Published : 09 Sep 2025, 08:10 PM
আসন্ন জাকসু নির্বাচন ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন প্যানেল তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্কসবাদী) সমর্থিত প্যানেল বর্তমান ছাত্ররাজনীতির চর্চাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে।
তাদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো হলে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, গণরুম ও র্যাগিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম অধিকারও হরণ করছে। এ অবস্থায় তারা দাবি তুলেছে, গণতান্ত্রিক ও অধিকারভিত্তিক ক্যাম্পাস গড়ে তোলার।
সংগঠনটি যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে
ছাত্রফ্রন্ট সমর্থিত প্যানেলটির ইশতেহারে মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে জাকসুকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল প্ল্যাটফর্মে রূপ দেওয়া। এজন্য নির্বাচন নিয়মিত করতে ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা, সিন্ডিকেট ও সিনেটে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে গঠনতন্ত্র সংশোধন এবং পদাধিকার বলে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে যথাক্রমে সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ রাখার বিধান বাতিলের অঙ্গীকার রয়েছে তাদের ইশতেহারে স্পষ্ট।
শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও তারা বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করেছে। সব ধরনের বর্ধিত ফি, পেশাগত ও বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধের পাশাপাশি গবেষণায় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ, কেন্দ্রীয় গবেষণাগার চালু, অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি এবং মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার অনুবাদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও তারা দিয়েছে।
এ ছাড়া পরিবেশ ও নিরাপত্তা ইস্যুতে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিশন, যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল সক্রিয়করণ, গেস্টরুম ও র্যাগিং বন্ধের উদ্যোগ, মহাসড়কে নিরাপত্তা চৌকি ও সিসিটিভি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে তারা।
স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাতে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ইনস্টিটিউট স্থাপন, স্বাস্থ্যবীমা বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে স্বাস্থ্য ব্যয়ের দায়ভার নেওয়া, ক্যাম্পাসে শাটল সার্ভিস ও জো-বাইক চালুর প্রস্তাবও ইশতেহারে জায়গা পেয়েছে।

‘সংকট নিয়েই আমাদের লড়াই’
প্যানেলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস-পুরুষ) পদপ্রার্থী সজীব আহমেদ জেনিচ বলেন, “আমরা সংগঠনগতভাবে আসন্ন জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইশতেহার প্রকাশ করেছি। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সংকটকে আমরা ইশতেহারের মধ্য দিয়ে তুলে আনতে পেরেছি। আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এখানকার সংকট, একাডেমিক সংকটসহ সামগ্রিক সংকট নিয়ে আমরা বিগত সময়ে কাজ করেছি এবং আগামী দিনেও আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
“সেই লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতির জায়গাকেই ফোকাস করেই আমরা ইশতেহার দিয়েছি। আশা করি, আমাদের ইশতেহারে শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট হবে এবং আমাদেরকে নির্বাচিত করে কাজ করার সুযোগ করে দেবে।”
গঠনতন্ত্রের ধারা নিয়ে প্রশ্ন
জাকসুর গঠনতন্ত্র সংস্কারের বিষয়ে জেনিচ বলেন, “জাকসুর গঠনতন্ত্রের ধারা ৫ এর ৫.১ এ বলা হচ্ছে, উপাচার্য পদাধিকার বলে জাকসুর সভাপতি হিসেবে থাকবেন। প্রথম কথা হলো, জাকসু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে কেন উপাচার্য পদাধিকার বলে সভাপতি থাকবেন?
“শিক্ষক, কর্মচারীদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ‘শিক্ষক সমিতি’ কিংবা কর্মচারী সমিতির কাঠামোতে তো প্রশাসনিক বডির কেউ পদাধিকার বলে নেই। তাহলে কেন শুধু শিক্ষার্থীদের সংসদে তাকে সভাপতি হিসেবে থাকতে হবে? এর অর্থ দাঁড়ায় শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অনুশীলনের জায়গাকে কোণঠাসা করা।”
তিনি যোগ করেন, “উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদাধিকার বলে জাকসুর কাঠামোতে থাকার নৈতিক ভিত্তি নেই। দ্বিতীয়ত, সভাপতি হিসেবে উপাচার্যের ক্ষমতার পরিসীমা ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, জরুরি অবস্থা বা অচলাবস্থা দেখা দিলে তিনি সুবিবেচনা মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ তিনি তার মনমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কেন কার্যকরী পরিষদের এক-তৃতীয়াংশের মতামতের বিধান থাকবে না? এটি উপাচার্যের স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতিফলন।”
জেনিচের মতে, গঠনতন্ত্রে যেভাবে উপাচার্যকে ক্ষমতাবান করা হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অনুশীলনকে বাধাগ্রস্ত করবে।

