দাবির বিষয়ে উপাচার্য বলেন, “আমার খুব ক্ষমতা দেখানোর স্বভাব কিংবা ইচ্ছা নাই। আমাদের অর্ডিন্যান্স সংশোধনী টিম কোনো কোনো জায়গায় ক্ষমতা কিছুটা রাফ ধরে অর্ডিন্যান্সটা করেছে। কিছু কিছু সংশোধন হয়েছে।”
পরবর্তীতে সংশোধন করা হবে কি-না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নির্বাচনের পর আরো কিছু কিছু সংশোধন হতে পারে। তবে আমি এখন এ বিষয়ে কিছু বলব না।”
ডাকসুতেও বিরোধিতা হয়েছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদাধিকার বলে ডাকসুর সভাপতি। চলতি বছর ছাত্র ইউনিয়ন গঠনতন্ত্রের সংশোধনের প্রস্তাবনায় এর বিরোধিতা করেছে।
প্রস্তাবে ডাকসুর প্রধান ভিপি (সহসভাপতি) না বরং সভাপতি হবেন তুলে ধরে বলা হয়, সভাপতি সংসদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সব সভায় সভাপতিত্ব করবেন, আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি মাত্র ভোট প্রদানের অধিকারী হবেন।
“সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সংসদের যেকোনো সদস্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সহ-সভাপতি সংসদের প্রধান-নির্বাহী বলে বিবেচিত হবেন না। সহ-সভাপতি, সভাপতির দৈনন্দিন কার্যে সহযোগিতা করবেন এবং সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন।”

সভাপতির ক্ষমতা হ্রাস প্রসঙ্গে ওই প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতি সংসদের যেকোনো পদাধিকারীকে বরখাস্ত করা এমনকি পুরো সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষমতা রাখেন যা সর্বৈব একনায়কতান্ত্রিক বলে প্রতীয়মান হয়। এই ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করতে হবে।
জাকসুতে যে দাবি এসেছিল
জাকসুতে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পদ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্কসবাদী) সমর্থিত প্যানেল।
এই প্যানেলের প্রার্থীদের দাবি ছিল, জাকসুর গঠনতন্ত্রের ধারা ৫ এর ৫.১ এ বলা হচ্ছে, উপাচার্য পদাধিকার বলে জাকসুর সভাপতি হিসেবে থাকবেন। জাকসু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে কেন উপাচার্য পদাধিকার বলে সভাপতি থাকবেন?
শিক্ষক, কর্মচারীদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ‘শিক্ষক সমিতি’ কিংবা কর্মচারী সমিতির কাঠামোতে তো প্রশাসনিক বডির কেউ পদাধিকার বলে নেই। তাহলে কেন শুধু শিক্ষার্থীদের সংসদে তাকে সভাপতি হিসেবে থাকতে হবে? এর অর্থ দাঁড়ায় শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অনুশীলনের জায়গাকে কোণঠাসা করা।
তারা আরও বলেছিলেন, ফলে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদাধিকার বলে জাকসুর কাঠামোতে থাকার নৈতিক ভিত্তি নেই।
আরও পড়ুন:
জাকসুতে ভিসি-ট্রেজারারকে কেন চায় না ছাত্রফ্রন্ট
প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি বনাম ডাকসুর কাজ
রাকসু: ছাত্রদলের পাল্টায় মেশিনে ভোট গোনার দাবি শিবিরের
রাকসু: স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং হাতে গণনা চায় ছাত্রদল
অনলাইন-অফলাইনে রাকসুর ভোটযুদ্ধ
রাকসু নির্বাচনে থাকবে ২ হাজার পুলিশ: আরএমপি কমিশনার
রাকসু নির্বাচন: ৯ ভবনের ১৭ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ
রাকসু নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যায় হতাশা, নেপথ্যে কী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: হল সংসদে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেলেন ৪২ জন
রাকসু নির্বাচনে কার কী প্যানেল
রাকসু ভোটে 'ডোপ টেস্ট' কেন, 'বুলিং ভয়ে' প্রার্থীরা
রাকসু: 'সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ' নামে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্যানেল
রাকসু: এবার সাবেক দুই সমন্বয়কের নেতৃত্বে নতুন প্যানেল ঘোষণা
রাকসুতে সাবেক সমন্বয়কদের প্যানেল, 'ডামি' কিনা, প্রশ্ন
রাকসুতে ছাত্র ইউনিয়নের 'অপরাজেয় ৭১, অপ্রতিরোধ্য ২৪' প্যানেল
রাকসু নির্বাচন: গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সবাই এক প্যানেলে লড়বেন
রাকসুতে ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ফেডারেশন একসঙ্গে লড়ছে
রাকসু নির্বাচন: ছাত্রশিবির লড়বে জাহিদ-ফাহিম-সালমান প্যানেলে