Published : 24 Sep 2025, 02:45 PM
ফিলিস্তিনের সাংবাদিকরা এখন বিশ্বের সবচেয়ে সাহসী— এমন একটা সহজ সত্যও বিশ্বের তাবৎ বড় বড় সংবাদমাধ্যমের অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হবে না। কিন্তু আগেই বলে রাখি, লন্ডনে এক বিরাট সমাবেশে কথাটি বলেছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ-আমেরিকান সাংবাদিক মেহেদি হাসান। সাংবাদিকতাকে যারা নিছক পেশা ও ক্যারিয়ার মনে করেন, তাদের মাথায় এটি ঢুকবে না। কেবল সাংবাদিকতা নয়, বিভিন্ন পেশার প্রসঙ্গেই কথাটি খাটে। কিন্তু বিশ্বের মহৎ সাংবাদিকদের কাছে এটি একইসঙ্গে পেশা, নেশা ও জীবন। সাংবাদিকতার ইতিহাস এমন উদাহরণে ভরপুর, যেখানে সত্য, স্বাধীনতা ও নির্যাতিতদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে অনেকে শুধু ক্যারিয়ারই নয়, জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলেছেন বা উৎসর্গ করেছেন। আজ পৃথিবী যে ভয়ঙ্কর সন্ধিক্ষণে অবস্থিত এইসময়ে গাজা যেন বিশ্বব্যাপী নির্যাতিত মানুষের, মনুষ্যত্বের ও মানবতার শেষ ভরসা। একদিন ইতিহাসে লেখা হবে গাজায় নির্ধারিত হয়েছিল সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নাওয়ালা মানুষ এবং এআই-মানব হাইব্রিড বা মানবরূপী দৈত্যের যুদ্ধের ফল।
এই যুদ্ধে সামনের কাতারে জীবন দিয়ে লড়াই করছেন গাজার স্থানীয় সাংবাদিকগণ। গণমাধ্যমকর্মীদের আপসকামিতা ও সুবিধাবাদিতা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। তা বহুলাংশেই সত্য। আর কেবল আমাদের মতো দেশে যেখানে বাকস্বাধীনতা ডুমুরের ফুল সেখানেই নয়, যারা বিশ্বের সবাইকে বাকচর্চা, গণমাধ্যম ও সর্বরকমের স্বাধীনতা শিখিয়ে বেড়ান, তাদের বেলায়ও এ অভিযোগ একইরকম সত্য। বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম এক চরম নৈতিক সংকটে পতিত যা প্রতিদিন বেশি বেশি করে স্পষ্ট হচ্ছে ফিলিস্তিনে সংঘটিত ইসরায়েলি গণহত্যার সংবাদকে কেন্দ্র করে। সিএনএন, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ অনেক বড় বড় গণমাধ্যম নির্লজ্জ ইসরায়েল তোষণের ভূমিকা নিয়েছে। সংবাদ পরিবেশনের কায়দায়, শব্দের প্রয়োগে, তথ্য নির্বাচনে ইত্যাদি নানা কৌশলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের বৃহৎ অংশটাই ইসরায়েলি গণহত্যাবাহিনীর মুখপাত্র ও দোসরের ভূমিকা পালন করছে।
এ নিয়ে ‘জেটেও’ সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা মেহেদি হাসান লন্ডনে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তার মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইসরায়েলের জায়নবাদী সরকারের বিরুদ্ধে একটানা অভিযোগ করে চলেছে যে, নেতানিয়াহু তাদেরকে গাজায় ঢুকতে দিচ্ছেন না, সেজন্য তারা সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না ও বিশ্ববাসীকে তা জানাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর নেতানিয়াহু তাদেরকে যে জবাব দিচ্ছে তা গভীর প্রেমপ্রসূত— তাদের নিরাপত্তার খাতিরেই নাকি তিনি তাদেরকে যুদ্ধের মাঠে না গিয়ে ইসরায়েলি সৈন্যদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। জায়নিস্ট ফিডারে ভরে যে সংবাদ আইডিএফ পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমকে খাওয়াচ্ছে তা তারা বমি করে টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকা ভাসাচ্ছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এমন একটা ভাব করছে যেন গাজায় চলছে তথ্য ব্ল্যাকআউট, তাই তারা অসহায়। তাহলে সারা পৃথিবীর মানুষ লাইভস্ট্রিমে প্রতিদিন যা দেখছে সেগুলো কী? হামাসের প্রপাগান্ডা! নেতানিয়াহুর এই সূত্র ধরে ইসরায়েলের সাবেক কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টও একজন হামাস সদস্য কারণ মে মাসে সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি গাজা পরিস্থিতি বিষয়ে বলেছেন, “যুদ্ধাপরাধ ছাড়া এটা কী?” এর পূর্বে ইসরায়েলের বিখ্যাত পত্রিকা হারেৎজে তিনি তার লেখায় বলেছেন, “হ্যাঁ, এটি যুদ্ধাপরাধ।”
পশ্চিমা প্রচারণার একটাই সুর, গাজা সম্পর্কে সঠিক কিছুই জানা যাচ্ছে না, কেননা নেতানিয়াহু তাদেরকে সেখানে ঢুকতে দিচ্ছেন না। কিন্তু তারা এও ভাল করে জানেন যে, নেতানিয়াহু যেদিন তাদের গাজায় ঢুকতে দেবেন সেদিন গাজা বলে আর পৃথিবীতে কিছু থাকবে না, জায়নবাদীদের খায়েশ পূরণ করে সেখানে থাকবে না কোনো মনুষ্য প্রাণ, থাকবে কেবল আইডিএফ-এর গণহত্যাকারী সেনাদের বুটের আওয়াজ ও অশ্লীল উল্লাস। গাজায় যদি কোনো সাংবাদিক না-ই থাকবেন তবে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে গত ২৩ মাসে যে প্রায় ৩০০ জন্য সাংবাদিক মারা গেলেন তারা কী? সাংবাদিক নন? ফিলিস্তিনিদেরকে বিমানবিকীকরণের এও এক মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। যেহেতু তারা ফিলিস্তিনি সাংবাদিক, সম্প্রসারণবাদী পশ্চিমা দৃষ্টিতে তারা সাংবাদিক পদবাচ্য নন, যেভাবে ফিলিস্তিনিরাও মানুষ পদবাচ্য নন!
সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে আল জাজিরার হিসাব অনুযায়ী ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ২২০ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন যার মধ্যে ১০ জন আল জাজিরার। রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারসের নির্বাহী পরিচালক থিবাউট ব্রুটিন এক বিবৃতিতে এসব হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে গণমাধ্যমগুলোকে আহ্বান জানান আরএফএস ও আবাজ (আওয়াজ) কর্তৃক ১ সেপ্টেম্বর আয়োজিত বৈশ্বিক সম্মিলিত প্রতিবাদে অংশগ্রহণের।
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো যে, এগুলো যুদ্ধের গোলাগুলিতে পড়ে সাংবাদিকদের মৃত্যু নয়, এসব হচ্ছে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। গাজার এই সাংবদিকরাই এখন বিশ্বের চোখ ও কান, ইসরায়েল তাই তাদেরকেই টার্গেট করেছে এবং হত্যা করে চলেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, “একদিকে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সব সংবাদমাধ্যমের গাজায় প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করছে, অন্যদিকে বিনা বাধায় হত্যা করে চলেছে তাদের যারা গাজার দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যার মর্মন্তুদ কাহিনী তুলে ধরার জন্য বিশ্বের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য লেন্স।”
আরও বলা হয়েছে, “এমনকি এই সাংবাদিকরা যখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, পরিবারের সদস্যদের হারাচ্ছেন, তাঁবুর নিচে ঘুমাচ্ছেন এবং গাজার সব মানুষের মতো ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে হত্যার টার্গেট হচ্ছেন, তখনও তারা চাক্ষুষ প্রমাণ হাজির করে চলেছেন ইসরায়েলি সৈন্যদের সংঘটিত নৃশংসতার।” তারা সাংবাদিকতা করছেন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে।
১৭ সেপ্টেম্বর লন্ডনে আয়োজিত ‘টুগেদার ফর প্যালেস্টাইন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের উপস্থিতিতে মেহেদি হাসান এক আবেগময় সাড়া জাগানো বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী সাংবাদিকরা এই মুহূর্তে গাজায়, ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা। ২৭০ জন সাংবাদিককে ইসরায়েল হত্যা করেছে যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়ান যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ সব মিলে যা মারা গেছেন তারচেয়ে বেশি। ২৭০ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে রাস্তায়, তাদের বাড়িতে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। তাদের হত্যা করা হয়েছে কারণ তারা সাংবাদিক পরিচয়জ্ঞাপক পোশাক পরেছিলেন।” (হ্যাঁ, ‘কারণ’। সাংবাদিক পরিচয়জ্ঞাপক পোশাক পরে থাকা ‘সত্ত্বেও’ নয়। পরিকল্পিত হত্যা বুঝতে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।) তিনি বলেন, “লজ্জা বর্ষিত হোক ওইসব পশ্চিমা সাংবাদিকদের ওপর যারা গাজায় তাদের সাথীদের গণহত্যা নিয়ে একটি কথাও বলেনি। লজ্জা বর্ষিত হোক তাদের ওপর। একজন পশ্চিমা সাংবাদিক হিসেবে আমি বলতে পারি, তারা আমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ। কারণ তারা কেবল একটি যুদ্ধ বা গণহত্যার দলিল সংগ্রহ করছেন না, তারা সংগ্রহ করছেন তাদের নিজেদেরকে হত্যার দলিল, তাদেরকে অনাহারে নিশ্চিহ্ন করার দলিল। সুতরাং তারা বিশ্বকে দেখিয়েছেন, তুমি সত্যকে বোমা মেরে হত্যা করতে পারো না।”
ওই আবেগময় অনুষ্ঠানে হাজার হাজার দর্শক মেহেদির সঙ্গে সমস্বরে বলেন: ইউ কান্ট বোম দ্য ট্রুথ অ্যাওয়ে। হ্যাঁ, গাজার শহীদ সাংবাদিকরা তাদের জীবন দিয়ে বিশ্বের সব নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর জন্য প্রমাণ করে যাচ্ছে, বোমা মেরে সত্যকে হত্যা করা যায় না। গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা শুরুর দুই বছর পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে অন্তত এই বোধটুকু হোক আজকের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকদের প্রতি আমাদের সামান্য শ্রদ্ধাঞ্জলি।