‘ঔপনিবেশিক মানসিকতার জায়গা হিসেবেই দেখি’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইজা মেহজাবিন মনে করেন, “এই ক্ষমতা (জাকসুতে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের অন্তর্ভুক্তি) কাঠামো মূলত ভারসাম্যহীন। জাকসুর গঠনতন্ত্রের বেশকিছু ধারা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপাচার্যের ক্ষমতা কাঠামোর ভারসাম্যহীন অবস্থা বলবৎ এবং শিক্ষার্থী সংসদ হওয়া সত্ত্বেও উপাচার্যের সভাপতিত্বের বিষয়টি উপাচার্যকে ছাত্রদের ওপর আধিপত্যবাদী অবস্থান প্রকাশের সুযোগ দেয়।
“আমরা এটিকে ঔপনিবেশিক মানসিকতা বা আধিপত্যের জায়গা হিসেবেই দেখি।”
এ শিক্ষার্থীর মতে, নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিরাই শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম। উপাচার্যের একক ক্ষমতা সেই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।

‘কীভাবে সংস্কার তা স্পষ্ট নয়’
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মৃধা মো. শিবলী নোমান বলেন, “জাকসু হল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিধিবদ্ধ বিষয়, ফলে এর পরিচালনা নীতি ও ব্যয় নির্বাহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়িত্ব নিতেই হয়। তাছাড়া, জাকসুর সভাপতি হিসেবে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের থাকার বিধান পরিবর্তন করে তারা কীভাবে এই দুইটি পদে সংস্কার আনবেন, তা স্পষ্ট করেননি।”
তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের মতামত যাচাই ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিষয়টি বাস্তবায়ন জটিল হতে পারে।
“এমনটা করা সম্ভব হলেও প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের দাবি উপস্থাপনের জন্য জাকসু একটি সরাসরি মাধ্যম না হয়ে একটি মধ্যবর্তী মাধ্যমে পরিণত হতে পারে। যা দিনশেষে জাকসুর গুরুত্ব হ্রাস করতে পারে।”

দাবিটি ডাকসুর ক্ষেত্রেও ওঠেছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদাধিকার বলে ডাকসুর সভাপতি। চলতি বছর ছাত্র ইউনিয়ন গঠনতন্ত্রের সংশোধনের প্রস্তাবনায় এর বিরোধিতা করেছে।
প্রস্তাবে ডাকসুর প্রধান ভিপি (সহসভাপতি) না বরং সভাপতি হবেন তুলে ধরে বলা হয়, সভাপতি সংসদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সব সভায় সভাপতিত্ব করবেন, আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি মাত্র ভোট প্রদানের অধিকারী হবেন।
“সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সংসদের যেকোনো সদস্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সহ-সভাপতি সংসদের প্রধান-নির্বাহী বলে বিবেচিত হবেন না। সহ-সভাপতি, সভাপতির দৈনন্দিন কার্যে সহযোগিতা করবেন এবং সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন।”
সভাপতির ক্ষমতা হ্রাস প্রসঙ্গে ওই প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতি সংসদের যেকোনো পদাধিকারীকে বরখাস্ত করা এমনকি পুরো সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষমতা রাখেন যা সর্বৈব একনায়কতান্ত্রিক বলে প্রতীয়মান হয়। এই ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করতে হবে।
আরও পড়ুন:
জাকসু নির্বাচন: অমর্ত্যর প্রার্থিতা আটকে দিল চেম্বার আদালত
শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে লড়াইয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সোহাগী সামিয়া
সব কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করব: জাকসু ভিপি প্রার্থী আরিফ
জাকসুতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থাকা উচিত না: ভিপি প্রার্থী উজ্জ্বল
জাকসুর নারী প্রার্থীর কারো চিন্তায় ‘ব্রেস্ট ফিডিং’ কর্নার, আছে ‘উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’
জাকসু: বৃষ্টিস্নাত ক্যাম্পাসে ভোটের প্রচার শুরু
জাকসুতে ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রফ্রন্টের 'সংশপ্তক পর্যদ'
জাকসু: নারী হলে দেড়শ পদের মধ্যে মাত্র ৩৪টিতে ভোট
জাকসু ভোটে সেনা চেয়ে চিঠি, নিরাপত্তা ঘাটতি আসলে কতটা?
জাকসু নির্বাচনে ছাত্রীরা 'কোণঠাসা', কেমন হবে ভোট?
জাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মত প্রার্থী নেপালি শিক্ষার্থী
জাকসুতে জিতু-শাকিলের নেতৃত্বে 'স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন' প্যানেল
জাকসুতে অমর্ত্য-শরণের নেতৃত্বে লড়বে 'সম্প্রীতির ঐক্য'
জাকসুর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা, ২৫ পদে ১৭৯ জনের লড়াই
জাকসুতে ছাত্রশিবির ও বাগছাসের প্যানেলে যারা লড়ছেন
জাকসু নির্বাচন: 'শিক্ষার্থীবিরোধী পদক্ষেপের' নিন্দা ছাত্র ইউনিয়নের
জাকসুতে ছাত্রদল লড়বে সাদী-বৈশাখীর নেতৃত্বে
জাকসু ভোট: সেনা মোতায়েন চেয়ে নির্বাচন কমিশনের চিঠি
জাকসু: দুই দিনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৩২৮ জন
জাকসুর ২৫ পদের বিপরীতে মনোনয়ন সংগ্রহ ২৯৯টি
ফের জাকসুর তফসিল, ভোট ১১ সেপ্টেম্বর